যায়যায়দিন
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি ফেরেনি

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি ফেরেনি

মূল্যস্ফীতির সরকারি পরিসংখ্যানে স্বস্তির আভাস রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম বেশি হারে কমায় বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে সদ্য সমাপ্ত নভেম্বরে ‘পয়েন্ট টু পয়েন্ট’ ভিত্তিতে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে। এর আগের মাস অক্টোবরে সাধারণ মূল্যস্ফীতির এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান যা-ই হোক না কেন, সওদা করতে থলে হাতে বাজারে যাওয়া ক্রেতাদের দাবি, এখনো স্বস্তি ফেরেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে খাদ্য ও খাদ্যবহিভর্‚ত মূল্যস্ফীতি দুটোই কমেছে। তবে বেশি কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি; খাদ্যপণ্য খাতে আগের মাসের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। এটিই মূলত মূল্যস্ফীতি কমাতে ভ‚মিকা রেখেছে। যদিও এখনো তা ১০ শতাংশের বেশি। গত আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। এক দশকের মধ্যে গত আগস্ট মাসে হঠাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রথমবারের মতো দুই অঙ্কের ঘরে উঠে যায়। সে সময় চাল, ডাল, তেল, লবণ, মাছ, মাংস, সবজি, মসলা ও তামাকজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পায় বলে জানিয়েছিল বিবিএস। তবে সেপ্টেম্বরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ এসে দাঁড়ায়। এছাড়া খাদ্যবহিভর্‚ত খাতে মূল্যস্ফীতি আগস্টে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে এসে ঠেকে ৭ দশমিক ৮২ শতাংশে। যদিও মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী ধারা বেশিদিন ধরে রাখা যায়নি। এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাড়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। আর খাদ্যবহিভর্‚ত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ০১ শতাংশ হয়। অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো এর চাপ অনেক বেশি। শাকসবজি ও মাছ-মাংসের দাম কমলেও চালের দাম উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল আছে। সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি কমার সুযোগ আছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কমছে। ফলে স্থানীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সুযোগ আছে। এটি করা হলে জিনিসপত্রের দাম কমতে পারে। যদিও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলে দেশের বাজারে এর প্রতিফলন দেরিতে দেখা যায়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও ঝুঁকির মধ্যে চলে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত এক বছরে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা তেমন একটা কাজে আসেনি। যেমন ডিম আমদানি করার ঘোষণার অনেক দিন পর তা দেশে আসে। এছাড়া আগামী এক মাস রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আগামী দুই-তিন মাস মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কম। কারণ আসন্ন নির্বাচনের কারণে অর্থনৈতিক বিষয়ের চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা জরুরি। তা না হলে গরিব মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং ও সঠিক তথ্যভিত্তিক নীতিমালার অভাব আছে। সরকারও এসব বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রাম ও শহরের মানুষ খাদ্য ব্যয় মেটাতে চাপের মধ্যেই আছে। শুধু দরিদ্ররা নয়, নির্দিষ্ট ও মধ্যম আয়ের মানুষও এ চাপে ভুগছে। কারণ তাদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করতে হচ্ছে খাবার কিনতে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ স্তরে আছে, এটি নজিরবিহীন। সরকারের দাম নির্ধারণের নীতি কাজ করছে না। বাজারে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাই মুদ্রানীতিও এখন কাজ করছে না। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকা বাজারে ছাড়ার রেকর্ড গড়েছে। এসব অর্থ বাজারে এসে একদিকে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে কমিয়ে দিচ্ছে টাকার মান। উৎপাদনের চেয়ে টাকার প্রবাহ বেশি থাকায় বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম। ফলে বাজারে গিয়ে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মূল্যস্ফীতি। অথচ বাজেটে চলতি অর্থবছরে ৬ শতাংশের ঘরে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু এখন তা কিছুটা কমেও প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশে রয়েছে। এদিকে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি না ফেরার পেছনে হরতাল-অবরোধের মতো টানা কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় শ্রমজীবীসহ দৈনন্দিন উপার্জনভিত্তিক মানুষের আয় কমে যাওয়া অন্যতম একটি কারণ বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, পণ্যমূল্য কমার চেয়ে শ্রমিকদের আয় বেশি কমে যাওয়ায় তারা আগের সমান পণ্য কিনতে পারছেন না। এর অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হলো এ শ্রেণির প্রকৃত আয় কমেছে। আর তাদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার অর্থ হলো জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুফল শ্রমিক শ্রেণি পাচ্ছে না। পুঁজিপতি ও রেন্টসিকারদের কাছেই তা কুক্ষিগত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ডক্টর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আয় কমলে শ্রমিক শ্রেণি প্রথমেই খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়িয়ে এনে কোনো একটা কাজে দিয়ে হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করেন। অনেকেই চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাধ্য হন। এতে দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হয়, ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতাও কমে আসে। এ অবস্থায় দরিদ্র মানুষের মধ্যে দ্রুত রেয়াতি সুবিধায় খাদ্যপণ্য সরবরাহ জোরদার করার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ বাড়ানোরও সুপারিশ করেন তিনি। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকরা অনেকে মনে করেন, বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে পরিসংখ্যান দেয় তাতেও বেশকিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বিবিএস দেশে মূল্যস্ফীতির যে হিসাব দেয়, সাধারণ মানুষের ওপর দাম বাড়ার প্রভাব এর চেয়েও বেশি। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিবিএসের মূল্যস্ফীতির হিসাবের ঝুড়িতে বেশ বড় সংখ্যক পণ্য রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন মধ্য আয়ের মানুষ, ভোগ করে ২০ থেকে ২৫টি পণ্য। প্রায় ২০০টি পণ্যের তুলনায় এসব পণ্যের দামই গড়ে বেশি বাড়ে। সুতরাং বিবিএস যে হিসাব দেয়, সাধারণ মানুষের ওপর দাম বাড়ার প্রকৃত প্রভাব এর চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া টাকার দাম কমে যাওয়ার পাশাপাশি টাকার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু মানুষ বেশি দামে পণ্য কিনতে সক্ষম। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ধনীদের চাহিদার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভুগছে। এদিকে সরকারি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কম মূল্যে নিত্য খাদ্যপণ্য সরবরাহ করলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে ব্যর্থ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্য, সরকার দরিদ্র পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে এগুলো বিক্রি করছে। সারা দেশে টিসিবির ডিলার নেটওয়ার্ক রয়েছে। সুতরাং এটা এক ধরনের রেশনিং সিস্টেম। এটা কিছু মানুষের জন্য উপকারী। কিন্তু এটা দামের লাগাম টানার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে স্বস্তি দিতে পারছে না। এদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে রেশনিং ব্যবস্থা যায় না উল্লেখ করে বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বেশিরভাগ পণ্যের বিকিকিনিতে গুটিকয়েক প্রভাব বিস্তার করছে। এটা একচেটিয়া পদ্ধতি। যদি কর্তৃপক্ষ দ্বারা একচেটিয়া ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে তারা বাজার শাসন করবে এবং দাম ঠিক করে দেবে। তাই মুক্তবাজার দর্শনের পরিবর্তে মিশ্র অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সরকারকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, আমদানি ও উৎপাদনে আরও বড় ভ‚মিকা পালন করে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ভ‚মিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন তারা। যাযাদি/ এসএম
Published on: 2023-12-09 04:30:50.201117 +0100 CET