যায়যায়দিন
বন্যা আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে তিস্তা পাড়ের মানুষ

বন্যা আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে তিস্তা পাড়ের মানুষ

উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ভারতের উত্তর সিকিমের লোনাক হ্রদ পানিতে উপচে পড়ছে। তিস্তা নদীতে দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা। প্রচণ্ড পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তর সিকিমে তিস্তা নদীর ওপর দেওয়া চুংথাং ড্যাম। এতে অতিরিক্ত পানি তিস্তা নদীতে চলে আসায় পানির স্তর হঠাৎ বেড়ে গেছে। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী বাংলাদেশ অঞ্চলেও ফুলে-ফেঁপে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বন্যার আশঙ্কায় ঘর ছাড়ছে তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা ব্যারাজের ৪৪ জলকপাট খুলে দিয়েও পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, পানির চাপ সামাল দিতে না পেরে তিস্তার গজলডোবা ব্যারাজ থেকে বুধবার সকালে রেকর্ড পরিমাণ পানি বাংলাদেশের দিকে ছাড়ে ভারত। সকাল ৭টায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ১২০ কিউসেক পানি ছাড়ার পর সকাল ৯টার দিকে পানি ছাড়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫ কিউসেক। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সকাল ১০টায় গজলডোবার সবক’টি গেট খুলে দিয়ে ঘণ্টায় ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৭ কিউসেক পানি ছাড়তে থাকে ভারত। ভারত নজিরবিহীন পানি ছাড়ায় তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে লালমনিরহাটের দোয়ানী ব্যারাজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রেড অ্যালার্ট জারি করেছে সংশ্লিষ্টরা। বুধবার বিকাল ৪টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার)। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদৌলা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠতে শুরু করেছে। চরের রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার আশঙ্কায় অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বুধবার বিকাল পর্যন্ত লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ডুবেছে রাস্তাঘাট। তিস্তায় পানি বৃদ্ধির ফলে পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, ফকিরপাড়া ইউপির রমনীগঞ্জ, সিঙ্গীমারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না ইউপির পাটিকাপাড়া, হলদিবাড়ী, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী, চর বৈরাতি, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, কালমাটি, পলাশী ও সদর উপজেলার ফলিমারীর চর, খুনিয়াগাছ, কুলাঘাট, মোগলহাট, বড়বাড়ি, রাজপুর ও গোকুণ্ডা এলাকার মানুষজন আতঙ্কে রয়েছেন। হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, ‘তিস্তা পাড়ে রেড এলার্ট শুনে তিস্তা চরের মানুষদের সরে যেতে বলা হয়েছে। অনেকে বিভিন্ন স্কুল ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন।’ লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন, ‘আমরা নদী এলাকার জনপ্রতিনিধিদের মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করতে বলেছি। সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলের লোকজনদের প্রস্তুতি নিয়ে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’ লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, ‘উজানের ভারী ঢলে তিস্তায় আবারও বন্যা দেখা দিতে পারে। আমরা সার্বিক খোঁজখবর রাখছি।’ পশ্চিমবঙ্গ সেচ দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে, সিকিমে বিপৎসীমার ওপরে বইছে তিস্তার পানি। এমন অবস্থায় তিস্তা সংরক্ষিত বা অসংরক্ষিত দুই পাড়েই রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। এদিকে, গজলডোবা দিয়ে পানি ছাড়া কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সেচ দপ্তর জানায়, ভয়ংকর বন্যার মুখোমুখি হতে পারে তিস্তা পারের মানুষজন। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিকিমের চুংথাং হ্রদ উপচে পড়ায় তিস্তা নদীতে পানি বেড়েছে। গজলডোবা, দোমোহনী, মেখলীগঞ্জ ও ঘিশের মতো নিচু এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব এলাকার মানুষদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সিকিমে তিস্তা নদীতে আকস্মিক বন্যায় ২৩ জন সেনা সদস্য নিখোঁজ হয়েছেন বলেও জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড জানিয়েছে, লাচেন উপত্যকার কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চুংথাং বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার ফলে হঠাৎ করে পানির স্তর ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচুতে প্লাবিত হয়। অন্যদিকে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও আশপাশে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরের ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। বুধবার দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নৌবন্দরকে ১ নম্বর সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপে ঘুরতে আসা অন্তত ৩ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-10-05 05:38:59.400699 +0200 CEST