যায়যায়দিন
ছড়িয়ে পড়ছে নির্বাচনী সহিংসতা

ছড়িয়ে পড়ছে নির্বাচনী সহিংসতা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বাড়ছে প্রার্থীর কর্মি-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা। একইসঙ্গে বাড়ছে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর কয়েকদিনের সহিংসতায় প্রাণহানিও ঘটেছে। ইতোমধ্যে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়ে মাদারীপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক কর্মীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সহিংসতামুক্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন না করতে বারবার সতর্ক করাসহ বিধি লঙ্ঘনজনিত শাস্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ নেই। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ভোটাররা। ভোট গ্রহণের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে তাদের মধ্যে। নির্বাচন ঘিরে শুরু হওয়া এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে সহিংসতা-প্রাণহানি এড়াতে বাড়তি নিরাপত্তার দাবি তুলেছেন তারা। বৃহস্পতিবার মাদারীপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তহামিনা বেগমের ঈগল মার্কার মিছিলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। এ ঘটনায় ওইদিন দুপুরে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের হয়। পরদিন শুক্রবার রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী এসকান্দার খাঁ’র ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে আহত করে। শনিবার দুপুরে তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে কর্মীর মৃত্যুর খবরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় নৌকার প্রার্থী আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপের সমর্থক ফজলুল হক বেপারীসহ ৫৭ জনকে আসামি করে কালকিনি থানায় মামলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে গণসংযোগকালে রংপুর-৩ আসনের তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী জাতীয় পার্টির (জাপা) কর্মি-সমর্থকদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওইদিন রাত আটটার দিকে রংপুর মহানগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের দেওডোবা বড়বাড়ি মরিচটারি এলাকায় প্রচারণা চালানোর সময় হামলার এ ঘটনা ঘটে। আনোয়ারা ইসলাম রানী অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে নিয়ম মেনে প্রচার-প্রচারণা চলছে। গণসংযোগের অংশ হিসেবে সন্ধ্যায় মরিচটারি মোড়ে এলে শত শত মানুষ আমাকে দেখতে ঘিরে ধরে। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাতীয় পার্টির কয়েকজন কর্মী-সমর্থক আমার হাতে থাকা হ্যান্ড মাইক কেড়ে নেন। এ সময় ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে তারা কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ ও আমার প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন।’ হামলার ঘটনায় থানায় মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এদিকে, রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের সাতবাড়িয়া নগরপাড়া এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল জব্বার চৌধুরীর সমর্থক প্রবাসী মো. শাহেদ আলী প্রতিপক্ষ নৌকার সমর্থকদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যার পর ২০-২৫ জনের একটি দল উপজেলার সাতবাড়িয়া আশরাফ মুহুরী হাট-বাজারে তার ওপর হকিস্ট্রিক, লোহার রড, কাঠের বাটাম দিয়ে হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন তিনি। আহত শাহেদ আলী দাবি করেছেন, পুনরায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে নৌকার সমর্থক হামলাকারীরা তাকে প্রাণে মারারও হুমকি দিয়েছে। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। থানায় পাল্টাপাল্টি মামলাও দায়ের করেছে উভয়পক্ষ। মঙ্গলবার রাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে আলী মিয়া বাজার ও এনাম নাহার মোড়ে পাল্টাপাল্টি মিছিলে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রাজিবুল আহসান সুমন বলেন, ‘আমরা আলী মিয়া বাজারে গণসংযোগ শেষে পথসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় নৌকার সমর্থক ছানাউল্লাহ শামীম ও আবদুর কাদের আমাদের ওপর হামলা করেন। এতে আমাদের রাকিব ও আদর নামে দু’জন কর্মী আহত হয়।’ এদিকে নৌকা মার্কার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলাউদ্দীন বেদন বলেন, ‘কার ন্যায়, কার অন্যায় সেটা প্রশাসন দেখবে। এখানে বলার কিছু নেই।’ ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল কাদের আজাদের (এ কে আজাদ) সমর্থকদের ওপর ফের হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুরে স্থানীয় চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম মজনুর নেতৃত্বে এই হামলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আহতরা জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছেন বলে দাবি করেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ঈশান গোপালপুরে আমরা ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছিলাম। এমন সময় ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়। হামলায় আহত ৫ কর্মীকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’ এর আগে, সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর, অম্বিকাপুর, পৌর এলাকায় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মি-সমর্থকদের ওপর। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হক বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার কর্মি-সমর্থকরা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তারা নানাভাবে মিথ্যা অভিযোগ তোলার চেষ্টা করছেন। আমি ও আমার কর্মি-সমর্থকরা নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনেই কাজ করে চলেছি।’ স্বতন্ত্র প্রার্থী একে আজাদ অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই আমার কর্মি-সমর্থকদের ওপর নানাভাবে হুমকি-ধামকি এমনকি একাধিক হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এমনটি ঘটতে থাকলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’ ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত যে কয়টি ঘটনা ঘটেছে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে, আমরা সব প্রার্থীর পক্ষে সহনশীল। আমরা কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছি।’ ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদের কর্মীদের ওপর হামলা ও অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগে হকার্স লীগের দুই নেতাকে শুক্রবার ভোরে পৌর এলাকার দিলখুশাবাগ ও মজিদপুর থেকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার রাত ১১টার দিকে মুরাদ জংয়ের কর্মীরা সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিউমার্কেটের সামনে পোস্টার লাগাচ্ছিলেন। এ সময় নৌকা প্রতীকের ৩০ থেকে ৪০ জন কর্মী মুরাদ জংয়ের কর্মীদের মারধর, তাদের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ও পোস্টার ছিনিয়ে নেন। এ ঘটনায় মুরাদ জংয়ের কর্মী আব্দুল কাদির মোল্লাহ বাদি হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সাভার থানায় মামলা দায়ের করেন। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের চরতী ইউনিয়নে নৌকা প্রার্থীর গণসংযোগে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।। এ ঘটনায় চরতী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রুহুল্লাহ চৌধুরী ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মন্নানসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার চরতী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড কাটাখালী ব্রিজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নৌকার প্রার্থী আবু রেজা মুহাম্মদ নিজামুদ্দিন নদভী লিখিত বক্তব্যে এ হামলার ঘটনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মোতালেবের সমর্থকরা জড়িত বলে দাবি করেন। হামলার অভিযোগের বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। এ ঘটনার সঙ্গে রাজনীতি বা আসন্ন নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ঘটনার দায় কোনোমতেই আমাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীর নয়।’ প্রতিবেদন তৈরিতে রংপুর প্রতিনিধি, মাদারীপুর প্রতিনিধি, ফরিদপুর প্রতিনিধি, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-12-24 05:41:56.341519 +0100 CET