যায়যায়দিন
মির্জা ফখরুল কারাগারে : গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক

মির্জা ফখরুল কারাগারে : গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রমনা থানায় করা মামলায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে আটকের সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মির্জা ফখরুলকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। এর আগে, বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, রোববার সকালে রাজধানীর গুলশান-২-এর বাসা থেকে মির্জা ফখরুলকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। মির্জা ফখরুলের বিষয়ে পুলিশের সিদ্ধান্ত জানতে সন্ধ্যা ৭টার দিকে যোগাযোগ করা হলে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, হত্যা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় পল্টন থানায় যে মামলা হয়েছে, সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদিকে, শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার পর্যন্ত বিএনপির চার শীর্ষ নেতার বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। অন্য দিকে, বিএনপির ডাকা শান্তিপূর্ণ মহাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ হত্যা, সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশকে মারধর, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মামলাগুলো দায়ের করেছে পুলিশ। সব মিলিয়ে ঢাকার বিভিন্ন থানায় মোট ২৪টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ‘আটক’ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পুলিশ হত্যা, পুলিশকে আহত করা, যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত বেশ কয়েকটি মামলায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। এদিকে, মির্জা ফখরুলকে আটকের পর তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম সাংবাদিকদের জানান, রোববার সকালে ডিবি পুলিশের লোকজন বাসায় আসেন। মির্জা ফখরুল ইসলামসহ বাসার সবার সঙ্গে কথা বলেন তারা। এরপর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও হার্ডডিস্ক বাসা থেকে নিয়ে চলে যান। এর ঠিক ১০ মিনিট পর আবার ফিরে এসে ফখরুলকে নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, মির্জা ফখরুল প্রচণ্ড অসুস্থ, তার চিকিৎসা চলছিল। ৭৫ বছর বয়স্ক মানুষ, তাকে এভাবে নিয়ে যাওয়া তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তিনি আশা করছেন, জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে তা করে যেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিকে, শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শাহজাহানপুরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পোড়ানোর মামলার প্রধান আসামি বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস ও ইশরাক হোসেনের বাসায় অভিযান চালিয়েছে। এদিকে, এদিন সকাল ৯টার দিকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বনানীর বাসায় দু’টি ফ্ল্যাটে পুলিশ তল্লাশি চালায়। তবে সে সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। তার ছেলে ইসরাফিল খসরু সাংবাদিকদের বলেন, সকালে ডিবি সদস্যরা এসে তার বাবাকে খুঁজতে তল্লাশি চালান। তারা বাসার প্রতিটি কক্ষ খুঁজে দেখেন। তিনি জানান, ডিবি সদস্যরা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পাসপোর্ট এবং তার স্ত্রীর মুঠোফোন নিয়ে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর সেগুলো ফেরত দেন। ইসরাফিল আরও বলেন, তার বাবা কোথায় আছেন, তা ডিবি সদস্যরা জানতে চেয়েছেন। পুলিশ তাদের জানিয়েছে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তল্লাশি চালানো হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার বলেন, ইশরাক হোসেনের গুলশানের বাসায় ডিবি অভিযান ও তল্লাশি চালিয়েছে। তবে তাকে না পেয়ে তার ছোট ভাই ইশফাক হোসেন ও গাড়িচালক রাজীবকে নিয়ে গেছেন ডিবি সদস্যরা। এদিকে, মির্জা আব্বাসের শাজাহানপুরের বাসায় রোববার দুপুরে ডিবির সদস্যরা গিয়ে তাকে বাসায় না পেয়ে ফিরে যায় বলে জানান বিএনপির প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার। অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এদিন সকালে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের লালমাটিয়ার বাসায় সাদা পোশাকের পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। তবে তিনি বাসায় ছিলেন না। বিএনপির নেতাদের বাসায় তল্লাশি ও অভিযানের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। ডিবি পুলিশ এটা বলতে পারবে। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে ডিবির কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে, শনিবার রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ ছিল। মহাসমাবেশ শুরুর আগেই কাকরাইলে দুপুর থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ পরে বিজয়নগর পানির ট্যাংক ও শান্তিনগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিকাল ৩টার দিকে বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুলিশের এক সদস্য ও যুবদলের ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা নিহত হন। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন পুলিশের ৪১ ও আনসারের ২৫ সদস্য। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন সাংবাদিক। সংঘর্ষে হাজারের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি বিএনপির। সারা দেশে ৫ শতাধিক নেতাকর্মী আটক এদিকে, বিএনপির ডাকা রোববার সকাল-সন্ধ্যা হরতালে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে পাঁচ শতাধিক বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আমাদের স্টাফ রিপোর্টার ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর : নোয়াখালী : জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ৮৪ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে তাদের আটক করা হয়। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, শনিবার রাতে পুলিশ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোক্তার হোসেন পাটোয়ারী, সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক খোকন চৌধুরীসহ অনেক নেতাকর্মীকে আটক করেছে। আটক নেতাকর্মীদের মধ্যে আরও আছেন কোম্পানীগঞ্জ পৌরসভা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক, সুবর্ণচরের চরজব্বর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম, নোয়াখালী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. সুজন ও সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নিজাম উদ্দিন। রাজশাহী:রাজশাহীতে হরতালে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে শনিবার রাতে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ১২৭ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। পরে রাজশাহী মহানগর এলাকার ৭০ ও রাজশাহী জেলার ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হরতালের সমর্থনে নাশকতার পরিকল্পনার জন্য বৈঠককালে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে। মহানগর পুলিশের মুখপাত্র জামিরুল ইসলাম বলেন, হরতাল ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ৭০ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। বগুড়া: বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় বিএনপি-জামায়াতের তিন কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে উপজেলার কুসুম্বি ও সুঘাট ইউনিয়নের পৃথক দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। শেরপুর থানার উপরিদর্শক (এসআই) সাঈফ আহমেদ বলেন, আটক তিনজনই স্থানীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৭৩ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে পুলিশ। জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গাইবান্ধা : জেলায় হরতাল সমর্থনে পিকেটিং করার অভিযোগে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন নবীসহ পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের আটক করা হয়। গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাসুদ রানা বলেন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন নবীসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ : জেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হরতালের সমর্থনে মিছিল থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার সকাল সাতটার দিকে মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় হরতাল সমর্থনে মিছিল বের করলে তাদের আটক করে পুলিশ। আটক ইকবাল হোসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। নারায়ণগঞ্জে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) চাইলাউ মারমা বলেন, যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে। সাতক্ষীরা : জেলার শ্যামনগরে হরতাল সফল করার জন্য নাশকতা সৃষ্টি ও সরকার উৎখাতের জন্য গোপন বৈঠকের অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতের ১৭ আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে এজাহারনামীয় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শ্যামনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, শনিবার রাতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী হরতাল সফল ও সরকার উৎখাতের জন্য এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। এমন খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করা হয়। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা :চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নাশকতার পরিকল্পনা ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জানমালের ক্ষতি করতে পারে এমন ৩৮ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ আটক করেছে। চাঁদপুর : হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করার সময় চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দু-এক জায়গায় হরতালকারীরা একটু পিকেটিং করার চেষ্টা করলে আমরা গিয়ে তা স্বাভাবিক করি। এ সময় আমরা বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩ জনকে আটক করি।’ ঝিনাইদহ : হরতাল ঘরে শনিবার রাতে ঝিনাইদহ সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিএনপি ও জামায়াতের ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আজিম-উল-আহসান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পুলিশ প্রস্তুত আছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। জয়পুরহাট: জেলাজুড়ে বিএনপি-জামায়াতের ৪৬ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৪১ জন বিএনপির এবং ৫ জন জামায়াতের নেতাকর্মী বলে জেলা পুলিশ জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে জয়পুরহাট সদর থানার ২৫, কালাই থানার ৩, পাঁচবিবি থানার ৬, ক্ষেতলাল থানার ৫ ও আক্কেলপুর থানার ৭ জন। এ ছাড়া যশোরে ৫০, কুমিল্লায় ১২ ও রংপুরে ১৪ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-10-30 04:20:28.088491 +0100 CET