যায়যায়দিন
পেকুয়ায় ৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি অবৈধ দখলে

পেকুয়ায় ৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি অবৈধ দখলে

কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জের আওতাধীন বারবাকিয়া, টইটং ও পররচাঁদা বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার একরের বেশি বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। এই তিন বিটের আওতাধীন বনাঞ্চলের ভূমি দখল করে বসবাস করছে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। সরেজিমেন পরিদর্শন করে বন দখলের এমন চিত্র দেখা গেছে। বিগত ৮/১০বছর ধরে অবৈধ দখলদারেরা পেকুয়া উপজেলার তিন বনবিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে লাগামহীনভাবে পাকা দালান, আধা পাকা দালান, কাচা বসতবাড়িসহ নানা ধরনের স্থাপনা তৈরী করে জবর দখল করলেও নিষ্ক্রিয় রয়েছে বন বিভাগ। অভিযোগ রয়েছে, বারবাকিয়া রেঞ্জের অধীন টইটং, বারবাকিয়া ও পহরচাঁদা বনবিটে কর্মরত কতিপয় অসাধু বনবিট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই অবৈধ সুবিধা নিয়ে সংরক্ষিত বনভূমি দখলের সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। এছাড়াও সংরক্ষিত বনভূমিতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ অবাধে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করায় মানুষ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে বসবাসে’র দিকে ঝুঁকছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বারবাকিয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে বিভিন্ন পয়েন্টে পাহাড় কেটে চলছে অবাধে মাটি পাচার। এছাড়া প্রতিনিয়তই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ পাচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগ মাঝে মধ্যে কিছু ‘লোক দেখানো’ অভিযান পরিচালনা করলেও পাহাড় কাটা, বনভূমি জবরদখল, গাছকাটা বন্ধ করতে পারছেনা। টইটং, বারবাকিয়া ও পহরচাঁদা বনবিটের আওতাধীন প্রায় ১৪ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনভূমি আছে। এসব সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে প্রায় ৮ হাজার একরের বেশি বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বনভূমি দখলের সাথে জড়িত রয়েছে স্থানীয় গুটিকয়েক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিধিরাও। সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া বনরেঞ্জ। এ রেঞ্জের আওতাধীন টইটং বনবিট,বারবাকিয়া ও পহরচাঁদা বনবিটেই বেশিরভাগ সংরক্ষিত বনঞ্চলের জায়গা অবৈধ জবর দখল হয়ে গেছে। জবর দখলকৃত এসব বনভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে পাকা দালান, আধা-পাকা দালান, টিনের বসত বাড়ি, কাচা বসত বাড়িসহ নানা অবৈধ স্থাপনা। আবার অবৈধ জবর দখলের সাথে জড়িতরা নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য পাহাড় কেটে কাচা সড়কও তৈরী করেছে। এভাবে বিগত ৮/১০বছরে পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জের প্রায় ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল জবর দখল হয়ে গেছে। বিগত ২০১২ ও ২০১৫ইংরেজীতে বারবাকিয়া বনরেঞ্জ কিছু জায়গায় সামাজিক বনায়ন সৃজন করলেও বর্তমানে বনায়নের কোন অস্তিত্ব নেই। নামেমাত্র বনায়ন করে লাখ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা সামাজিক বনায়ন সৃজনের নামে অনিয়ম-দুর্ণীতির মাধ্যমে সরকারী বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ায় সামাজিক বনায়নের সুফল পায়নি উপকারভোগীরা। বারবাকিয়া বনরেঞ্জের আওতাধীন টইটং সংরক্ষিত বনে বসবাসরত মর্জিনা বেগম বলেন, গত ৮/১০বছর পূর্বে স্থানীয় এক দখলদারের কাছ থেকে তাঁর স্বামী বনের জায়গা কিনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তবে কোনো দলিলপত্র নেই। মাঝে মাঝে স্থানীয় বনবিটের কর্মচারীরা বাড়িতে এসে উচ্ছেদের হুমকি দেয়। তখন তাদের কিছু টাকা দিলে তারা আর উচ্ছেদ করেনা। শুধু মর্জিনা বেগম নয়,এরকম হাজার মানুষ বনের জায়গায় বসতি করে নিয়মিত বনবিভাগের কর্মচারীদের টাকা দিয়ে পাহাড়ে বছরের পর বছর অবৈধভাবে বসবাস করে আসছে। এ প্রসঙ্গে বারবাকিয়া রেঞ্জের অধীন টইটং বনবিট কর্মকর্তা জমির উদ্দিন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টইটং বনবিটের প্রায় চার একরেরও বেশি সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। অধিকাংশ বনভূমিই বেদখল হয়ে গেছে। তিনি টইটং বনবিটে যোগদান করার পর থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য বেশ কিছু বন মামলাও দায়ের করেছেন। মামলা দিয়েও দখলবাজদের ঠেকানো যাচ্ছেনা বলে স্বীকার করেছেন বন বিভাগের এ কর্মকর্তা। বারবাকিয়া বনবিটের অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, বারবাকিয়া বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার একর বনভূমির দখলদারেরা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। এ ছাড়া বনাঞ্চলের ভূমি দখল করে বসবাস করছে শত শত পরিবার। তিনি বলেন, এই বিটে বর্তমানে জনবল-সংকট আছে। জনবল সংকটের কারণে উচ্ছেদ অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। পেকুয়ার পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতা মো: রেজাউল করিম জানান, বারবাকিয়া পাহাড়ের । পাহাড়ের ভেতর গড়ে উঠছে শত শত পাকা স্থাপনা। নির্বিচারে পাহাড় এবং গাছপালা কাটার কারণে পাহাড়ের জীববৈচিত্র আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। পাহাড় দখল, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং অবৈধ পাকা দালান নির্মাণের ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, গভীর অরণ্য কেটে ফেলার ফলে বন্যহাতি লোকালয়ে এসে মানুষ মারছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন বিভাগকে আরো কঠোর হওয়ার পরামশর্ষ দেন এই পরিবেশ নেতা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বারাবকিয়া বনবিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হ্যাডম্যান নামধারী দালাল প্রকৃতির লোকের মাধ্যমে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই প্রতিনিয়ত বন থেকে গাছ কাটছে আর অবৈধ বিলাসবহুল পাকা বাড়ি নির্মাণ করে চলছে এক শ্রেণির মানুষ। ফলে নিধন হচ্ছে গাছপালা, উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। অভিযোগ করা হলে বা উপর মহলের চাপ আসলে বরাবরের মতো লোক দেখানো অভিযান করে পরবর্তীতে টাকা নিয়ে সেই ঘর নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেয় খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তারা। বারবাকিয়া রেঞ্জের অধীন পহরচাঁদা বনবিট কর্মকর্তা মো: শাহ আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, তার বনবিটে অধীন ২ হাজার ৮’শ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। ১ হাজার একরেও বেশি বনভূমিই জবর দখল করে ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা তৈরীর কথা এ কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন। পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: হাবিবুল হক জানান, তিনি অত্র রেঞ্জে যোগদান করার পর থেকে বনভূমি রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি আসার আগেই অধিকাংশ বনভূমি জবর দখল হয়ে গেছে। এখন তিনি চেষ্টা করছেন জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করে সামাজিক বনায়নের আওতায় নিয়ে আসতে। বন বিভাগের কর্মচারীদের ম্যানেজ করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-07-16 05:49:19.367588 +0200 CEST