যায়যায়দিন
আজ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিকেলে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি

আজ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিকেলে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি

প্রায় ১৭ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির কঠিন সময় যেন শেষই হচ্ছে না। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি আদায়ে শেষ মুহূর্তের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৪৫ বছর উত্থান-পতনের মধ্যে সময় পার করা বিএনপির আন্দোলন সফল করার চ্যালেঞ্চ নিয়ে আজ ৪৬ বছরে পা দিচ্ছে। জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জন্ম হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটির। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৮৩ সালে বিএনপির হাল ধরেন তারই সহধর্মিণী খালেদা জিয়া। তিনি দলের চেয়ারপারসন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন বেগম জিয়া। সর্বশেষ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। অনেকে মনে করেন, প্রতিষ্ঠার পর সাড়ে চার দশকের মধ্যে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে প্রতিকূল সময় পার করছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলের অবস্থা অনেকটা নাজুক হয়ে পড়ে। তিনি ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেলেও অসুস্থতা ও বিধিনিষেধের বেড়াজালে রাজনীতিতে এখনো সক্রিয় হতে পারেননি। দলটির নেতারা বলছেন, ফিরোজায় কার্যত তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে তাকে চিকিৎসার জন্য অনেকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। গত ৯ আগস্ট থেকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। এদিকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন লন্ডনে বসবাসরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখান থেকেই স্থায়ী কমিটির পরামর্শক্রমে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করছেন তিনি। এছাড়া খালেদা জিয়া ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ প্রায় সব ছোট-বড় নেতার নামেই আছে মামলার বোঝা। খালেদা জিয়ার নামে মামলা আছে ৩৭টি, আর মির্জা ফখরুলের মামলা ৮৭টি। দলটির শঙ্কা, নির্বাচন সামনে রেখে সিনিয়র অনেক নেতারই দ্রুততম সময়ে সাজা হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। একাধিক বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা বিএনপি এমন একটি সময়ে ৪৬ বছরে পা রাখছে, যখন সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের একদফা দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনের ‘শেষ ধাপে’ নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে এই আন্দোলন শুরুর পরিকল্পনা করছে দলটি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যা চলমান থাকবে। তবে গত ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচির তিক্ত অভিজ্ঞতায় ‘সেই আন্দোলন’ জমানোই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দলটির অনেক নেতার অভিমত, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পদযাত্রার মতো নরম কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও ‘শক্ত কর্মসূচি’তে তাদের সেভাবে পাওয়া যায় না। এই বিষয়টি ভাবাচ্ছে হাইকমান্ডকে। যদিও অবস্থান কর্মসূচির ‘ব্যর্থতা’ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে তাৎক্ষণিক কিছু সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় দল। এর ইতিবাচক ফলও পেতে শুরু করেছে বলে দাবি নেতাদের। বিএনপি প্রত্যাশা করছে, আন্দোলনে দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে জনগণের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলানোর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির এবার আন্দোলনে জেতাটাই একমাত্র লক্ষ্য। কারণ এবার বিএনপিকে ছাড়া সরকার যদি নির্বাচন করতে পারে, তাহলে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। এ বিষয়টি বিএনপির নেতৃত্বও বিবেচনায় নিচ্ছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন। তাই আগামীদিনে আন্দোলন সফল করাই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডক্টর আব্দুল মঈন খান বলেন, রাজনীতি এমন একটি জিনিস যেখানে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ থাকে। বিএনপি গত ৪৫ বছর ধরে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই রাজনীতি করে এসেছে। আজকে যে চ্যালেঞ্জ সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জটি ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ। কাজেই আমরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কাজ করে যাচ্ছি। এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। দিবসটি উপলক্ষে আজ শুক্রবার ভোরে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করা হবে। বিকেল ৩টায় রাজধানীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে র‌্যালিটি শুরু হয়ে ফকিরাপুল মোড়, নটর ডেম কলেজ, শাপলা চত্বর, ইত্তেফাক মোড় হয়ে রাজধানী মার্কেটে গিয়ে শেষ হবে। নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে র‌্যালিকে একদফার কর্মসূচির মতো রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে হাইকমান্ড। সারা দেশের ইউনিটগুলোতে নিজ নিজ সুবিধানুযায়ী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে। দিবসটি সামনে রেখে ইতোমধ্যে পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। বিএনপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বাণী দিয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে একদফার আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার চিন্তা রয়েছে নীতি-নির্ধারকদের। আর সেপ্টেম্বরের শেষদিকে গিয়ে আন্দোলন গতি লাভ করবে। ওই সময় ঢাকায় ফের মহাসমাবেশ, গণসমাবেশ বা বড় ধরনের কর্মসূচির চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের। এর মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের ‘শেষ ধাপ’ শুরু হবে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যা চলমান থাকবে। তখন কর্মসূচি হবে আবার ঢাকাকেন্দ্রিক। বিচারালয়ের সামনে অবস্থান ছাড়াও নির্বাচন কমিশন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়ের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘেরাওয়ের সঙ্গে টানা অবস্থানের কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে বিএনপির। নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, নভেম্বরে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হবে। অনেকে ধারণা করছেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, তফশিল ঘোষণা হয়ে গেলে নির্বাচন ঠেকানো কঠিন হবে। সেজন্য তফশিল হওয়ার আগেই রাজপথে একদফা আন্দোলনের ফয়সালা করতে চান নীতি-নির্ধারকরা। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বিএনপি। দলের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই ঢাকাকেন্দ্রিক টানা কর্মসূচি দিয়ে অক্টোবরে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা থাকবে তাদের। সেই আন্দোলনে দলটি আর কোনো ভুল করতে চায় না। এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা রাজধানীর গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চে বিএনপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভা শুরুর আগে বিএনপির ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার ‘দ্য রোড অব ডেমোক্রেসি’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ বাধা আসলে পাল্টা প্রতিরোধ হবে।’ সরকারকে হটানো ছাড়া মাঠ থেকে পালানো যাবে না। আমি আশা করি, আপনাদের সেই অঙ্গীকার আছে। শেখ হাসিনা যদি বলতে পারে হাত-পা ভেঙে দাও, একটা মারলে ১০টা মারবা। তাহলে তার প্রতিউত্তরে আমরা যদি উত্তর দেই... তাহলে অপরাধ হবে? আমরা খালি যুগে যুগে মাইর খাব নাকি। প্রয়োজনে দেশ স্বাধীন করেছি। সুতরাং বেঁচে থাকার অধিকার আমার আছে। আর বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় আমাদের সবাইকে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আলোচনা সভায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানান নেতারা স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, বরকত উল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-09-01 05:41:03.106412 +0200 CEST