যায়যায়দিন
জটিল হচ্ছে ভোটের হিসাব

জটিল হচ্ছে ভোটের হিসাব

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও ভোটের লড়াইয়ে বিএনপি অংশ নিচ্ছে না। এখন পর্যন্ত এ বিষয়টি এক রকম চূড়ান্ত। তবে প্রধান বিরোধী এ দলটি নির্বাচন থেকে দূরে থাকলেও ২০১৪ সালের মতো এবারের ভোটের হিসাব-নিকাশ এক থাকছে না। বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে আসন্ন ভোটের লড়াইয়ের ছক অনেক বেশি জটিল হচ্ছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা এমনটাই ধারণা করছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই টার্মে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার বিষয়টি ছিল অনেকটাই নিশ্চিত। এ কারণে বিগত সময়ে ভোটের আগে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটারের আস্থা-নৈকট্য অর্জনের চেয়ে দলীয় টিকিট সংগ্রহেই বেশি ব্যস্ত থেকেছেন। এবারও পুরনো ছক কষেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ মিলিয়েছেন। তবে গত রোববার ক্ষমতাসীন বৃহৎ এ দলটির ২৯৮ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণার পর দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অভিন্ন বক্তব্যে সে হিসাবের ছক পুরোপুরি পাল্টে গেছে। দলীয় মনোনয়ন পেলেও ভোটের লড়াইয়ে জয়-পরাজয় যে এখন অনেকটাই নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটারের হাতে সে বিষয়টি এখনই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে দলীয় টিকিট পাওয়া প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগি তুঙ্গে উঠলে ঢাকাসহ সারা দেশে বিপুলসংখ্যক আসনে নতুন হিসাব-নিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় এবারের ভোটের লড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না বলে দেশে-বিদেশে এ ইস্যুতে নানামুখী সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা কৌশল নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এরই ধারাবাহিকতায় রোববার গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া ঠেকাতে বিকল্প (ডামি) প্রার্থী রাখার পরামর্শ দেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চাপ প্রয়োগ না করতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নির্দেশ দেন তিনি। আসন্ন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতেই এ কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদেরও প্রকাশ্যে জানান দেন। এদিকে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এ ঘোষণার পর ভোটের ছক দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করেছে বলে জানান মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা। তাদের ভাষ্য, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় ভোটের মাঠের উৎসব আয়োজন এতদিন অনেকটা ফিঁকে থাকলেও তাতে এখন নতুন করে রং লাগতে শুরু করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কায় থাকা নেতারা এতদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও এখন নড়েচড়ে বসেছেন। রোববার দলীয় টিকিট পাওয়া প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পর কালবিলম্ব না করে অনেকেই এরই মধ্যে ভোটের মাঠে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাদের সহযোগীরাও নতুন উদ্যোগ-উদ্দীপনায় ভোটের প্রচার-প্রচারণা চালানোর আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে গত দুই টার্মে জাতীয় পার্টিসহ ছোট ছোট যেসব দল নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন এবার তাদের ভোটের হিসাব-নিকাশও অনেকটাই জটিল হয়ে উঠেছে। বিগত সময়ের মতো জোটের এসব শরিক দলের প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন পেলেই ‘জয় নিশ্চিত’ এ আস্থা উধাও হয়ে গেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা জানান, এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে। তাই প্রায় কোনো আসনেই শরিক দলের প্রার্থীদের নিজেদের সামর্থ্যে ভোটে জেতা সম্ভাবনা থাকছে না। ফলে ক্ষমতাসীনরা সুনির্দিষ্টভাবে তাদেরকে নির্ধারিত আসন ছেড়ে না দিলে ভোটের রাজনীতিতে তারা নতুন ফাঁদে পড়বে। তবে জাতীয় পার্টির নীতি-নির্ধারকরা অনেকেই মুখে আসন্ন নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তারা ৩০০ আসনে যোগ্য প্রার্থী নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে বিপুলসংখ্যক আসনে জয়ী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যদিও দশম জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ৮৮ আসনে এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৬৩ আসনে লাঙ্গলের প্রার্থী ছিল। জাপা নেতারা এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো বক্তব্য না দিলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান, ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে আওয়ামী লীগ যে কৌশল নিয়েছে, তাতে তাদের ভরাডুবি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থী সরে গেলেও সেখানে তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী আটঘাট বেঁধে ভোটের লড়াইয়ে নামতে পারে। এতে ওইসব আসনে জয় পাওয়া কঠিন হবে। এদিকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়া অনেক প্রার্থীরই আসন্ন নির্বাচনে ‘নিশ্চিত জয়লাভের’ স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তাদের আশঙ্কা, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের লড়াইয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। এতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল হতে শুরু করায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। র‌্যাব ও পুলিশের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে অংশ নিলে তাদের মধ্যকার পুরনো বিরোধ নতুন করে তুঙ্গে উঠবে। রাজনৈতিক ক্যাডারদের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দিতে চাননি।’ তবে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, একমাস আগেও রাজনীতির যে পরিস্থিতি ছিল, এখন তা নেই। তাই বাধ্য হয়েই ভোটের লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তন করতে হয়েছে। দলীয় সভাপতি পরিস্থিতি বুঝেই ডামি প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই দলীয় কর্মীদের তার পক্ষে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তবে এ ছক যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটের লড়াইয়ের হিসাব-নিকাশ এখন যতটা জটিল, আগামীতে তা আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে। তাদের ধারণা, এখনও বিএনপির প্রভাবশালী কোনো নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেননি। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটারও সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বাইরে তাদের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে নিজেদের মধ্যে ব্যাপক ভোট কাটাকাটি হবে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির কোনো নেতা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী বিরোধী ভোট তার ঘরে উঠবে। এর সঙ্গে দলের নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের একটি অংশকে ম্যানেজ করা গেলে জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকবে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে শেষ মুহূর্তে বিএনপি-জামায়াতের বেশকিছু নেতা ভোটের লড়াইয়ে নামতে পারে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার চেয়ে তা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় টার্গেট। তাই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দলটি যে কোনো সময় তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক খান বলেন, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যাবে কি-না, এটি নির্ভর করছে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির ওপর। আওয়ামী লীগ চাইছে এবারে নির্বাচনটি যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। একই সঙ্গে সাধারণ ভোটাররাও যেন ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ পায়, সেটিও তারা নিশ্চিত করতে চায়। এক্ষেত্রে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে আওয়ামী লীগ আগের মতোই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করবে। আর যদি বিএনপি শেষ পর্যন্ত না আসে, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ হয়তো জোটের নির্বাচন থেকে সরে আসবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-11-28 04:53:17.872093 +0100 CET