যায়যায়দিন
রাজনৈতিক গণসমাবেশে ব্যবহৃত হয়েছে জাল টাকা

রাজনৈতিক গণসমাবেশে ব্যবহৃত হয়েছে জাল টাকা

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তে পারে জাল টাকার ব্যবহার। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক গণসমাবেশ ছাড়াও বেশ কিছু জনসমাগমে জাল টাকা ব্যবহৃত হয়েছে। জাল নোটের কারবারি ছাড়াও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা জাল টাকার ব্যবহার করতে পারে। আবার তৃতীয় কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন ঘিরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে জাল টাকা ব্যবহার করতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে ঘিরে অনুষ্ঠিত নানা কর্মসূচিতে জাল টাকার ব্যবহারের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগাম বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে শুধু ঢাকা থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে জাল টাকা তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ২০ জন। তাদের কাছ থেকে জব্দ হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জাল নোট। আর জব্দ হওয়া কাঁচামাল দিয়ে আরও অন্তত ২০ কোটি টাকার জাল নোট প্রস্তুত করা সম্ভব ছিল। ধরা না পড়লে এসব জাল টাকা তৈরির পর ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল চক্রটির। সূত্রটি বলছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জাল টাকা তৈরির মাস্টার মোফাজ্জল হোসেন। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ৮৭টি এক হাজার টাকার জাল নোটসহ র‌্যাব-৩ তাকে গ্রেপ্তার করে। গত ২৪ এপ্রিল ঢাকার খিলগাঁও থেকে পুলিশ জাল টাকা প্রস্তুতকারী আল আমিন ও কাশেম আলীকে গ্রেপ্তার করে। জব্দ হয় প্রায় ২ লাখ টাকার জাল নোট। গত ২৫ জুন অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডি থেকে জাল টাকা প্রস্তুতকারী চক্রের ৪ জন র‌্যাব-৩ এর হাতে গ্রেপ্তার হয়। একই দিন ডিবি পুলিশ লালবাগের এক বাড়িতে রীতিমতো জাল টাকা তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। কারখানার মালিক স্বামী-স্ত্রীসহ ৯ জন গ্রেপ্তার হয়। সেখানে পাওয়া যায় প্রায় কোটি টাকার জাল নোট। জব্দ হওয়া কাঁচামাল দিয়ে কমপক্ষে ২ কোটি টাকার জাল নোট তৈরি সম্ভব ছিল। গত ২২ আগস্ট র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০ এর অভিযানে ঢাকার ডেমরা, সবুজবাগ ও খিলগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন জাল টাকা তৈরির দক্ষ কারিগর মোহাম্মদ আমিনুল হক ওরফে দুলালসহ চারজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গ্রেপ্তারদের অনেকেই জানিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতে বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে জাল টাকার চাহিদা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে জাল টাকা বেচাকেনার সঙ্গে জড়িতরাও জাল টাকা তৈরি করে সরবরাহ করতে বলেছেন। জাল নোটের কারবারিদের নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমেও জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জব্দ হওয়া জাল টাকা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা। এ ধরনের জাল নোট তৈরিতে দক্ষ জঙ্গিরা। বিশেষ করে জেএমবি। সূত্রটি বলছে, জব্দ হওয়া জাল টাকা আসল না নকল তা সাধারণ কোনো ব্যক্তির পক্ষে ধরা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। টাকা সম্পর্কে বিশেষভাবে না জানা থাকলে সহজেই কারও পক্ষে এসব জাল টাকা ধরা সম্ভব না। কারণ আগে দেশে যেসব জাল টাকা তৈরি হতো, তা দেশীয় কাগজ ও কালিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি করা হতো। ফলে একটু নিখুঁতভাবে পরখ করলেই টাকা আসল না নকল-তা ধরা সম্ভব হতো। বর্তমানে বিদেশ থেকে আনা কাঁচামাল দিয়ে জাল টাকা তৈরি হচ্ছে। ফলে জাল টাকার মান প্রায় শতভাগ আসল টাকার মতো। এমনও দেখা গেছে অন্তত পাঁচ থেকে দশ হাত ঘুরে ব্যাংকে যাওয়ার পর টাকাটি জাল বলে ধরা পড়েছে। যতক্ষণ সেটি মানুষের হাতে ছিল, ততক্ষণ টাকাটি যে নকল তা কেউ বুঝতেই পারেনি। মূলত এটি একটি বড় ভয়ের কারণ। কারণ দেশের অধিকাংশ মানুষই আসল ও নকল টাকার পার্থক্য তেমন একটা বুঝেন না। জাল নোটের কারবারিরা সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগায়। সূত্রটি বলছে, জাল টাকার কারবারিরাও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত নানা অনুষ্ঠানে ও সমাবেশে ব্যাপকহারে জাল টাকা ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যেই অনেক রাজনৈতিক সমাবেশে তারা জাল টাকার ব্যবহারও করেছেন। শুধু জাল টাকার কারবারিরা নন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেকেই আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাল টাকা বানিয়ে দিতে বলেছেন। চলতি বছর অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশে জাল টাকা ব্যবহৃত হয়েছে। যেটি অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। জাল টাকার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, রাজনৈতিক সমাবেশ ছাড়াও যে কোনো পরিস্থিতিতে কোনো ভাবেই যাতে জাল টাকার ব্যবহার না হতে পারে এজন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সামনের দিনগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযানের তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে। তবে নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে জনসমাবেশে জাল টাকা ব্যবহৃত হতে পারে, এমন সম্ভবনাকে মাথায়ই রেখেই পুলিশ কাজ করছে। একটি উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, নানা কারণে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মহলেরও নজর রয়েছে বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনকে ঘিরে। এবারের নির্বাচনে নানা ধরনের অঘটন ঘটতে পারে। নির্বাচনে সব দলই কম বেশি নগদ টাকা খরচ করে। এছাড়াও কোনো কোনো সময় বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে প্রচুর নগদ টাকার ছড়াছড়ির ঘটনা ঘটে। এমন সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারে জাল টাকার কারবারি। আবার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ এবারের নির্বাচনে তৃতীয় কোনো পক্ষ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাপকহারে জাল টাকা ছড়িয়ে দিতে পারেন। মূলত নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এমন অঘটন ঘটতে পারে। এসব বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যায়যায়দিনকে বলেন, জাল টাকার বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলমান থাকবে। ইতোমধ্যেই অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তাররা গণসমাবেশে জাল টাকার ব্যবহার করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে সেই গণসমাবেশ রাজনৈতিক কিনা তা স্পষ্ট করেননি। রাজনৈতিক সমাবেশে বা আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাল টাকার ব্যবহার বাড়তেই পারে। অসম্ভব কিছুই না। আবার নির্বাচন সংশ্লিষ্টরাও নির্বাচনের ডামাডোলের সুযোগে জাল টাকার ব্যবহার করতে পারেন। সেই আশঙ্কা থেকেই যায়। এমন সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই র‌্যাবের গোয়েন্দা ও সাইবার শাখা কাজ করছে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-08-29 05:42:50.285355 +0200 CEST