যায়যায়দিন
চতুর্মুখী চাপে পুলিশ

চতুর্মুখী চাপে পুলিশ

বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতাল-অবরোধে জনগণের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করে জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। সর্বোচ্চ এ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও ওই কর্মসূচিতে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুরসহ নানা নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। তা প্রতিরোধ করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ। দেশজুড়ে এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই বুধবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ায় পুলিশ নতুন করে তীব্র চাপে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, তফসিল ঘোষণা হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সমমনারা আনন্দ-উৎসবে মাতলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আন্দোলন কঠোর থেকে আরও কঠোরতর করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি ঘেরাও কর্মসূচি ও অসহযোগ আন্দোলনে জোরালোভাবে মাঠে নামার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। গত দুই সপ্তাহের ৪ দফা অবরোধ কর্মসূচিতে শতাধিক বাস-ট্রাক ও লেগুনাতে আগুন দেওয়া হলেও তফসিল ঘোষণার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৭ জেলায় ৩৬টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। টাঙ্গাইলে একটি ট্রেনে এবং মানিকগঞ্জে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এবং তাদের ওপর বেপরোয়া হামলার ঘটনাও এখন বেড়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসবে, বিএনপি-জামায়াতসহ নির্বাচন বয়কট করা রাজনৈতিক দলগুলো ততই রাজপথে সক্রিয় হবে। আর এ সময় অগ্নিসন্ত্রাস, চোরাগোপ্তা হামলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণের ঘটনাও বাড়বে। পেশাদার অপরাধীরা এ পরিস্থিতির সুযোগ নেবে। তারা নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে তা রাজনৈতিক নৈরাজ্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। এমনকি পেশাদার কিলাররা এ সময় কিলিং মিশনে নেমে তা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে চাউর করার অপকৌশল নিতে পারে। যা সামাল দেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে কঠিন হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি বলে মত দেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, নাশকতার ঘটনা মোকাবিলা করতে হলে পুলিশের পাশাপাশি জনসাধারণকেও সতর্ক থাকতে হবে। যেসব এলাকায় ঘটনা ঘটছে সেসব এলাকার লোকজন অ্যালার্ট থাকলে এসব অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, এ মুহূর্তে তারা নিরাপত্তা টহল যতটা জোরদার করেছে, এর গতি আরও বাড়ানো জরুরি। কেননা তাদের চলমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই ব্যাপকভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনা ঘটছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে রাতে। বিষয়টি মাথায় রেখে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি রাজধানীতে যে কোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে অপরাধীদের গ্রেপ্তার অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা যে কোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা যেন পেতে পারেন, এ লক্ষ্যে এখন থেকে রাতে উপ-পুলিশ কমিশনাররা (ডিসি) দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ সূত্র মতে, বিএনপি-জামায়াতের ডাকা ১৯ ও ২০ নভেম্বর চলমান দু’দিনের হরতালকে কেন্দ্র করে রাজধানীবাসীর নিরাপত্তায় নেওয়া হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে দিন ও রাতের রাজধানীকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাজধানীতে দিনে প্রায় ১১ হাজার পুলিশ সদস্য এবং রাতে প্রায় ৯ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। থানা পুলিশ, পুলিশ লাইনের সদস্য, ডিবিসহ ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে নিরাপত্তার এ ছক তৈরি করেছে ডিএমপি। এদিকে, বিগত সময়ের মতো তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রত্যাশী সমমনা অন্যান্য দলগুলোতে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে নেতাদের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা জানান, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো আসন্ন নির্বাচন অংশ নিচ্ছে না এমনটা ধরে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে জয় নিশ্চিত। তাই তারা মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ চাপা কোন্দল দ্রুত প্রকাশ্যে রূপ নিতে শুরু করেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখন আন্দোলনের নামে নির্বাচন বিরোধী দলগুলোর নাশকতাও যেমন ঠেকাতে হবে, তেমনি একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সৃষ্ট সংঘাত-সহিংসতাও সামাল দিতে হবে। যা তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। রাজনীতি পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের যে সামান্য সময় বাকি আছে, তার মধ্যে এসব দ্বন্দ্ব মেটানো কঠিন হবে দলটির জন্য। আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদেরও আশঙ্কা, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দলীয় কোন্দল আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে করেন তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরেই যেরকম নানা দল ও উপদল তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যকার বিভক্তি খুব সহজে সমাধান হবে না। বিশেষ করে যেখানে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের ভেতরের দূরত্ব বা মতবিরোধ দূর করে একত্রে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় নির্বাচনে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর কর্মসূচির মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে হামলা-পাল্টা হামলা বা খুনোখুনি হলে তা সামাল দেওয়া দুষ্কর হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার মনে করেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো আওয়ামী লীগের জন্য ‘সর্বোচ্চ মাত্রার একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার’ হবে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এটা পুরোপুরি সুরাহা হবে না। কারণ এখন একটা ধারণা জন্মে গেছে, আমি নমিনেশন পাওয়ামাত্র ‘‘শিওর শট’’। এরকম চিন্তা যখন বিকশিত হতে থাকে, প্রত্যেকে মরিয়া হয়।’ এদিকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন চলাকালীন উত্তপ্ত পরিস্থিতি কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে তা নিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই এখন উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন, অগ্নিসন্ত্রাসের ইন্ধনদাতা ও হুকুমদাতা বিএনপি-জামায়াতের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির বিপুলসংখ্যক নেতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যারা প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতিতে নানা ধরনের নাশকতা ও সহিংসতার ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসবে ততই তারা সহিংস হয়ে উঠবে। র‌্যাব সূত্র জানায়, রাজধানীতে ধারাবাহিক অবরোধ কর্মসূচিতে বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকা মহানগরীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরাসহ ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর এবং ফরিদপুর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করেছে র‌্যাব-১০। এলাকায় র‌্যাব-১০ এর বিভিন্ন টিম সড়ক-মহাসড়কে টহল দিচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। র‌্যাব-১০ এর উপপরিচালক সহকারী পরিচালক (অপস্) আমিনুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যে কোনো সময় আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কেউ যেন কোনো ধরনের নাশকতা ও জানমালের ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সতর্ক রাখা হচ্ছে। সেইসঙ্গে জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে র‌্যাব-১০। তিনি জানান, র‌্যাব-১০ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা দিতে বিশেষ রোবাস্ট পেট্রোলের মাধ্যমে পর্যাপ্ত টহল পরিচালনা করছে এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা ডিউটিতে রয়েছেন। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নাশকতা রোধকল্পে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ প্রস্তুত আছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইজিপি বলেন, পুলিশ বাহিনী সব সময় সফলভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে আসছে। আগামী নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে যদি কেউ চেষ্টা করে সেটি প্রতিহত করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা, জনবল, প্রশিক্ষণ, ইকুপমেন্ট ও লজিস্টিক সাপোর্ট পুলিশের আছে। তাই আইনশৃঙ্খলা অবনতিজনিত যে কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেটা কঠোরভাবে দমন করা হবে। পুলিশ প্রধান আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কমিশন যে দায়িত্ব দেবে, সেই দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-11-20 04:27:04.328823 +0100 CET