ইত্তেফাক
স্ট্রোকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার সবচেয়ে বেশি

স্ট্রোকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার সবচেয়ে বেশি

*দেশে স্ট্রোকে আক্রান্তে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার এক নম্বরে।  নিউরোলজিস্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে স্ট্রোকের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়।  স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে প্রতি ২৬ সেকেন্ডে এক জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্ট্রোকে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার বেশি।* বর্তমানে বাংলাদেশে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এরমধ্যে মাদকাসক্ত তরুণদের সংখ্যা বেশি। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি এক হাজারের মধ্যে ১১ দশমিক ৮ ভাগ আক্রান্ত স্ট্রোকে। শতকের হিসেবে ১ দশমিক ১৮ ভাগ। নিউরোলজিস্ট পদ সৃষ্টি করে স্ট্রোকসহ নিউরোলজি চিকিৎসা ব্যবস্থা জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে নিউরোলজিস্টরা বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে উঠছে। চিকিৎসা সেবা সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। সাব- স্পেশালাইডস চিকিৎসা সেবার মধ্যে নিউরোলজি অন্যতম। যেকোন বয়সে মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে। এটা ব্যয়বহুল চিকিৎসা। দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনার স্বার্থে সকল পেশার মানুষকে সুস্থ রাখতে হবে। এ জন্য নিউরোলজি চিকিৎসা ব্যবস্থা চাহিদা অনুযায়ী নিউরোলজিস্টদের পদ সৃষ্টি করতে হবে। রাজধানীর বঙ্গমাতা কনভেনশন সেন্টারে সোসাইটি অব নিউরোলজিস্টদের দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত জাতীয় বৈজ্ঞানিক সম্মেলন এসব তথ্য তুলে ধরেন নিউরোলজিস্টরা। সারাদেশের ৫০০ নিউরোলজিস্ট এই সম্মেলনে অংশ নেন। গত ৫ মার্চ নিউরোলজিস্টদের বৈজ্ঞানিক সম্মেলন উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। গতকাল সম্মেলন সমাপ্ত হয়েছে। মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্নায়ুরোগের বিস্তার ও প্রতিকার’ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। গবেষণা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকের মধ্যে আলোচনা ও পর্যালোচনা হয়েছে। আগামীতে কী করণীয় সেটা সোসাইটির পক্ষ থেকে লিখিতভাবে সরকারকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের স্ট্রোকের রোগীরা যে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সেটিও উঠে আসে আলোচনায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়াও বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব জাহাঙ্গীর আলম। গবেষণার ফলাফল ও আলোচনায় উঠে আসে, স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছে। এটা উদ্বেগজনক। যেসব কারণে স্ট্রোক হয় তা হলো উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তে চর্বি আধিক্য, মদ পান, অলস জীবন, স্থূলতা, কায়িক পরিশ্রম না করা ও মাদক সেবন। মাদকের মধ্যে কোকেন, ইয়াবা, হিরোইন, ফেনসিডিল অন্যতম। এছাড়া জন্মগত কারণে কিছু স্ট্রোক হয়। জন্মগতভাবে ব্রেনে ত্রুটি থাকলে হয়। ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার পর হঠাৎ জেগে ওঠার প্রেক্ষিতেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। তবে মাদক দ্রব্যের কারণে কিশোর, তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের হার বেশি। নিউরোলজিস্টরা বলেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত তরুণ অনেক রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন, তাদের মধ্যে মাদকাসক্তদের সংখ্যা সর্বাধিক। অর্থাৎ তরুণ-তরুণীরা বেশি মাদকাসক্ত। যেসব কারণে স্ট্রোক হয় সেগুলো এড়িয়ে গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কম। খাদ্যাভাস পরিবর্তন করতে হবে এবং ব্যায়াম করতে হবে। শাক-সবজি বেশি খেতে হবে। সঠিক সময়ে ঘুমানোসহ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, স্ট্রোকের সুচিকিৎসা ব্যবস্থা আছে শুধু রাজধানী ঢাকায়। সবাই ঢাকায় চলে আসে। বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা রাজধানীর ঢাকার আগারগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটে রয়েছে। বর্তমানে এটি ৫০০ বেডের। আরও ৫০০ বেড সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। সেই ৫০০ বেডের হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা হবে। স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে, সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আনা গেলে এবং এলটিফেস নামক একটি ইনজেকশন নিতে পারলে রোগী দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশের অনেক ওষুধ কোম্পানি এই ইনজেকশন তৈরি করছে। মূল্য ৫০ হাজার থেকে ৫২ হাজার টাকা। এটা বাংলাদেশের সিংহভাগ রোগীদের জন্য ব্যয়বহুল এবং ক্রয় ক্রমতার বাইরে। এটা সহজলভ্য করার জন্য নিউরোলজিস্টরা আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশনটি সাধারণ রোগীদের ক্ষয় ক্ষমতার মধ্যে নিতে আসতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোড হাসপাতালে নিউরোলজির চিকিৎসা সেবা রয়েছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউরোলজির চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারিভাবে ওই সকল হাসপাতালে ওই ইনজেকশনটা সরবরাহ করা হলে, মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। বেশিরভাগ মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। কারণ দ্রুত ওই ইনজেকশনটা দিলে রক্ত তরল হয়ে যায়। জমাট বাধা আর থাকে না। রক্ত চলাচল শুরু হয়। স্ট্রোকে আক্রান্তদের অনেক পঙ্গুত্ব হয়ে যায়। শুধু চিকিৎসা সেবা নিয়ে বেচে থাকে।  এই ধরনের একজন রোগীকে সামাল দিতে পরিবারের একাধিক সদস্যকে সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকতে হয়। রোগীকে সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটের শিকার হন। স্ট্রোক সাধারণত ৪০ ঊর্ধ্ব নারী-পুরুষের মধ্যে প্রাদুর্ভাব বেশি। এছাড়া যেকোনো বয়সে হতে পারে। শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। তবে তাদের সংখ্যা কম। যাতে গ্রামাঞ্চলে হাতের কাছে এই চিকিৎসা সেবা পায়, সেজন্য প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে নিউরোলজিস্ট পদ সৃষ্টির জন্য সম্মেলনে আগত বিশেষজ্ঞরা দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, দেশে চাহিদার তুলনায় নিউরোলজিস্ট সংখ্যা খুবই কম। ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন, সেই ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ গ্রহণে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। অথচ প্রশিক্ষণের নামে নানা কাজে প্রকল্পের বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন অনেকে। এত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয় অযথা। অন্যদিকে জরুরি চিকিৎসা সেবার কাজে, প্রশিক্ষণের ব্যাপারে নানা ধরনের বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। বিশেষজ্ঞ তৈরি করার ক্ষেত্রে এটা বড় বাধা। বিশ্বের কোথায় চিকিৎসা প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় না। কারণ মানুষ সুস্থ থাকলে, কাজে গতি বেড়ে যাবে। সেবা দেওয়ার দায়িত্ব ডাক্তারদের। এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। নিউরোলজিক্যাল রোগের মধ্যে আরও অনেক রোগ। যেমন নিউরো প্যাথি, পার্কিংস সন্স, মৃগ রোগী ইত্যাদি। হাত-পা কাপন ও ব্যাকা হয়ে যায়। ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সীদের এই রোগ বেশি হয়। এটা হয় ব্রেনের মধ্যে ডোপামিনের কারণে। আবার বংশগত কারণেও হতে পারে। নিউরো প্যাথিও হতে পারে বংশগত কারণে। এছাড়া নানা কারণেও এসব রোগ হতে পারে। সোসাইটি অব নিউরোলজিস্ট এর সভাপতি এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আমল বলেন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরির ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত না। ডাক্তারদের প্রশিক্ষণে সবার সার্বিক সহযোগিতা করা উচিত। এতে মানুষ সুচিকিৎসা পাবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে পারে সেই ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানান তিনি।  অধ্যাপক ডা. বদরুল আমল বলেন, যত বেশি নিউরোলজিস্ট তৈরি হবে, দেশের মানুষ ততো সুচিকিৎসা পাবে। স্ট্রোকের ইনজেকশন সহজলভ্য করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি সবার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকা উচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুভাস কান্তি দে বলেন, নিউরোলজির চিকিৎসা সেবা বিএসএমএমইউয়ে আছে। আমরা চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় নিউরোজলিস্ট কম। চাহিদা অনুযায়ী দেশের সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাহলে রোগী ও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। সোসাইটি অব নিউরোলজিস্ট এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আহসান হাবিব জেলা পর্যায়ে নিউরোলজিস্ট পদ সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, জেলা হাসপাতালে একজন নিউলোজিস্ট থাকলে, হাতের কাছে গ্রামাঞ্চলে নিউরোলজি রোগে আক্রান্তরা সুচিকিৎসা পাবে।
Published on: 2024-03-07 03:10:35.054981 +0100 CET