ইত্তেফাক
আলোচনায় সুপ্রিম কোর্ট বার ও বিজিএমইএ নির্বাচন

আলোচনায় সুপ্রিম কোর্ট বার ও বিজিএমইএ নির্বাচন

*সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুটি সংগঠনের নির্বাচনকে ঘিরে দেশ জুড়ে আলোচনা চলছে। এর একটি হলো সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন এবং অপরটি হলো তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নির্বাচন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ দুটি নির্বাচন নিরপেক্ষতার সঙ্গে অনুষ্ঠানের নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কিছু অতি উৎসাহীর কারণে বিতর্ক এড়ানো যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন নিয়ে রীতিমতো মারামারি হয়েছে। বহিরাগতরা এই স্পর্শকাতর জায়গায় অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেছে। মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে, তিন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।* এই প্রথম বারের মতো ব্যালট বাক্স গেছে পুলিশের হেফাজতে। গভীর রাতে জোর করে একজন প্রার্থী তার পক্ষে ফলও ঘোষণা করিয়ে নিয়েছেন। অপরদিকে বিজিএমইএ নির্বাচনে ভুয়া ভোটার তৈরি, ভুয়া ভোটার যাচাইয়ের উদ্যোগ আটকে দেওয়া এবং ভোটারদের পরিচয়পত্র আগেভাগে কবজা করে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে যা ঘটেছে :সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ঠিকঠাকই হয়েছে। তবে ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ভোট গণনা রাতে না দিনে করা হবে এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পাদক দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হট্টগোলের এক পর্যায়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। মারধরের ঘটনায় বহিরাগতরা অংশ নেন। পরে পুলিশ এসে ব্যালট পেপার ভর্তি পাঁচটি ট্রাংক নিজেদের হেফাজতে নেয়। এক পর্যায়ে সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদ সুলতানা যুথীকে বিজয়ী ঘোষণা করতে বাধ্য হন নির্বাচন পরিচালনা সাব কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবুল খায়ের। তবে সভাপতি, সহসভাপতিসহ অন্য ১৩ পদের কোনটিরই ফল ঘোষণা করেনি সাব কমিটি। ভোট গ্রহণ শেষে রাতে ব্যালট পেপারগুলো সর্টিংয়ের কাজ সম্পন্ন করার সময় হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। ভোট গণনা শুক্রবার দিনের বেলায় করার দাবি জানান আওয়ামী সমর্থিত সাদা প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক ও তার সমর্থকরা। এতে বাদ সাধেন স্বতন্ত্র সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা যুথী। তাতে সায় দেন বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল। আওয়ামী প্যানেলের এবং স্বতন্ত্র সম্পাদক দুই প্রার্থীর এমন পালটাপালটি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন তাদের কর্মী-সমর্থকরা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলা এমন হট্টগোলের মধ্যে রাতেই ভোট গণণার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। তখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকরা আবারও হট্টগোল করেন। এমন পরিস্থিতিতে মিলনায়তনে অস্ত্র নিয়ে বহিরাগতরা প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ আইনজীবীদের। এ সময় বহিরাগতরা কেন প্রবেশ করেছে এটা জিগ্যেস করতেই আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক প্রার্থী ভোট গণনার স্থান ছেড়ে চলে যান। ঐ ঘটনায় মারধরের শিকার আইন কর্মকর্তা বাদী হয়ে যুথীকে এক নম্বর আসামি ও বিএনপি প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দুই নম্বর আসামি করে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে শুক্রবার মামলা করেন। মামলায় ৩০/৪০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। এই মামলার পর কাজলসহ ছয় জন আইনজীবীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যাদেরকে রিমান্ডে দিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনায় সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদ মর্যাদার তিন সরকারি আইন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে সভাপতিসহ চারটি পদে জয়লাভ করেছে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল। অপরদিকে সম্পাদকসহ ১০টি পদে জয় পেয়েছে আওয়ামী সমর্থিত সাদা প্যানেল। নির্বাচনের নামে যা হলো বিজিএমইএতে:ভোটার তালিকায় ৪২৯টি ভুয়া গার্মেন্টস কারখানার নাম রেখেই অনুষ্ঠিত হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালনা পরিষদের নির্বাচন। নির্বচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক গ্রুপ জানায়, নির্বাচনের আগের রাতে এসব ভুয়া ভোটারের পরিচয়পত্র নিয়ে নেয় একটি গ্রুপ। সেখানে তাদের ব্রিফ করা হয় নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে। ঐ ভোটার নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন কিনা তা মনিটরিং এর জন্য একটি গ্রুপ ২০ সদস্যের একটি দল তৈরি করে। ভোটের দিন তারা নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন কিনা তা কঠোরভাবে মনিটরিং করা হয়। ২০ সদস্যের গ্রুপ থেকে দুজন করে ঐ ভোটারের সঙ্গে বুথে প্রবেশ করে। তাদের সামনে ঐ ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এছাড়া ভোটাধিকার নেই এমন কয়েজনকেও ঐ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারাও একটি গ্রুপের উদ্দেশ্য সাধনে ভুয়া ভোটাররা কাকে ভোট দিচ্ছেন তা পর্যবেক্ষণ করেন। এর আগে ৪২৯টি ভুয়া তৈরি পোশাক কারখানার অস্তিত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ৬৭টির নাম ভোটর তালিকা থেকে বাদ দেয় নির্বাচনি আপিল বোর্ড। তবে বাকি কারখানাগুলোর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন দেয় একটি পক্ষ। এফবিসিসিআই আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে গত ৩১ জানুয়ারি ভুয়া ভোটারের বিষয়ে আবেদন দেওয়া হলেও তা শুনানি না হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের মহাসচিব বরাবর একটি তাগাদাপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু তার শুনানি করেনি আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে রিট আবেদন করা হলে বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি কাজী জিনাত হকের দ্বৈত বেঞ্চ গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ভুয়া কারখানাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে এফবিসিসিআইকে নির্দেশ দেন। এছাড়া অভিযুক্ত ভুয়া কারখানাগুলোর ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) ঠিক আছে কিনা তা যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সহায়তা করার জন্যও বলে হাইকোর্ট। তবে চেম্বার আদালত বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেন।
Published on: 2024-03-12 01:16:27.134811 +0100 CET