যায়যায়দিন
ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট গেল কই?

ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট গেল কই?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে এক লাখ ৬৪ হাজার ৬১০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। একই আসনে উপনির্বাচনে মাত্র ২৮ হাজার ৮১৬ ভোট পেয়ে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাত জয়ী হয়েছেন। যা এই আসনের সর্ব মোট তিন লাখ ২৫ হাজার ২০৫ ভোটের মাত্র ৮.৮৬ শতাংশ। এই উপনির্বাচনে মোট ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোটের খরা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। মাত্র সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে চিত্রনায়ক ফারুকের পাওয়া আওয়ামী লীগের আরও এক লাখ ৩৬ হাজার ভোট গেল কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানতে ব্যর্থ হওয়ায় এই উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিতে এত বড় বিপর্যয় ঘটেছে। আবার অনেকে মনে করেন, নানা কারণে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের আস্থা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। এ ছাড়া উপনির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মেয়াদ ছয় মাসের কম হওয়ায় ভোটদানে অনেকে আগ্রহ হারিয়েছেন। যদিও দলীয় ইমেজ রক্ষার খাতিরে হলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোট দিতে আসেনি, কেন সেটা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দাবি করেন, ৮৫ শতাংশ লোক তাদের সমর্থন করে। তাহলে এই ভোটগুলো গেল কই। কেন মাত্র ৮.৮৬ শতাংশ ভোট নিয়ে ঢাকা ১৭-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনের সংসদ সদস্য হতে হবে। তবে কি নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের নেতিবাচক প্রচারণা কাজ করেছে? ভোটাররা কি এতে প্রভাবিত হয়েছেন? নাকি ভোটাররা মনে করেছেন, ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই। এদিকে প্রধান বিরোধী দলের নেতাদের দাবি, ভোটারদের অনীহার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বর্তমান সরকার ও ইসির ওপর জনগণের আস্থাহীনতা। ভোটাররা মনে করেন, তাদের অধীন নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। তাই ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই। একই কথা ভেবে খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক ভোটাররাও ভোট দিতে যাননি বলে মনে করেন তারা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কর্মীরা এ নিয়ে বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের যেসব গুরুত্বপূর্ণ নেতা রয়েছেন, তারা প্রায় কেউই এই উপনির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাননি। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনার উদ্যোগ নেওয়া দূরে থাক, এই উপনির্বাচন স্বতস্ফূর্ত করে তুলতেও তারা কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেননি। প্রচারণার মাঠে তাদের উপস্থিতিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে দলীয় ভোটাররা ভোটদানে উদ্বুব্ধ হননি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা অনেকেই অবশ্য ভোটের এই বড় বিপর্যয় নিয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন। তাদের ভাষ্য, গুলশান, বনানী, ঢাকা সেনানিবাস এবং ভাসানটেকের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের এই আসনের ভোটারদের একটি বড় অংশ অভিজাত শ্রেণির। উপনির্বাচনে এই শ্রেণির মানুষকে ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে আসতে খুবই কম দেখা গেছে। ভোটকেন্দ্রে সাধারণভাবে যেসব ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে, এর বেশিরভাগই ছিল নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ। মোটা দাগে চার কারণে এই উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাই ভোট দিতে আসেননি। তারা এলে ৪০ শতাংশ ভোট পড়ত। কারণ, তাদের তো অন্তত ৩০ শতাংশ ভোট আছে। এর পেছনে কারণ হতে পারে, রাজনৈতিকভাবে অপরিচিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া। নৌকার প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাত প্রার্থী হিসেবে খারাপ বলছি না। তবে রাজনৈতিক কর্মী নন তিনি। এর প্রভাব ভোটে পড়েছে। ভোটে ছিল না মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এ জন্য ভোট কম পড়েছে। মানুষ মনে করেছে, ভোট দিয়ে কী হবে? দিলেও যেই, না দিলেও সেই। অন্যদিকে সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ ছিল না, কারণ চার মাসের জন্য এমপি বানিয়ে কী হবে-এ ধারণা থেকে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ মনে করেন, মানুষ ভোটের প্রতি চরম মাত্রায় ডিমোটিভেটেড। নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নেই। নিজের ভোটকে অর্থহীন মনে করছে। ঢাকা-১৭ আসনকে এলিট শ্রেণির বলে অজুহাত দাঁড় করানো যেতে পারে। কিন্তু এর আগেও এখানে ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এবার কেন মানুষ ভোটে যায়নি, এর উত্তর খোঁজা উচিত রাজনীতিবিদ ও নির্বাচন কমিশনের। এই আসনে মোট ভোটার বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থী আরাফাত ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও ‘হিরো’ আলম ১ দশমিক ৭২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মোট আটজন। মোহাম্মদ এ আরাফাত ও ‘হিরো’ আলম ছাড়া বাকিরা হলেন- জাতীয় পার্টির সিকদার আনিসুর রহমান, জাকের পার্টির কাজী মো. রাশিদুল হাসান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. রেজাউল ইসলাম স্বপন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের মো. আকবর হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. তারিকুল ইসলাম। তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা যথাক্রমেÑ এক হাজার ৩২৮, ৯২৩, ২০২, ৪৩, ৬৪ ও ৫২। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-07-19 06:43:48.128929 +0200 CEST