যায়যায়দিন
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও শনাক্তে ছাড়াতে পারে রেকর্ড

ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও শনাক্তে ছাড়াতে পারে রেকর্ড

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি চলতি আগস্ট মাসে আরও ‘ভয়াবহ’ হতে পারে- এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার ধরন ও বৈশিষ্ট্য বদলানোর কারণে প্রকৃতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি, ময়লা পানিতে এডিসের অস্তিত্ব পাওয়া, কৃত্রিম আলোতেও এই মশা সক্রিয় থাকা, জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের আচরণগত পরিবর্তন, দেরিতে বর্ষা শুরু হওয়া ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সারা দেশে এই মশার বিস্তার ঘটার কারণে লম্বা সময় ধরে এ বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া অতীতে দেখা গেছে বৃষ্টিপাত বাড়ার কারণে সাধারণত আগস্ট মাস থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এসব বিবেচনায় রেখে আগস্টে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়, যা মারাত্মক আকার ধারণ করে জুনে। জুলাইয়ে এসে তা আরও চরম আকার ধারণ করে। জুন মাসের তুলনায় সাতগুণের বেশি মানুষ জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুও হয়েছে বেশি। এ বছরের প্রথম সাত মাসেই এডিস মশাবাহী ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। জুলাই পর্যন্ত ৫১ হাজার ৮৩২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ২৫১ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসেই মারা গেছেন ২০৪ জন। ফলে আগস্ট মাস নিয়ে দেখা দিচ্ছে নতুন শঙ্কা। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, ‘যত বৃষ্টিপাত হবে, গরম বেশি পড়বে, যত আর্দ্রতা বাড়বে যত বেশি অপরিকল্পিত নগরায়ন হবে, তত বেশি ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এডিসের জন্য আমরা সারা বছর একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছি।’ তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি এবং এ পর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা চলতি বছরের আগস্টে পরিস্থিতি বিরূপ আকার ধারণ করে অতীতের রেকর্ড ছাড়াতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু সংক্রমণের লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম উচ্চমাত্রায় জ্বর। এজন্য তাই জ্বর হলেই দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। ডেঙ্গুর ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশে এখন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ভাইরাল ফ্লু’র মৌসুমও চলছে। ডেঙ্গুর মতো এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। বড়দের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরাও। অনেকের জ্বরের সঙ্গে রয়েছে সর্দি-কাশি। শিশুদের জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ‘ভয়’ ধরাচ্ছে স্বজনদের। তারা বলছেন, বর্তমানে যারা জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্তও রয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং বাকিরা করোনা ভাইরাসসহ সাধারণ জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছেন। আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি নিয়ে রাজধানীর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বেই হঠাৎ দাবদাহ বা অতিবৃষ্টি হচ্ছে। তাই সারা বছরই ডেঙ্গু থাকবে। তবে বর্ষার শুরু এবং শেষে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি থাকবে। তাই জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়ংকর।’ এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ বৃষ্টির সাথে এডিস মশার প্রজনন বাড়ে। আগস্টে পুরোপুরি বৃষ্টির সিজন থাকে। এ সময় এডিস মশা তার বংশ বিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ পায়। তাছাড়া বছরের এ সময় নির্মাণকাজ বেড়ে যায়। তাই আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে কমবে। যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, সংক্রমণ আগস্টে শীর্ষে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।’ অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর বাহক যে এডিস মশা, তাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে তো ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতেই থাকবে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের জন্য সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে যে একটি সুসমন্বিত অভিযানের দরকার, সেটা আসলে পরিকল্পনাও করা হয়নি, শুরুও করা হয়নি। যে ওষুধ, মাঠ পর্যায়ে সেটা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার, ডেঙ্গুর বাহক যে এডিস মশা, সেটা দমন বা নির্মূল করার ব্যর্থতার জন্যই মূলত ডেঙ্গুর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডক্টর কবিরুল বাশার বিবিসিকে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে মশার বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনসহ মানুষের আচরণগত কারণে প্রকৃতিতে এদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ময়লা পানিতেও এর অস্তিত্ব মিলেছে। আবার কৃত্রিম আলোতে সক্রিয় থাকার ক্ষমতা অর্জনের কারণে এই মশা লম্বা সময় ধরে সংক্রমণ করে যেতে পারছে। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট মাসে আরও ভয়াবহ হতে পারে। জানা যায়, গত ১৮ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৮টি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন ৫৫টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু তা তেমন কাজে আসেনি। জনগণের মধ্যেও বাড়েনি সচেতনতা। ফলে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। এ বছর সারা দেশেই লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ফলে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলতি আগস্টে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অতীতের রেকর্ড ছাপিয়ে যেতে পারে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-08-02 05:57:26.400177 +0200 CEST