যায়যায়দিন
চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় সবকিছু লণ্ডভণ্ড

চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় সবকিছু লণ্ডভণ্ড

চট্টগ্রামে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সবকিছু। জেলার তিন উপজেলা সাতকানিয়া-লোহাগাড়া-চন্দনাইশে বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। রোববার পর্যন্ত শিশু ও বৃদ্ধসহ মোট ১৭ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, তিন উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকায় বেশিরভাগ মাটির ঘর ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে পাকাঘরের আসবাবপত্র। তিন উপজেলার বুক চিরে যাওয়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও কেরানিহাট-বান্দরবান সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে গেছে। এ ছাড়া দুটি সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। টানা দুই দিন সড়কের ওপর হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি জমে থাকা পানি নামার পর বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আঞ্চলিক সড়কের কোনো কোনো অংশ স্রোতে ভেসে গেছে। ফলে ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। এ ছাড়া ফসলের ক্ষেত, মাছের ঘের ভেসে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিন উপজেলার বাসিন্দারা। সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত ছদাহা ইউনিয়নের আঞ্চলিক প্রধান সড়ক দস্তিদার হাট থেকে মিটাদিঘী পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়কে শতাধিক স্থানে ভাঙন দেখা গেছে। এ ছাড়া খানাখন্দে ভরা সড়কটি দিয়ে এখন যাতায়াতের উপায় নেই। একই ইউনিয়নের ফকিরহাট থেকে পূর্ব ছদাহা সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের কারণে অনেকটাই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাজালিয়া ইউনিয়নের মাহালিয়া সড়কের দশাও বেহাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকার সড়কের কোথাও মাটি ক্ষয়ে গেছে, কোথাও আবার পলেস্তরা একেবারে ভেসে গেছে। ফলশ্রুতিতে এসব এলাকার সড়কগুলো অনেকটাই চলাচলের অনুপযোগী। এ বিষয়ে এলজিইডি নির্বাহী পরিচালক (চট্টগ্রাম) মোহাম্মদ হাসান আলী বলেন, ‘বন্যায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছেন। কয়েকদিনের মধ্যে এই কাজটি শেষ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব। এরপর সড়কগুলো দ্রুত মেরামত করে চলাচল উপযোগী করা হবে।’ টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন। রেললাইনের কেরানিহাট ও তেমুহনী কেঁওচিয়া এলাকার দুই কিলোমিটার রেললাইনের অন্তত ২০ স্থানে দেবে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পাথর সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী জমিতে পড়েছে। এ ছাড়াও লাইনের বিভিন্ন অংশের মাটি ক্ষয়ে গেছে। অথচ আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এই লেন দিয়ে ট্রেন কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত ৮৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে বন্যার এই ক্ষয়ক্ষতি যথাসময় ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না জানিয়ে এই প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘বন্যার কারণে সাতকানিয়া উপজেলার তেমুহনী মৌজায় আধ-কিলোমিটারের মতো অংশে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে পানির ঘূর্ণির কারণে রেললাইনের নিচের মাটি ক্ষয়ে গেছে। এগুলো ঠিক করার জন্য আলাদা টিম কাজ করবে। মূল প্রকল্পের সঙ্গে এটি সম্পৃক্ত নয়। প্রকল্পের কাজও চলবে আবার একইসঙ্গে মেরামতও চলবে। সুতরাং, যথাসময় প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেললাইনে বন্যা হবে, এটি স্বাভাবিক বিষয়। সিলেট অঞ্চলে প্রায় সময় বন্যা হয়। ওই রোডে ট্রেন চলে না? এ ছাড়া কক্সবাজার অংশে জলোচ্ছ্বাস হবে এই চিন্তা থেকে রেললাইন এমনিতে উঁচু করা হয়েছে। এটি মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু। তবে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া অংশে এবার পাহাড়ি ঢল নেমেছে। এ রকম পানি স্মরণকালে হয়নি। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডির সময় অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন যেহেতু এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, প্রয়োজনে রেললাইনের বিশেষ অংশ আরও উঁচু করা হবে।’ জানা গেছে, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায়। ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকল্পটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালে ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালের ৩০ জুনে। পরে এক দফা বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ করা হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও ব্যয় বাড়েনি। রেলপথটি নির্মিত হলে মিয়ানমার, চীনসহ ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের করিডোরে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-08-14 05:40:15.829206 +0200 CEST