যায়যায়দিন
তবুও দূরপাল্লার বাস বন্ধ

তবুও দূরপাল্লার বাস বন্ধ

বিএনপির ডাকা অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে। তবুও দূরপাল্লার বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অজানা আতঙ্ক আর আস্থাহীনতায় দূরপাল্লার বাস চলালাতে চাচ্ছেন না মালিক-শ্রমিকরা। লাঠি ও বাঁশি নিয়ে পরিবহণ শ্রমিকরা পার্কিং করা দূরপাল্লার বাসসহ অন্যান্য যানবাহন পাহারা দিচ্ছেন। পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বুধবার সকালে সরেজমিনে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, শত শত বাস টার্মিনালের ভেতরে পার্কিং করে রাখা হয়েছে। গাড়িগুলোর মধ্যে কোনোটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। আবার কোনোটির চলছে নতুন করে রং করার কাজ। আবার কোনোটির যান্ত্রিক মেরামতের কাজ চলছে। অনেক বাস টার্মিনালের আশপাশের মূল রাস্তার কাছে পার্কিং করে রাখা হয়েছে। নিজেকে বাসের হেলপার দাবি করে আশিক নামের এক তরুণ বলেন, মূল সড়কের কাছে যেসব বাস দেখতে পাচ্ছেন, সব বাসের হেলপার বা কেউ না কেউ পাহারা দিচ্ছেন। কারণ যেকোনো সময় দুর্ঘটনা বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য আমরা বাস পাহারা দিচ্ছি। পাশেই পুলিশকেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বাস বাইরে রাখার কারণ সম্পর্কে আশিক বলেন, অবরোধ ঘোষণা করার পর পরই চালকরা বাস নিয়ে টার্মিনালের ভেতরে পার্কিং করে চলে গেছেন। ওইসব বাসের হেলপাররা আরামে আছেন। তারা বাসের ভেতরে বাইরে আড্ডা দিচ্ছেন। আর যেসব চালক টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখার জায়গা পাননি, তারা বাধ্য হয়ে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় বাস রেখে চলে গেছেন। আবার অনেক বাস ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। এ ধরনের বাসই মূল সড়কের কাছে পার্কিং করে রাখা। আর আমরা এসব বাসই পাহারা দিচ্ছি। জরুরি প্রয়োজনে আমরা বাস চালিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাতে নিতে পারি, এজন্য আমাদের ড্রাইভিং কিছুটা শেখা আছে। একই অবস্থা মহাখালী বাস টার্মিনালেও। দুপুরে টার্মিনালে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেতরে শত শত বাস পার্কিং করে রাখা। আর এখানেও একই রকমের কাজ চলছে। টার্মিনালটির ভেতরে গাড়ি মেরামত করার গ্যারেজ আছে। অনেক গাড়ি অবরোধের কারণে সুযোগ পেয়ে টুকটাক মেরামতের কাজ করে নিচ্ছেন। টার্মিনালের সামনে, পেট্রোল পাম্পের আশপাশে, নাবিস্কো, তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স পর্যন্ত বিভিন্ন রাস্তার পাশে দূরপাল্লার অনেক বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছে। এখানকার অনেক পরিবহণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। শ্রমিকদের একজন সোবহান বলেন, ভাই বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক কথাই বলা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা আসলে ভিন্ন। আমি যে বাসটির হেলপার সেটির দাম প্রায় ১ কোটি টাকা। এটি দূরপাল্লার বাস। গন্তব্যে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। কারণ শিডিউল ছাড়া বাস ছাড়া যাবে না। আর ছেড়েই বা কি লাভ। যাত্রী তো নেই। যাত্রী ছাড়া বাস নিয়ে রওনা হতে মালিক নিষেধ করেছেন। কারণ অবরোধে এত দামের গাড়িটি যদি ভাঙচুর হয় বা কেউ আগুন লাগিয়ে দেয়, তাহলে কি হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক মহাসড়কের পাশে বহুতল ভবন আছে। ওইসব মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে যদি পেট্রোল বোমা মেরে বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানোর কোনো সুযোগ নেই। ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে আগুনে বাস প্রায় পুড়ে যাবে। এছাড়া পুলিশ নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও, বাস মালিক তো আর বাস ফেরত পাচ্ছেন না। তাই মালিক ঝুঁকি না নিতে বলেছেন। সোবহান বলেন, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশের সব মহাসড়কে সত্যিকার অর্থেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব না। কারণ যেখানে পুলিশ বা র‌্যাবের টিম থাকবে, সেখান থেকে হামলা নাও করতে পারে। তিনি বলেন, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে না, সেখান থেকে বাসে হামলা করবে। কিছুই করার থাকবে না। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বাস চলাচলে এস্কর্ট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, খুবই ভালো। কিন্তু সব বাসেই তো র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষে এমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না। তার দাবি, বাসে পুলিশ বা র‌্যাব থাকলেই যে আগুন দেবে না, তারই বা কি গ্যারান্টি আছে। কারণ ঢাকার নয়া পল্টনে শত শত পুলিশের উপস্থিতিতে নাশকতাকারীরা একজন পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এছাড়া আমাদের এক পরিবহণ শ্রমিককে বাসের ভেতরেই পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। সোবহান বলেন, এমন ঘটনার পর পার্কিং করা যানবাহনে না ঘুমানোর কথা বলা হয়েছে। এমনকি পরিবহণ শ্রমিকরাও যানবাহনের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকার সাহস পর্যন্ত করছেন না। এজন্য পরিবহণ শ্রমিকরা পালা করে সারা রাত জেগে যানবাহন পাহারা দিচ্ছেন। পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে লাঠি ও বাঁশি রাখা হচ্ছে সবার কাছেই। নাশকতাকারীরা হামলা করতে এলে পাহারাদারদের যেকোনো একজন দেখামাত্রই জোরে জোরে বাঁশি বাজাবেন। আর সঙ্গে সঙ্গে অন্য পাহারাদাররাও বাঁশি দিয়ে আশপাশে থাকা লোকজনদের জড়ো করে হামলাকারীদের প্রতিহত করবে। এমন কৌশলে যানবাহন পাহারা দেওয়া হচ্ছে। কারণ ইদানীং পার্কিং করা বাসেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। একই অবস্থা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ সারা দেশের প্রায় সব বাস টার্মিনালেই। থানা পর্যায়ে সবাই মোটামুটি সবাইকে চিনেন। এজন্য খুব বেশি প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে জেলা পর্যায়ের টার্মিনালগুলোতে একই পদ্ধতিতে পার্কিং করে রাখা যানবাহন পাহারা দেওয়া হচ্ছে। পরিবহণ শ্রমিক শহীদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহণের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কি প্রক্রিয়া বা কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে- তা নিয়ে মালিকপক্ষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। সত্যি সত্যিই তারা প্রকৃত ক্ষতিপূরণ পাবেন কিনা সে নিয়েও রয়েছে নানা মতবিরোধ। এজন্য যানবাহন মালিকরা আর ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছেন না। এছাড়া পরিবহণের ক্ষতিপূরণের কথা বলা হলেও পরিবহণের সঙ্গে যদি কোনো পরিবহণ শ্রমিকের হতাহতের ঘটনা ঘটে, তাহলে তাদের জন্য কি ধরনের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে তা স্পষ্ট নয়। এ নিয়েও নানা মতপার্থক্য আছে। আর পরিবহণ শ্রমিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্তত দূরপাল্লার বাস চালাতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ সবারই তো পরিবার-পরিজন আছে। জীবনের মায়া কার না আছে! প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের নিয়ে পরিবহণ মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে দূরপাল্লার বাস চলাচলে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দেন। এছাড়া র‌্যাবের পক্ষ থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচলে প্রয়োজনে র‌্যাবের এস্কর্ট দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন নিশ্চয়তার পরেও অজানা আতঙ্কে আর ভয়ে দূরপাল্লার বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-11-09 04:43:39.53572 +0100 CET