যায়যায়দিন
নাটকীয়তা : ডেটলাইন ২৮ জুলাই

নাটকীয়তা : ডেটলাইন ২৮ জুলাই

সমাবেশস্থল ঘিরে দিনভর নাটকীয়তার পর অবশেষে ১ দিন পিছিয়ে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজনৈতিক দলগুলোকে বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভিন্ন স্পটে প্রত্যাশী অনুযায়ী কর্মসূচির স্থানের অনুমতি না দেওয়ায় প্রথমে বিএনপি এবং পরে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে শুক্রবার কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে আজ ঢাকায় সমাবেশের নগরী হওয়ার কথা থাকলেও তা আগামীকাল শুক্রবার মিছিল-সমাবেশে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে রাজধানী। পাশাপাশি শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকেই গেল। নানা নাটকীয়তার পর এখন ডেটলাইন ২৮ জুলাই। গত ২২ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে করা তারুণ্যের সমাবেশ থেকে ২৭ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরপর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অথবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের জন্য জায়গা চেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি দেয় দলটি। অন্যদিকে ওইদিনই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে যুবলীগের সমাবেশ থেকে ‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’ শীর্ষক সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল ২৪ জুলাই। কিন্তু বিএনপির মহাসমাবেশ ঘোষণার পর ‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’ সমাবেশ পিছিয়ে ২৭ জুলাই করার সিদ্ধান্ত নেয় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ। এমনি পরিস্থিতিতে বুধবার জনদুর্ভোগ এড়াতে সমাবেশের ভেন্যুর জন্য বিকল্প প্রস্তাব দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপি। বিএনপিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে গোলাপবাগ মাঠে এবং শাসক দলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠ অথবা মহানগর নাট্যমঞ্চে সমাবেশ করার কথা বলা হয়। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক জানান, ‘বৃহস্পতিবার যেহেতু কর্মদিবস, সে কারণেই নয়াপল্টন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দিতে চান না তারা। এই পরিপ্রেক্ষিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বসে বিকাল ৪টায়। দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পর রাত সাড়ে ৮টায় দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ২৭ জুলাইয়ের পরিবর্তে আগামী ২৮ জুলাই শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন বেলা ২টায় নয়াপল্টনে পূর্বঘোষিত মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিচ্ছে।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আশা করি দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠারর লক্ষ্যে চলমান গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানে সরকার কিংবা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান বাধা সৃষ্টি করবে না। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত যে কোনো গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো অপচেষ্টা দেশবাসী প্রকৃতপক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে বাধা সৃষ্টি হিসেবেই দেখবে এবং এমন অপচেষ্টা গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা সৃষ্টিকারী হিসেবে গণ্য হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উচ্চ আদালতের আপত্তি ও কর্মদিবসে নয়াপল্টনের সমাবেশ অনুষ্ঠানের আপত্তির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘যদিও ইতোপূর্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ও কর্মদিবসে নয়াপল্টনে অসংখ্য সমাবেশ-মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানে দৃষ্টান্ত রয়েছে।’ জানা গেছে, বিএনপি এক দফার আন্দোলন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতেই এই মহাসমাবেশ ডেকেছে। সরকার ‘নির্বাচনী সংকট’ সমাধানে আগ্রহী নয় ধরে নিয়েই দলটি তাদের আন্দোলন পরিকল্পনা এখন রাজপথে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে। এই মহাসমাবেশে ‘নজিরবিহীন’ উপস্থিতি ঘটানোর সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নেতাকর্মীদের ঢাকার মহাসমাবেশ সফল করার আহ্বান জানিয়ে ভিডিও বক্তব্য দিয়েছেন। সাংগঠনিক সব ইউনিটে সর্বোচ্চ সমাগম নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘চলো চলো, ঢাকা চলো’ এমন স্লোগান উঠেছে। জানা গেছে, ঢাকায় মহাসমাবেশ করে এক দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে ৩০ জুলাই রোববার থেকে টানা কর্মসূচিতে যাওয়ার চিন্তা করছে বিএনপিসহ শরিক দলগুলো। এই কর্মসূচির মধ্যে থাকতে পারে বিক্ষোভ, সমাবেশ, অবস্থান ও ঘেরাও। ১০ আগস্ট পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলতে পারে। এই সময়ের মধ্যে ঢাকায় একই দিন একাধিক স্থানে সমাবেশের কর্মসূচিও আসতে পারে। তবে ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের কারণে এক দফার কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত রাখব হতে পারে এই সময়ের মধ্যেও ক্ষমতাসীনরা সাড়া না দিলে পরে ২০ আগস্ট থেকে ফের লাগাতার কর্মসূচিতে যাবে বিএনপি। এ সময় ঢাকায় ঘেরাওয়ের সঙ্গে টানা অবস্থানের কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চায় দলটি। জানা গেছে, আহূত সমাবেশে বাধা কিংবা সমাবেশ ভণ্ডুল করে দিলে কর্মসূচির ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজধানীর একাধিক জায়গায় নেতাকর্মী জমায়েত হয়ে সমাবেশ করতে পারেন অথবা টানা অবস্থানের কর্মসূচিও আসতে পারে। এদিকে যুগপৎ আন্দোলনের অন্যান্য শরিক দল ও জোটগুলোও এক দিন পিছিয়ে শুক্রবার ঢাকায় পৃথকভাবে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি তাদের বৃহস্পতিবারের মহাসমাবেশ পেছানোর ঘোষণা দেওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যেই যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের সমাবেশ পেছানোর ঘোষণা দিয়েছে। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের সমাবেশ ২৭ জুলাই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে করার কথা জানিয়েছিল। বিএনপি সমাবেশ পেছানোর ঘোষণা দেওয়ার পর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের সমাবেশ ২৮ জুলাই শেরেবাংলা নগরে বাণিজ্যমেলার পুরনো মাঠে করার ঘোষণা দিল। এ বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বলেন, ‘শেরেবাংলা নগরের মেলা মাঠে ‘‘তারুণ্যের জয়যাত্রা’’ আয়োজন করতে চাই। তবে মাঠটি সমাবেশ আয়োজনের জন্য প্রস্তুত করতে আরও এক দিন সময় লাগবে। মাঠ প্রস্তুতের জন্য সমাবেশ এক দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ গত ডিসেম্বর থেকেই ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল ঢাকাসহ সারা দেশে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আসছে। বিএনপিসহ বিরোধীরা কর্মসূচি ঘোষণা করলে সেদিন রাজপথে কর্মসূচি রাখছে ক্ষমতাসীন দলও। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, কোনো পরিস্থিতিতে রাজপথের দখল ছাড়বে না ক্ষমতাসীনরা। দলটি মনে করে, সরকারের পতন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভণ্ডুলের লক্ষ্যেই বিএনপি ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে। ২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী অবস্থান নিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর যে চেষ্টা চালিয়েছিল, তাও মাথায় আছে আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারকদের। এসব বিষয় সামনে রেখেই ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশের দিন তিন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ব্যানারে পালটা কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক জমায়েতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দফায় দফায় চলেছে প্রস্তুতি সভা। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। সমাবেশে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মহানগরের প্রতিটি অলিগলিতে সতর্ক নজরদারি করতে বলা হয়। জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের সব জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় আসতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা থেকে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের কমপক্ষে শতাধিক বাস ছেড়ে আসবে ঢাকায় মহাসমাবেশের উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিভাগ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসবেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা যাতে রাজধানীর কোনো স্থানে অবস্থান নিতে না পারেন, সেজন্য মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে পাহারায় থাকবেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-07-27 05:09:43.213957 +0200 CEST