ইত্তেফাক
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হলেও ব্যবস্থা নেই

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হলেও ব্যবস্থা নেই

*রাজধানীজুড়ে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে আছে ছোট-বড় কয়েক লাখ ভবন। অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, মার্কেট, শপিং মল, বাণিজ্যিক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। রাজউকের মতে, রাজধানীর ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনহীন। এসব দেখভালে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থাকলেও তারা কাজ করেন নামকাওয়াস্তে। নগরীতে বড় বড় ভবনে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোন ফায়ার ফাইটিংয়ের ব্যবস্থা নেই। রোগী ও কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সদের বের হওয়ার পথ দুর্বল। সেখানে আগুন লাগলে বেইলি রোডের মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ওইসব ভবনে লিফট আছে। তবে সিঁড়িগুলো সরু। হাসপাতালে অগ্নিকান্ড ঘটলে বেশিরভাগেরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।* আবার রাজধানীর কোনো কোনো বহুতল ভবন মার্কেটের প্রবেশপথে কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ডে নানা দোকানপাট বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ও ময়লা-আবর্জনা। যেখানে গাড়ি রাখা হবে, সেখানেও দোকানপাট দিয়ে রেখেছে। এমন চিত্র রাজধানীর অধিকাংশ মার্কেটে। নামা ও ওঠার সিঁড়ির জায়গা কম। অগ্নিকান্ড ঘটলে পদদলিত হয়ে মারা যাবে মানুষ। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সিদ্দিকবাজারে ভূগর্ভস্থ মার্কেটে আগুন লেগে ২৪ জন মারা যান। এরআগে নিমতলীতে ২০১০ সালে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। তারপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। নোটিশ দিয়ে দায় সারছে কর্তৃপক্ষ। কোন কিছু ঘটলে সবাই দোষ দেয় রাজউকের। রাজউক ছাড়াও অনেক কর্তৃপক্ষ আছে। যারা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়। তাদেরও দেখার দায়িত্ব নকশা অনুযায়ী হয়েছে কিনা। অর্থাৎ দায়িত্ব অনেকের। যারা বিল্ডিং নির্মাণ করবেন তাদের দায়িত্ব আছে। সরকারি বেসরকারি ভবনের কর্ণধার তাদের নিজেদের স্বার্থেই নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা উচিত। তবে কেউ তার নিজের দায়িত্ব দেখে না। রাজউক দায়িত্বের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছে, নকশা অনুমোদন অনুযায়ী ভবন করেন না অনেকে। তারা জায়গা নিজেদের মতো বাড়িয়ে নেন। তারা নিজেরাই সচেতন না। অথচ অন্যকে বলে সচেতন হতে। নিজে চুরি করে অন্যকে বলে চোর। নিজের দোষটা কেউ চোখে দেখে না। যারা ভবনে বসবাস করবে, রক্ষণাবেক্ষণ করবে, সেই মালিক কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।  ভবনে অবস্থানরত ব্যবসায়ীদেরও দেখা উচিত। কিন্তু তারা সেই দায়িত্ব পালন না করে কোথায় থেকে একটা দোকান বেশি বানানো যায়, সেটাতেই মনোযোগ দেন। অধিকাংশ ভবনের দোকান মালিক সমিতি কিংবা শপিং মল মালিক সমিতি এর সাথে জড়িত। রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুরসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় বহুতল ভবন জুড়ে হোটেল- রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সেগুলো যেন একটি মৃত্যুপুরী। মানুষ ছুটির দিনে বিনোদনের জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেখানে যান, আড্ডা দেন এবং রাতের ডিনার শেষে বাসায় ফিরেন। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার দিকে কেউ তাকায় না। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে সবাই তাকায়। খালি টাকার দিকে নজর থাকে। নিজে খায়, অন্যদের দেয়। যারা দেখভাল করবে তাদের দেয়। সকল ধর্মে আছে, ঘুষ দেওয়া ও গ্রহণকারীর অপরাধ একই, শাস্তিও সমান। এক অপরাধী আরেক অপরাধীকে দোষারোপ করা হাস্যকর ব্যাপার। যেসব ডেভেলপার বাড়ি করেন, তাদের অনেকেই নকশা বহির্ভূত কাজ করেন। অর্থাৎ সকলের দায়িত্ব আছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করেন না। এটি এখন আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হয়ে দাড়িয়েছে? সকলের মাঝে দায়িত্ববোধ থাকলে সমস্যা হবে না। দুই অপরাধীর কারণে সাধারণ মানুষের জীবন যাচ্ছেন। অবশ্যই এটার একটা সমাধান হওয়া উচিত। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, রাজউক তার দায় নিয়ে বলছে, রাজউকের দেখভালের দায়িত্ব বেশি। যারা নিরাপত্তার জন্য অন্যান্য ছাড়পত্র দেন, যেমন বিদ্যুৎ ও পানিসহ প্রায় এক ডজন সংস্থা। তাদেরও ওই সকল ভবনে নিরাপত্তার বিকল্প ব্যবস্থা আছে কিনা দেখা উচিত। ঢাকা শহরে ৬০ ভাগের উপরে আছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। যা রাজউকের অনুমোদনের বাইরে। তবে সকলের সমন্বিত একটি শক্তিশালী বডি থাকা উচিত। তাহলে সকলে মিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। রাজউক ২০২২ সালে মাত্র তিন শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ করেছে। ২০২৩ সালে ১৮০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ করেছে। রাজউক তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বড় বড় ভবন বানিয়ে রোগীদের সেবার নামে বাণিজ্য করা হচ্ছে। সেসকল ভবনে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক। কারণ ওই সকল ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটনা ঘটার আশংকা বেশি। আইসিইউতে রোগী থাকে, ওয়ার্ডে রোগী থাকে। অনেক রোগী হাঁটতে পারে না। তবে সরকারি হাসপাতালে রোগীর চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরিভাবে দেখা উচিত। এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, মিডফোর্টসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি রাজধানীতে বেসরকারি অনেক বড় বড় হাসপাতাল আছে। ১০-১৫ তলা বিল্ডিং, বাণিজ্যিক ভবন, মার্কেট রয়েছে। এসব ভবনের আবার হোটেল-রেস্তোরা আছে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। বেইলি রোডের ওই ভবনের আশপাশে আছে অনেক ভবন আছে, যেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, যত ক্ষমতাবান ততই নিয়ম না মানার প্রবণতা বেশি। শিক্ষিত লোকদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী বলেন, কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার বেশি। এখন এটি গ্রাম অঞ্চলেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন আর লাকড়ি সাধারণত ব্যবহার নেই বললেই চলে। সবাই এখন এলপিজি গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। এটির ব্যবহার সম্পর্কে অনেকেই জানে না। যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এলপিজি গ্যাসের ধোয়া যখন হলুদ রং হবে, তখন বুঝতে হবে ওই এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারে সমস্যা আছে। নীল হলে সমস্যা তেমন নেই। এটি অনেকেই জানে না। আমাদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা অনেক বেশি। ভবন নির্মাণ ও ভবন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তার বিষয়গুলো দ্রুত দেখা হবে। কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Published on: 2024-03-02 19:39:23.54474 +0100 CET