যায়যায়দিন
আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততার বড় চ্যালেঞ্জ

আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততার বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার হটানোর এক দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন অনেকটা চাঙ্গা হলেও দেশের সাধারণ মানুষকে বিএনপি এখনো মাঠে নামাতে পারেনি। তাই সরকার পতনের অপ্রতিরোধ্য গণসংগ্রাম গড়ে ওঠা নিয়ে জোরালো সংশয় রয়েই গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা গড়ে তোলাই এখন বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এতে ব্যর্থ হলে এক দফা আন্দোলন সফল করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন হবে। এমনকি চলমান আন্দোলন পুরোপুরি ‘ফ্লপ’ হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃতি, সংকটের গভীরতা এবং ব্যাপ্তি বিষয়ে ধারণার অভাবের কারণে কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো সবসময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেয়ে পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে সরকারি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল বর্তমানে অনেকটা একাকার হয়ে পড়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু নেতাকর্মীদের দিয়ে বড় গণসমাবেশ করে চূড়ান্ত দাবি আদায় করা দুষ্কর। বিএনপি নেতারাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, গত ১৪ বছর ধরে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে হামলা করে উল্টো হাজার-হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের সরকার ঘরছাড়া করেছে। আগামী দিনের কঠোর আন্দোলন কর্মসূচিতেও হামলা-মামলার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাজপথে নামানো কঠিন হবে। হামলা-মামলার ভয়ে দলীয় নেতাকর্মীরাও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মাঠে কতটা সক্রিয় থাকবে তা নিয়েও শঙ্কিত তারা। যদিও বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা কেউ কেউ এ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের ভাষ্য, মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে দিশেহার জনগণ জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার স্বার্থে এরইমধ্যে সরকার হটানোর আন্দোলনে পরোক্ষভাবে যোগ দিয়েছে। অনেকে রাজপথে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে। বিএনপির চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে এর প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে আগামীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজপথে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্মতা ঘোষণা করবে বলে দাবি করেন তারা। যদিও অনেকে মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। তা ছাড়া বিএনপি জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারে- এমন কোনো কর্মসূচি দাঁড় করাতে পারেনি। তারা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় স্বার্থ, দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মামলা প্রত্যাহারের আন্দোলনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যে কারণে তাদের আন্দোলন কর্মসূচিতে আশানুরূপভাবে জনসম্পৃক্ততা বাড়েনি। এদিকে বিএনপির চলমান কর্মসূচি আর অতীতের আন্দোলন মূল্যায়ন করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে গণআন্দোলন সৃষ্টি এবং বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সফল হওয়া কঠিন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিএনপির বর্তমান আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে যেমন ‘গণঅভ্যুত্থান’ সম্ভব নয় তেমনি দলটি যে একেবারেই ‘জনবিচ্ছিন্ন’ সেটিও ঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, বিএনপির আন্দোলন ঠেকানোর জন্য আওয়ামী লীগ যেভাবে মাঠে নেমেছে তাতে এটা মনে হয় যে বিএনপির ‘জনসম্পৃক্ততা’ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তিনি মনে করেন, বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে লম্বা সময় চুপচাপ থেকে সংগঠন গুছিয়ে এখন জনসম্পৃক্ততার দিকে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। যদিও দাবি আদায়ে বিএনপির চলমান কর্মসূচি দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণঅভ্যুত্থান’ সৃষ্টি করা কতটা সম্ভব হবে সেটি নিয়ে তার সন্দেহ আছে। অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী আরও বলেন, প্রথমত বর্তমান সরকার একটা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলছে। দ্বিতীয়ত সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোটা নেই। তৃতীয়ত বিএনপি যে পর্যায়ে মুভমেন্ট করছে এ রকম মুভমেন্ট দিয়ে সরকার পতন ঘটানো কিংবা ওই ধরনের দাবি আদায় করা কঠিন। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে গোবিন্দ চক্রবর্তী বলছেন, দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিকে এমন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যেখানে জনসম্পৃক্ততা বেশি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, ‘গণঅভ্যুত্থান’ সৃষ্টির মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি বিএনপি এখনো দিতে পারেনি। তার ভাষ্য, খালি মিছিল আর সভা সমাবেশ করে সরকারকে তাদের দাবির মুখে নত করতে পারবে না। তাদের আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে। এবং বিএনপির এ কথাটা মনে রাখতে হবে যে বিএনপিকে একাই এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। সমমনা ছোট ছোট দলদের কাছ থেকে খুব একটা আশা করা ঠিক হবে না। দিলারা চৌধুরী মনে করেন, পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ার কারণে বিএনপির দাবির প্রতি বাংলাদেশের অনেক মানুষের সমর্থন আছে। কিন্তু সরকারের অনুমতি নিয়ে রাস্তায় মিছিল সমাবেশ করলে আন্দোলন সফল হবে না। তবে এবারের আন্দোলনে দ্রুত জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে বলে দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জনগণের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন তারা। শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমেই সব বাধা অতিক্রম করবেন এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায় করতে পারবেন। তার ভাষ্য, অতীতের আন্দোলন থেকে এবারের ভিন্নতা হচ্ছে অত্যাচার-নির্যাতন উপেক্ষা করে নেতাকমী-সমর্থকদের সঙ্গে জনগণও রাজপথে নামছেন। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডক্টর শাহ্দীন মালিক বলেন, বিএনপির অতীতের আন্দোলন থেকে বর্তমানের ভিন্নতা হলো, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রা অনেক বেশি অসহনীয় করে তুলেছে। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পরিবর্তন চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বিএনপির দিক থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্দোলন জনজীবনের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো- দেশের উদ্ভূত সংকটের সমাধান তারা কীভাবে দেবেন, সেটারও একটি রূপরেখা তুলে ধরা। এদিকে রাজনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত দলকে সুসংগঠিত করে ঐক্যবদ্ধ রাখা বিএনপির আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো ঠিক রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে নানামুখী তৎপরতা চালাতে পারে সরকার। তাতে দলের ভেতর বিভেদ তৈরি ও ফাটল ধরিয়ে আরও ভাঙনের চেষ্টা হতে পারে। এটি সামাল দিতে না পারলে আন্দোলনের ফল ঘরে তোলা কঠিন হবে। এছাড়া শান্তিপূর্ণ অহিংস গণআন্দোলন গড়া বিএনপির জন্য আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ অহিংস আন্দোলনই অধিক মানুষকে যুক্ত করতে সক্ষম হয় এবং সেগুলো সাফল্যও অর্জন করে বেশি। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবল এ ধরনের একটি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলেন, মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেই একটা আন্দোলন সফল হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। এদিকে বিএনপির চলমান আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিএনপির লাগাতার যেসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, এর মাধ্যমে তারা দেখানোর চেষ্টা করছে যে, তাদের আন্দোলনের পেছনে মানুষের সমর্থন রয়েছে। এটার গতি ইদানীং বেড়েছে, কারণ নির্বাচন কাছাকাছি চলে এসেছে। তিনি আর বলেন, এতদিন তাদের সমাবেশের ওপর নানারকম বাধা নিষেধ থাকত, পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা থাকত। এখন মনে হচ্ছে, সেই বাধা অনেক কমেছে। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সেটা হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণেও হতে পারে। এটি বিএনপির সফল কৌশল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, বিএনপির পক্ষে যে একটা সমর্থন আছে, সেটা তারা কিছুটা হলেও দেখাতে পেরেছে। একই সঙ্গে তারা এটাও দেখতে পেরেছে, সরকার বিরোধীদের এই রাজপথে নামাকে কীভাবে ট্যাকল করে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-10-12 05:35:44.251005 +0200 CEST