যায়যায়দিন
রাজনীতিতে জামায়াতের ‘রহস্যময়’ সক্রিয়তা

রাজনীতিতে জামায়াতের ‘রহস্যময়’ সক্রিয়তা

মাঠের রাজনীতিতে আবারও সরব হতে পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। এর অংশ হিসেবে ফের পহেলা আগস্ট ঢাকায় সমাবেশসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ধর্মভিত্তিক এ দলটি। পুলিশের অনুমতি পেলে এদিন ঢাকায় বড় ধরনের লোক সমাবেশ ঘটিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেওয়া হবে। দলের নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্যেই এমন দাবি করছেন। একই সঙ্গে আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে কৌশলে শক্ত প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নেতাকর্মীরা সামাজিক কর্মসূচির আদলে সারা দেশে নিয়মিত রুকন সমাবেশ, দাওয়াতি ও সাংগঠনিক কাজ করে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে জামায়াত কৌশলে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। যদিও ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এ দলটির সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের ‘রহস্যময়’ সক্রিয়তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তারা মূলত কোনো টার্গেট পূরণ করতে চায় তা এখন জনমনে প্রধান জিজ্ঞাসু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিবন্ধনহীন এ দলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নাকি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে গাঁটছড়া বাঁধতে, নাকি স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটের মাঠে লড়বে তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল বাড়ছে। এদিকে আজকের (শুক্রবার) মহাসমাবেশের পর নেতাকর্মীদের ঢাকায় রেখে বিএনপি রাজপথের আন্দোলন দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনার মধ্যে জামায়াতের ১ আগস্ট সমাবেশের তোড়জোড় প্রস্তুতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের আশঙ্কা, হেফাজতের শাপলা চত্বরের মতো কোনো মিশন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত হয়তো রাজনৈতিক আন্দোলনের এ ছক কষেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা জামায়াতের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয়ের কোনো টার্গেট নেই। তারা মূলত রাজপথে উত্তাপ ছড়িয়ে সরকারকে চাপে রেখে গত কয়েক বছরে তাদের গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের ছাড়িয়ে নিতে চায়। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি আদায়ের ফন্দিও আঁটতে পারে। যদিও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা তাদের আকস্মিক সক্রিয় হয়ে ওঠা নিয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন। তাদের দাবি, কোনো দূরভিসন্ধি নিয়ে নয়, রাজপথে অধিকার আদায়ে তারা দলের নেতাকর্মীদের চাঙা করতে চাইছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাও তাদের অন্যতম টার্গেট। এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম জানান, জামায়াত সবসময় নির্বাচনমুখী দল। এ ব্যাপারে তাদের শতভাগ সাংগঠনিক প্রস্তুতি রয়েছে। তাদের প্রস্তুতির ধরন বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের মতো নয়। জামায়াত ইতিমধ্যে শতাধিক আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে ৫ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে জামায়াত। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ ইজ্জত উল্লাহ। আরও রয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত। যেসব উপজেলায় দলটির চেয়ারম্যান কিংবা ভাইস চেয়ারম্যান আছে সেসব নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জনগণ বুঝে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। জামায়াতও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। সরকারের প্রলোভনে পড়ার সম্ভাবনা জামায়াতের নেই। জামায়াত নেতারা বলছেন, চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে রিহার্সাল হিসেবে সমাবেশ, বিক্ষোভ কিংবা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তারা। প্রসঙ্গত, গত সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান ১ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তিন দিনের কর্মসূচির মধ্যে দলটি ঢাকায় সমাবেশের আগে ৩০ জুলাই জেলা শহরগুলোতে মিছিল করবে। এর আগে আজ ২৮ জুলাই সব মহানগরে মিছিলের কর্মসূচিও রেখেছে জামায়াত। সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, জামায়াতের আমিরসহ গ্রেপ্তার নেতাকর্মী ও আলেমদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াতে ইসলামী এ কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচি ঘোষণা করতে গিয়ে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান বলেন, ‘২০১৪ ও ২০১৮ সালের স্টাইলে নির্বাচন করার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজাচ্ছে।’ মুজিবুর রহমান অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীকে সভা-সমাবেশ ও মিছিল করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করার পরও সম্প্রতি সিলেট ও চট্টগ্রামে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বরং জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, তারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। অনুমতি নিয়ে রাজপথে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান জানান দিবেন। সংঘাত এড়িয়ে ব্যাপক শোডাউন করতে চায় দলটি। কারণ অনুমতি ছাড়া মাঠে নেমে তাদের নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের কবলে পড়ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংগঠন। তখন পাশে মিত্রদের পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য জামায়াত এই কৌশল বেছে নিয়েছে। জানা গেছে, পহেলা আগস্টের সমাবেশে ঢাকা মহানগর এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যাতে যোগ দেন সে ব্যাপারেও তারা তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এজন্য ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে যেমন জামায়াতের নেতাকর্মীরা নীরবে জনসংযোগ চালাচ্ছেন, তেমনি ঢাকার বাইরেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের তৎপরতা রয়েছে। এই সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াত তুলে ধরতে চায় যে দল হিসেবে তারা এখনো ‘দুর্বল হয়নি’ এবং তাদের নেতাকর্মীরা এখনো ‘সক্রিয় ও চাঙা’ রয়েছে। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর কোনো নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকার মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর অফিসগুলোও বছরের পর বছর ধরে বন্ধ। ২০১৪ সালের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রকাশ্যে তেমন কোনো কর্মসূচিও নেই। যদিও বিভিন্ন সময় তারা ঝটিকা মিটিং-মিছিল করার চেষ্টা করেছে। তাই মাঠের রাজনীতিতে সরব হওয়ার এখনই ‘আসল সময়’ বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচন যাতে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ হয় সে লক্ষ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে- তা জামায়াতের জন্য নতুন ‘সুযোগ’ তৈরি করেছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের এই ভিসানীতিতে যেসব কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বানচালের আওতায় ফেলবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার প্রয়োগ করা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা। ফলে গত ১০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে জামায়াতে যে অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করছিল, সে সুযোগ মিলেছে। যদিও জামায়াতের নেতারা আমেরিকার ভিসানীতিতে উৎসাহিত হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেননি। ঢাকার সমাবেশ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম জানান, তাদের মূল উদ্দেশ্য কর্মীদের চাঙা করা। দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীরা মাঠে কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা দরকার। রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজপথে না নামলে সাংগঠনিক মান উন্নয়ন হয় না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন ফিরে না পেলে আমরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করব। হয়তো বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা কিংবা নির্বাচনকালীন জোটও হতে পারে। তবে এখনই তা স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না।’ যাযাদি/ এস
Published on: 2023-07-28 05:32:39.854084 +0200 CEST