যায়যায়দিন
বছরে অন্ধত্বের শিকার প্রায় ৩৩ হাজার শিশু!

বছরে অন্ধত্বের শিকার প্রায় ৩৩ হাজার শিশু!

দেশে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশুদের চোখের মারাত্মক ব্যাধি ‘রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি’ বা ‘আরওপি’। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের (আইএপিবি) তথ্য বলছে, প্রতি বছর ৩২ হাজার ৩০০ শিশু আরওপিজনিত অন্ধত্বের শিকার হয় বা দৃষ্টিশক্তি হারায়। মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বর্তমানে আরওপি’র মহামারি চলছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ লাখ শিশু জন্ম নেয়। এদের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪ লাখ শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়, যারা আরওপির ঝুঁকিতে থাকে। এদিকে, দেশে অন্ধত্বের হার এক শতাংশ কমেছে, যা ২০ বছর আগের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ কম। চোখের ছানিজনিত অন্ধত্ব যা আগে ১১ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৫ লাখ ১৭ হাজার ছিল বর্তমানে ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ছানি রোগী রয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার। এছাড়া পঞ্চাশোর্ধ্ব জনগণের মধ্যে অন্ধত্বের হার দেড় শতাংশ। ত্রিশোর্ধ্ব জনগণের মধ্যে এই হার শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় পর্যায়ে দেশের চার বিভাগে ১৩টি জেলার ৪৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপিত ৪৫টি কমিউনিটি ভিশন আই কেয়ার সেন্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ১৯ শতাংশ মানুষ দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোখ মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিন্তু এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত উদাসীন। কী কারণে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা থাকলে দেশে অন্ধত্বের হার অনেকাংশে হ্রাস পেত। তাদের মতে, প্রধানত ৭টি কারণে মানুষ অন্ধ হয়। এগুলো হলো- বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, গ্লুকোমা, চোখের ছানি- যা প্রতিরোধযোগ্য, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, আঘাতজনিত কারণ, ট্রাকোমা ও ভিটামিনের অভাব। এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি মানুষ নিবারণযোগ্য অন্ধত্বের শিকার। দৃষ্টিহীন মানুষের সংখ্যাও প্রায় ২৪ কোটি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতি মিনিটে ১২ জন মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছেন। এর মধ্যে একজন শিশু। বাংলাদেশে ৭৫ লাখের বেশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার শিশু। এছাড়া বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার প্রধান কারণ ছানিজনিত। দেশে বছরে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ অন্ধত্বজনিত ছানি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব দৃষ্টিদিবস-২০২২। বিশ্বব্যাপী চোখের যত্ন নেওয়ার জন্য গণসচেতনতা তৈরি, চক্ষু রোগ নির্মূলে প্রভাবিত করা, চোখের যত্ন নেওয়ার তথ্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোই বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের লক্ষ্য। ২০০০ সালে লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল সাইট-ফার্স্ট-ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই দিবসের সূচনা করে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করছে। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর ‘দেশব্যাপী অন্ধত্ব সমীক্ষা ২০২০’ অনুযায়ী, গত ২০ বছরে দেশে অন্ধত্বের হার ৩৫ শতাংশ কমেছে। সংস্থাটি বয়স্ক মানুষের অন্ধত্ব ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার প্রবণতা এবং তার কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময় গবেষণা বা জরিপ করে থাকে। জরিপের অংশ হিসেবে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৬৪টি জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের ১৮ হাজার ৮১০ জন অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছানি থেকে অন্ধত্ব হয়েছে এক শতাংশ মানুষের বা ৫ লাখ ৩৪ হাজার জনের। রেটিনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের ফলে শিশুদের মাঝে ‘রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি’ বা ‘আরওপি’ বাড়ছে। আগের তুলনায় এ রোগের প্রকোপ ২৩ থেকে ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে দেশের সব জায়গায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় জরিপ সঠিক হচ্ছে না। ‘আরওপি’ বিষয়ে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. মুনীর আহমেদ জানান, আমরা সত্যিকার অর্থে যদি ইউনিভার্সেল আই হেলথ কাভারেজ অর্জন করতে চাই, তাহলে শিশুদের মা-বাবা, সেবা প্রদানকারী এবং নবজাতক-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জেলা পর্যায়ে যেসব নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট, নবজাতক বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে, সেগুলোকে যদি আমরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও মানবসম্পদ এবং অক্সিজেন পরিচালনা পদ্ধতি সঠিকভাবে দিতে পারি, তাহলে আমাদের আরওপিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সহজ হবে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ জানান, সঠিক সময় চিকিৎসা নিলে শিশুর অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব। চিকিৎসার মধ্যে আছে লেজার ও ইনজেকশন। অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা থাকলে লেজারের বদলে ইনজেকশন দিয়ে থাকি, এটাও খুব কার্যকরী চিকিৎসা। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বিনামূল্যে এই শিশুদের স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা দিয়ে থাকে। তথ্য অনুযায়ী, এক সময় ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে দেশে অনেকেই অন্ধত্ব বরণ করত। তবে, ন্যাশনাল আই কেয়ারের ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করায় রাতকানা রোগের প্রকোপ অনেক কমে গেছে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-10-12 05:28:08.170774 +0200 CEST