যায়যায়দিন
টাঙ্গাইলে আনারসের বাজার মন্দা, স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

টাঙ্গাইলে আনারসের বাজার মন্দা, স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

রসালো আনারসের জন্য প্রসিদ্ধ টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুর উপজেলা। মধুপুরকে বলা হয় আনারসের রাজধানী। ভরা মৌসুমে বাজার মন্দা থাকায় লোকসানে পড়ে আনারস চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা। পরিমিত কেমিক্যাল ব্যবহারে চাষিদের প্রশিক্ষণের তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কেউ কেউ বিদেশি জাতের এমডি-২ আনারস চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠছেন। সাধারণত জুলাই-সেপ্টেম্বর আনারসের ভরা মৌসুম। এ সময় মধুপুর ও ঘাটাইলে আনারসকে ঘিরে কৃষক, পাইকার, মহাজন ও স্থানীয় পরিবহণ শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কাক ডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার হাটবাজারে আনারসের বেচাকেনা জমে উঠে। স্থানীয় চাষি ও পাইকারদের দম ফেলার সময় নেই। এতদাঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আনারস প্রতিদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যাচ্ছে। এদিকে, চাষিরা আশায় বুক বাঁধলেও এবার ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। গত ১০ বছরের মধ্যে এবার আনারসের বাজারে সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে। এই মন্দায় আনারস চাষিরা লোকসান গুণতে বাধ্য হচ্ছেন। চাষিদের মুখে অতীতের সেই হাসি নেই। দাম কম থাকায় পাইকার ফড়িয়ারাও সুবিধা করতে পারছেন না। উৎপাদন খরচ ঘরে তুলতে না পারায় অনেক চাষি আগামীতে আনারস চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। মধুপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর উপজেলায় গত বছরের চেয়ে এবার আনারসের চাষ বেশি হয়েছে। এতদাঞ্চলে ইতোপূর্বে জায়ান্টকিউ বা ক্যালেন্ডার, হানিকুইন বা জলডুগীÑ এই দুই জাতের আনারসের চাষ হতো। এবার থেকে বিশ^খ্যাত ফিলিপাইনের সুপার সুইট এমডি-২ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকার লাল মাটিতে জায়ান্টকিউ বা ক্যালেন্ডার জাতের আনারস সবচেয়ে বেশি চাষ হয়ে থাকে। এ সময় বাগান ও বাজারে আনারসের মৌ মৌ গন্ধ। এই মৌসুমেই এতদাঞ্চলের অর্র্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই আনারস। বাজার মন্দা থাকায় এবার লাভের অংক কৃষকের পকেটে আসছে না। লোকসানে হতাশায় দিন গুণছে কৃষক। ব্যাংক লোন, সারের দোকান বাকি এবং শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সরেজমিন মধুপুরের জলছত্র, মোটের বাজার, ইদিলপুর, পিরোজপুর, দোখলা, সানিয়ামারি ও আউশনারা; ঘাটাইল উপজেলার সাগরদীঘি, গারোবাজার, পাকুটিয়া এবং সখীপুর উপজেলার কচুয়া, বড় চওনা বাজারে গিয়ে কৃষক, পাইকার, ফড়িয়া ও মহাজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত বছরের চেয়ে এ বছর বাণিজ্যিক চাষ বেশি হওয়ায় আনারসের বাজার মন্দা। বাণিজ্যিক চাষের ফলে অতি মুনাফালোভীদের থাবায় রসালো ফল আনারস ঐতিহ্য হারাচ্ছে। অপরিপক্ক গাছে অসময় আনারস বের করার জন্য বাণিজ্যিক চাষিরা অসাধু পন্থায় কেমিক্যাল প্রয়োগ করছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় চাষিরা নামে-বেনামে নানা কোম্পানির কেমিক্যাল দেদারছে ব্যবহার করছে। মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগের ফলে গাছ ও ফলের রাতারাতি ফলনের অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছে বাণিজ্যিক চাষিরা। বড় ফল উৎপাদন করে বাজার দখল করার মানসিকতার কারণে এতদাঞ্চলের আনারসের আদি আকার হারিয়ে যাচ্ছে। রসালো ফলের স্বাদ ও গন্ধ এক প্রকার বিস্বাদে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা বিনষ্ট হচ্ছে। কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আনারস বিক্রি করতে হচ্ছে- কেমিক্যালের প্রতিক্রিয়ায় বাগানের আনারস বাগানেই পচে নষ্ট হচ্ছে। ফলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। স্থানীয় পরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধি, বাড়তি শ্রমিক মজুরি, সার ও কেমিক্যালের অতিরিক্ত খরচ, পাইকারদের মোকামে চাহিদা কম এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যসহ নানা কারণে আনারসের চাহিদা ভোক্তা পর্যায়ে দিন দিন কমে যাওয়ায় এ বছর বাজার মন্দা যাচ্ছে- স্থানীয়রা এমনটাই ধারণা করছেন। তবে প্রাকৃতিকভাবে (অর্গানিক) চাষ করা আনারসের খুচরা পর্যায়ে চাহিদা ও দাম অনেক বেশি। মধুপুরের আনারসচাষি হাবিবুর রহমান জানান, প্রতিটি আনারসের চারা জমিতে আনা পর্যন্ত হাল-চাষ রোপণসহ ৮-৯ টাকা খরচ হয়েছে। এখন বাগান থেকে আনারস কাটতে শ্রমিক মজুরি প্রতিপিস এক টাকা। ভ্যান ভাড়া পাঁচ টাকা। পরিচর্যা খরচ বাদে তার প্রতিটি আনারসে খরচ হয়েছে ১৪-১৫ টাকা। ১৮ মাস পরিচর্যার পর আনারস বিক্রির উপযোগী হয়েছে। এ সময় সার, নিড়ানি, পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক, রোদে পোড়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য খড় দিয়ে ঢেকে দেওয়াসহ দেড় বছরে তার আরও খরচ হয়েছে আনারস প্রতি ৭-৮ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিটি আনারসে গড় খরচ পড়েছে ১৮-২২ টাকা। বাজারে আনারস বিক্রি করে খরচ বাদে হাতে পাচ্ছেন গড়ে ১৪-১৭ টাকা। মধুপুরের আদিবাসী ও স্থানীয় আনারসচাষিরা জানান, বাজারে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত আনারস বেশি থাকায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাদের আনারসে অপ্রয়োজনীয় কেমিক্যাল না থাকায় আকারে ছোট ও দেখতে অনেকটা সবুজাভ হলুদ। এ জন্য দেখতে পরিপক্ক, রসালো ও আকর্ষণীয় না হওয়ায় ক্রেতারা আকর্ষিত হয় না এবং বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে আনারস চাষের খরচ না ওঠায় লোকসান গুণতে হচ্ছে। আগামীতে ভালো মানের আনারস চাষ করবেন কিনা, তা ভেবে দেখবেন বলে মতামত জানান তারা। ঘাটাইলের গারোবাজারের কৃষক আজাদুর রহমান জানান, তিনি গত বছর যে আনারস ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি করেছেন, চাহিদা কম থাকায় এ বছর পাইকাররা ৩০-৩৫ টাকার বেশি দিয়ে কিনতে চাচ্ছে না। কুষ্টিয়ার আড়তদার শাহজাহান আলী জানান, এবার আনারসের চাহিদা কম। অন্যান্য বছর সকালে ট্রাক থেকে আনারস আড়তে নামালে খদ্দের ভিড় জমাতো। এখন ভিড় ও দাম দুটিই কম। প্রতিপিস ৬০-৭০ টাকার টাকার আনারস বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা। আনারস চাষি সোহেল রানা জানান, আনারস বড় করতে ও পাকাতে বিভিন্ন কোম্পানির রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গ্রোথ হরমোন ব্যবহারে আনারসের আকার বড় হলেও ভেতরে ফাঁপা ও পানসে হয়ে যায়। অধিক লাভের জন্য বড় করার আশায় প্রশিক্ষণহীন কৃষকরা মাত্রাতিরিক্ত হরমোন ব্যবহার করার ফলে এমন অবস্থা হয়ে থাকে। এ ছাড়া পাকানোর জন্য রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে কয়েক দিনের মধ্যে আনারস হলুদ রং হয়ে যায়। এক সঙ্গে সব আনারসে পাকা রঙ ধারণ করলে সহজে বিক্রি করা যায়। কিন্তু রাসায়নিক না দেওয়া হলে ভিন্ন ভিন্ন সময় অল্প সংখ্যক আনারস পাকে-ফলে একসঙ্গে বিক্রি করা যায় না। কৃষকরা টাকাও ঘরে আনতে পারেন না। আনারসচাষি আ. রশিদ ১৬ শতাংশ জমিতে প্রাকৃতিকভাবে (অর্গানিক পদ্ধতিতে) চাষ করে ছোট সাইজের আনারস প্রতিপিস ২৫-৩৫ টাকা দামে বাগান থেকেই বিক্রি করেছেন। বাগান থেকেই ক্রেতারা কাড়াকাড়ি করে তার আনারস কিনে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, চাষিদের মধ্যে দেশপ্রেম সৃষ্টি হলেই নিরাপদ আনারস চাষ করা সম্ভব। রাসায়নিক মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগে ফসলের তেমন ক্ষতি হয় না। কৃষকরা ইচ্ছামাফিক রাসায়নিক প্রয়োগ ও অপপ্রচারে আনারসের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। তিনি কৃষকদের প্রতি দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান। মধুপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ থেকে এমডি-২ জাতের আনারসের চারা কৃষি বিভাগ আমদানি করে। পরে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মধুপুরের কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ১০৭ জন কৃষককে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ চারা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২০ জন কৃষককে দুই লাখ ৭০ হাজার চারা দেওয়া হয়। মধুপুরের মাটি আনারস চাষের উপযোগী ও প্রতিবছর প্রচুর আনারস উৎপাদিত হয়। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে অনেক আনারস নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য বিদেশের বাজার ধরার জন্য নতুন জাতের এমডি-২ আনারস চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই জাতের আনারস পাকার পর প্রাকৃতিকভাবেই এক মাস সংরক্ষণ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে যে চারা বিতরণ করা হয়েছিল, সেই ফল এখন বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকরা জানান, নতুন জাতের এই আনারস নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক শঙ্কা ছিল। কিন্তু সেই শঙ্কা এখন আর নেই। মধুপুরের অনেকেই এই জাতের আনারস চাষের পরিকল্পনা করছেন। আনারসের পাইকারি হাট গারোবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, এমডি-২ জাতের আনারস চাষিদের অনেকেই বাজারে এনেছেন। পাইকাররা কেটে খেয়ে স্বাদ পরীক্ষা করে আনারস কিনছেন। মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন রাসেল জানান, মধুপুর উপজেলায় গতবারের চেয়ে আনারসের আবাদ বেশি হয়েছে। মধুপুরে এ বছর বিশ^ বিখ্যাত ফিলিপাইনের সুপার সুইট এমডি-২ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। পাহাড়ি লাল মাটিতে জায়ান্টকিউ বা ক্যালেন্ডার জাতের আনারস সবচেয়ে বেশি চাষ হয়ে থাকে। নিরাপদ আনারস চাষের ওপর কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাসার জানান, মধুপুর গড়ের আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে চাষি, পাইকারসহ সংশ্লিষ্টদের সচেতন হতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এতে ঊৎপাদন খরচ কমে আসবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-08-20 05:55:38.899412 +0200 CEST