যায়যায়দিন
উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙার বছর

উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙার বছর

বৈশ্বিক তাপমাত্রার আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে ২০২৩ সাল। যা এ পর্যন্ত নথিভুক্ত উষ্ণতার রেকর্ডে সর্বোচ্চ। ১৮৫০ সাল থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা হচ্ছে। এর আগে, উষ্ণতম বছর হিসেবে গণ্য করা হতো ২০১৬ সালকে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ ইউরোপ ও উত্তর ইউরোপের দেশ ফ্রান্স, স্পেন এবং পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ দাবানল। আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তীব্র দাবদাহে পুড়ে। ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণাঞ্চল। শুধু ইউরোপ থেকে আমেরিকা নয়, তীব্র তাপদাহে বিপর্যস্ত হয় এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশে খরায় পুড়েছে ফসলের মাঠ। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের শস্য উৎপাদন-পঞ্জিকা বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। আউশ ও আমন ধান সম্পূর্ণভাবে বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার নতুন পানিতে মাছ ডিম ছাড়ে, আমন ও আউশ রোপণ করেন কৃষক। বর্ষার বৃষ্টির পানিতে পাট জাগ দেন কৃষক। এবার বর্ষার ভরা মৌসুম আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি হয়নি। খরায় চৌচির হয়েছে ফসলের মাঠ। পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারেনি কৃষক। ধনাঢ্য কৃষকরা সেচ দিয়ে আমন রোপণ করলেও মধ্যবিত্ত, ছোট ও বর্গাচাষি কৃষকরা তা পারেননি। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে আষাঢ়-শ্রাবণ ভরা বর্ষার মৌসুম। একফোঁটা বৃষ্টির আশায় চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল আমন চাষের জন্য সেচ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বৃষ্টির আশায় বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল দিনাজপুর পৌর শহরের রাজবাটি হীরাবাগান এলাকায় কালীমন্দির প্রাঙ্গণে। স্থানীয়ভাবে এই বিয়েকে বলা হয় ‘ব্যাঙ্গা-ব্যাঙ্গির’ বিয়ে। বরপক্ষে সুলেখাপ্রান্ত আর কনেপক্ষ চন্দনা রাণী মহন্ত এই বিয়ের আয়োজন করেন। আয়োজকরা বলেন, আমন ধান লাগানোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। এর থেকে মুক্তি পেতে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তারা এই বিয়ের আয়োজন করেন। এছাড়া এবার আমন মৌসুমে বৃষ্টির জন্য মাঠে মাঠে দোয়া করা হয়। চলতি বছর ঢাকায় ৫৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্র রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ৪ ডিগি সেলসিয়াস। আর দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় চুয়াডাঙ্গায় ৪৩ ডিগ্রি। দুঃসহ গরমে মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখিরও হয়েছিল বেহাল দশা। তীব্র তাপদাহের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন ধান কাটার শ্রমিক ও কৃষক। তীব্র গরমে পুড়ছে ফসলের মাঠ। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় শত শত হেক্টর জমির ফসল পুড়ে গেছে। ঘর থেকে বের হলেই গায়ে জ্বালা ধরায় তাপমাত্রা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহনীয় তাপদাহে গরম বাড়তে থাকে। সূর্যের প্রখর তাপে মানুষের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত হয়। তপ্ত রোদে খাঁ-খাঁ করে সড়ক জনপদ। বাতাসে আর্দ্রতা অস্বাভাবিক কম থাকায় গরমের সঙ্গে ঠোঁট ও চামড়া ফেটে যায়। শরীরে অনুভূত হয় তীব্র জ্বালা-পোড়া। খরতাপে দুর্বিষহ জনজীবন পার করতে হয়। দাবদাহে ভাপসা গরমে কাবু হয় সবাই। অসহনীয় তাপ আগুনের হল্কা হয়ে বিধে শরীরে। গরমে হাঁসফাঁস করে মানুষ। দুর্বিষহ গরমে হাঁপিয়ে ওঠে সবাই। বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি জেলা খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। বোরোর পর বৃষ্টিনির্ভর আমন মৌসুমে সবচেয়ে বেশি চাল আসে এ অঞ্চল থেকে। তবে ভরা বর্ষায়ও এবার খরায় পড়ে উত্তরাঞ্চল। খরতাপে ফেটে চৌচির হয় রোপা আমন খেত। ফসল বাঁচাতে কৃষক পানি তুলছেন গভীর নলকূপ দিয়ে। প্রচণ্ড খরায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ফসলের মাঠ পুড়ে চৌচির হয়। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বারমারির কৃষক ময়জুউদ্দিন জানান, বৃষ্টির অভাবে আমনের চারা পুড়ে যায়। মাটি ফেটে চৌচির হয়। খরার কারণে দেশের কয়েকটি জেলায় বোরো ধানক্ষেতে হিট শকের পর ব্ল্যাস্ট রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় নানান ধরনের কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এবং বিভিন্ন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয় বোরো ধান। কুড়িগ্রাম ও মৌলভীবাজারে ব্ল্যাস্ট রোগের সংক্রমণে কৃষকরা অসহায় বোধ করেন। গাজীপুরে অনাবৃষ্টিতে ফেটে যায় কৃষি জমি। প্রকৃতির এ বৈরী আচরণে খরচ বাড়ছে কৃষকদের। জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখীর এই বাজারে বোরোর পর আমনও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে তাদের চাপ বাড়ে বহুগুণে। দীর্ঘ খরায় খুলনাঞ্চলের ফসলের ক্ষেতও খরায় পুড়ে বগুড়ার ফসলের মাঠ। শ্রাবণ মাসেও বৃষ্টি না হওয়ায় ঠাকুরগাঁও জেলায় খরায় পুড়ে ফসলের মাঠ। কৃষিবিদ হামিদুল হক বলেন, খরা বাংলাদেশের একটি প্রচলিত দুর্যোগ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হেক্টর ফসলি জমি বিভিন্ন মাত্রায় খরায় আক্রান্ত হয়। এসবের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়। মার্চ ও এপ্রিলে খরা হলে আমন, আউশ ও পাট চাষকে বিলম্বিত করে। আগস্ট মাসে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের ফলে রোপা আমন বাধাগ্রস্ত হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে খরার ফলে আমন ধানের উৎপাদন কমে যায়। অতিরিক্ত খরার ফলে কাঁঠাল, লিচু, কলা ইত্যাদি ফলের গাছ মারা যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাচ্ছে এবং গম চাষে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ডক্টর আহসান কামাল বলেন, তাপমাত্রা যদি আর ২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায়, তবে আর গম চাষ করা সম্ভব হবে না। রবিশস্যের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রচণ্ড খরায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মেকং নদীবিধৌত বিশ্বের শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনামে খরা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। মেকং নদীর পানি অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় ভিয়েতনামের ফসলি জমির ৫০ শতাংশ লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। দেশে আড়াই কোটির বেশি মানুষ সুপেয় বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াও সংকটের মধ্যে পড়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে মালয়েশিয়াতেও। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএইচএস গ্লোবাল ইনসাইট জানিয়েছে, খরার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বছরে হাজার কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-12-25 04:31:11.535594 +0100 CET