যায়যায়দিন
অবরোধের থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিখাত

অবরোধের থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিখাত

এখন চলছে আমন ধান কাটার ভরা মৌসুম। সারা দেশে একযোগে ধান কাটা ও মাড়াই হচ্ছে। অথচ অবরোধের কারণে বাজারে ধানের ক্রেতা নেই। মাঠের সোনারঙা ধান এখন গড়াগড়ি খাচ্ছে কৃষকের ঘর ও উঠানে। মৌসুমের শুরুতেই ধানের ভয়াবহ দরপতন চলছে। টানা অবরোধ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে চালকল মালিক ও পাইকাররা বাজার থেকে ধান কিনছেন না। পথে ধান বোঝাই ট্রাকে আগুন দেওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন মিল মালিকরা। এতে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে। তারা বলছেন, অবরোধ তাদের পাকা ধানে মই দিচ্ছে। অবরোধের কারণে হাটে মোকামে ওঠা নতুন আমনের বিক্রিও প্রায় বন্ধ। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, যেখানে পণ্য পরিবহণে আগে দিনে ৭০টি ট্রাক গাড়ি চলত, বর্তমানে তা ১০ থেকে ২০টিতে নেমে এসেছে। সবজি পরিবহণ না করতে পেরে ক্ষুব্ধ কৃষক। বৃহস্পতিবার পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলিতে হরতাল-অবরোধের বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। তারা মহাসড়কে কাঁচা সবজি ফেলে দিয়ে হরতাল-অবরোধের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহে প্রতি মণ আমন ধানের দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। মঙ্গলবার নেত্রকোনার দুর্গাপুরের ধানের বাজারে চিকন ধান (ধানি গোল্ড) এক হাজার টাকা মণে বিক্রি হয়েছে। অথচ গত সপ্তাহ আগে এ জাতের ধানের দাম ছিল ১১শ’ টাকা মণ। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী আবু সামা বলেন, শম্ভুগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, মানিকগঞ্জের অটো রাইসকলগুলো প্রতিবছর ধানের মৌসুমে ট্রাক নিয়ে ধান কিনতে আসেন, এবার অবরোধের কারণে তারা আসতে পারছেন না। মিল মালিকদের কাছ থেকে টাকা না পাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ধান কেনা শুরু করেননি। ফলে ধানের বাজারে মন্দাভাব চলছে। এদিকে সরকার ১২শ’ টাকা মণে আমন ধান কেনার ঘোষণা দিলেও পণ্য পরিবহণ সংকটের কারণে কৃষকরা এ সুবিধা নিতে পারছেন না। আগাম শীতের শাকসবজি বিক্রির উপযুক্ত সময় এখন। খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরে বিক্রির সময় এখন। পণ্য পরিবহণ বন্ধ হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষিখাতের সঙ্গে জড়িতরা। সবজি বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না। অবরোধের থাবায় মাঠে মাঠে শীতের সবজি নষ্ট হচ্ছে। অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোক্তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারছে না শীতকালীন সবজি। আবার শহরে যারা সবজি কিনে খান, তাদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এবারের মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও তার বেশিরভাগই নষ্ট হতে যাচ্ছে পণ্য পরিবহণ বা ট্রাক সংকট তীব্র হওয়ার ফলে। বাংলাদেশ কৃষক উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলেন, কৃষিপ্রধান ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে হরতাল-অবরোধ করে কৃষিপণ্য তথা কৃষককে সংকটে ফেলা হচ্ছে। আমরা কৃষকরা তো কোনো দলের না, রাজনীতিও করি না। আমরা সবজি উৎপাদন করি। কিন্তু আমরা সেই সবজি বিক্রি করতে পারছি না। গাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। এবার বেপারীরাও আসছেন না। বগুড়ার সবজি ব্যবসায়ী কালাম প্রতিদিন ভোররাতে সবজি ভর্তি ট্রাক নিয়ে আসেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। অবরোধের কারণে তিনি সবজি নিয়ে ঢাকায় আসতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, অবরোধে বগুড়ার সবজির মোকামে ধস, ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষক। অবরোধের কারণে পরিবহণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কেউ শাকসবজি কিনছে না। ঢাকা থেকে আসছেন না পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ২০১৪ সালে টানা হরতাল-অবরোধ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিখাত। পরে দুই বছর করোনার প্রভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে এ খাতটি। দেশে সারা বছরে যে ফসল হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদিত হয় নভেম্বর থেকে এপ্রিলÑ এই ছয় মাসে। মাঠে মাঠে আমন ধান কাটা হচ্ছে, চলছে বোরোর বীজতলা প্রস্তুতির কাজ, অনেক এলাকায় গম ও আলুর চারা রোপণ শুরু হয়েছে। গ্রামে গ্রামে চলছে ভুট্টা ও সরিষা চাষের কার্যক্রম। অবরোধ একদিকে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সরকারের কৃষি প্রণোদনার বীজ ও সার পৌঁছানো যাচ্ছে না। পণ্য পরিবহণ বন্ধ থাকায় দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে আসন্ন বোরো মৌসুমের সেচ কাজের জন্য মাঠ পর্যায়ে ডিজেল পরিবহণ সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়াও সার পরিবহণেও সংকট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, শাকসবজি-ফলমূল যেটা উৎপাদন হয় তার ৩০ শতাংশ মাত্র যারা উৎপাদন করে তারা খায়, অথবা গ্রামের বাজারে বিক্রি হয়, বাকি ৭০ শতাংশ ঢাকাসহ বড় শহরে চলে আসে। চলমান অবরোধ পরিস্থিতিতে এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এবার যে পরিমাণ শাকসবজি উৎপাদন হয়েছে তার অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। ফলে কৃষকেরাও লাভ পাবেন না। কৃষিবিদ আজিজুল ইসলাম বলেন, অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। শীত মৌসুমে সবজির প্রচুর ফলন হলেও অবরোধের কারণে বাজারজাত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। অবরোধের কারণে শীতকালীন শাকসবজি, মাছ, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য ঢাকা বা বড় বড় শহরে বিক্রি করা যাচ্ছে না। স্থানীয় বাজারগুলোতে পাইকাররা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। ময়মনসিংহের কাশিগঞ্জ এলাকার পাইকার আব্দুল আলী বলেন, আগের বছরগুলোতে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকার বড় বড় সবজি ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে এসে আমাদের কাছ থেকে সবজি নিতেন। এখন অবরোধের কারণে তারা আসছেন না। আব্দুল আলীর মতো অনেক ছোট পাইকার গ্রাম থেকে ট্রাকে করে কৃষিপণ্য শহরে এনে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখতে পেলেও এবার পণ্য পরিবহণের জন্য ট্রাক পাচ্ছেন না। ট্রাক ড্রাইভার ও ট্রাকের মালিকরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ নিয়ে ট্রাক কেনা হয়েছে, দুর্বৃত্তরা ট্রাকে আগুন দিলে পথে বসতে হবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-11-08 04:43:38.774062 +0100 CET