যায়যায়দিন
আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম কার্যকরে সংশয়

আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম কার্যকরে সংশয়

আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের যে দাম সরকার বেঁধে দিয়েছিল, খুচরা বাজারে তার কোনো চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। দাম নির্ধারণের তৃতীয় দিন শনিবার ব্যবসায়ীরা তাদের মতো করে ক্রেতাদের কাছ থেকে এসব পণ্যের দাম আদায় করেছেন। যদিও সরকার বাজার তদারকি কঠোরভাবে ঘোষণা দিয়েছিল। অবশ্য এ দিন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কয়েকটি জায়গায় অভিযান পরিচালনা করেছে বলে খবর আসে। বরাবরের মতো খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ওপর নির্ভর করছে খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম। তাদের দাবি, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হলেও পাইকারি বাজারে পণ্যগুলো কত দামে বিক্রি হবে তা নির্ধারণ হয়নি। ফলে পাইকারিতে দাম কমেনি। বেশি দামে পণ্য কেনা থাকায় খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা দুষ্কর হয়ে পড়বে। তাদের মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে সিন্ডিকেট না ভাঙলে এ বাজার অস্থিরতা দেশের মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘ করে তুলবে। গত বৃহস্পতিবার বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রথমবারের মতো সরকার তিন কৃষিপণ্যÑ আলু, দেশি পেঁয়াজ ও ডিমের দাম বেঁধে দেয়। বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী ফার্মের প্রতিটি ডিম ১২ টাকা, আলুর কেজি খুচরা পর্যায়ে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজের দাম হবে ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। ওইদিন সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দাম ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘নির্ধারিত দামে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না তা মনিটরিংয়ের জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করবেন। কেউ এই নিয়ম অমান্য করলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের আলোকে এ নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বড় মগবাজার, রামপুরা সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, শ্যামবাজার ও নয়াবাজার এলাকার কয়েকটি বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য তিনটি বিক্রি হচ্ছে না। শুক্রবারও একই চিত্র ছিল বাজারে। যদিও শুক্রবার বিকাল থেকে সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে সারা দেশে অভিযানে নামে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। দাম বেশি নেওয়ায় ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ৪১টি টিম দিয়ে ৫৩টি বাজারে অভিযান চালানো হয়। এতে জরিমানা করা হয় মোট দুই লাখ ৩৭ হাজার টাকা। তারপরও সরকারের এ সিদ্ধান্তকে মানছেন না ব্যবসায়ীরা। কারওয়ান বাজারে দেখা গেছে, প্রতি হালি ডিম আগের মতো ৫০-৫২ টাকা অর্থাৎ প্রতিটি সাড়ে ১২-১৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি সাদা আলু ৫০ টাকা এবং লাল আলু ৫৫ টাকাই রয়ে গেছে। কমেনি পেঁয়াজের দামও। ভারতের আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৬৫-৭০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৮০-৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। সরকার নির্ধারিত দামে ডিম বিক্রি করছেন না কেন এমন প্রশ্নে ইয়াকুব আলী নামে এক ব্যবসায়ী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, পাইকারি বাজারে গত দুদিনে দাম এক টাকাও কমেনি। ১০০ ডিমের দাম দোকানে এনে খরচ হয় এক হাজার ২২০ টাকার বেশি। তার মানে একেকটা ডিমের দাম ১২ টাকা ২০ পয়সা। তাহলে কীভাবে ১২ টাকায় ডিম বিক্রি করব? আমরা গরিব মানুষ। লোকসান দিয়ে বিক্রি করলে সংসার কি সরকার চালাবে? তিনি বলেন, আড়তে না গিয়ে খুচরায় অভিযান ও চাপ প্রয়োগ হচ্ছে। আড়তে দাম বেশি থাকার পরও যদি আমাদের কম দামে পণ্য বিক্রিতে বাধ্য করে, তাহলে দোকান বন্ধ ছাড়া উপায় থাকবে না। কমে কিনতে না পারলে বেচব কেমনে। রামপুরা নতুন রাস্তা এলাকায় মুদি পণ্য বিক্রেতা শফিউল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের হিসাব আমাদের জানা নাই। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশি দামে বিক্রি করি, কমে কিনলে কমে বেচি। মগবাজার বাজারের খালেক স্টোরের মালিক খালেক হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমরা কি দামে কিনেছি তার ক্যাশ মেমো আছে। সেই দামের হিসাবে পণ্য বিক্রি করছি। হুট করে বললেই কমানো যায় না। পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে প্রতি কেজি আলু ৪৫ টাকা আর প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭২ থেকে ৭৪ টাকা এবং ভারতের পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকায় ডিমের সবচেয়ে বড় আড়ত গুলিস্তানের কাপ্তান বাজারে ১০০ ডিম ১১৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। রায়সাহেব বাজারের ডিম ব্যবসায়ী আবুল বাসার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আজকে (শনিবার) আড়ত থেকে ১০০ ডিম ১১৮০ টাকায় কিনেছি। সে হিসেবে প্রতি পিসের দাম পড়ে ১১ টাকা ৮০ পয়সা। এর সাথে খরচ ২০ টাকা যোগ হয় তখন দাম পড়ে ১২০০ টাকা। আমরা পাইকারি বিক্রি করছি ১২৩০ টাকা। একে প্রতি হালির দাম পড়ে ৪৯ টাকা ২০ পয়সা। আর খুচরায় ১০০টি ডিম ১২৫০ টাকা বিক্রি করলে হালি ৫০ টাকা পড়ে। কিন্তু পাড়া মহল্লায় সেটা বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৩ টাকা হালি। তিনি বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটা কার্যকর হতে এ সপ্তাহ লেগে যাবে। তাও আবার যদি আড়তদাররা দাম কমায় তাহলে আমরা কমাতে পারব। ডিমের মূল জায়গা হলো ফার্ম ও আড়তদার। তারা যদি ১০০টি ডিম ১১০০ টাকা দাম নেয়, তাহলে আমরা সরকারের দামে বিক্রি করতে পারব। খুচরায় ব্যবসা নেই, ব্যবসা করে আড়তদাররা। শ্যামবাজারের ইয়াসীন বাণিজ্যালয়ের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী সুজন সাহা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, রাজশাহী থেকে সর্বশেষ কেনা আলুর দাম পড়েছে প্রতি কেজি ৩৮ টাকা ৪০ পয়সার মতো। এরপর পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ আছে। তাতে ৪০ টাকার নিচে পাইকারিতে আলু বিক্রি করা যাচ্ছে না। মোকামে দাম বেশি থাকায় বাড়তি দরে আলু কিনতে হচ্ছে। তবে আলুর সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তিনি বলেন, বিক্রমপুরের প্রতি বস্তা আলু (৬০ কেজি) ২৩০০ টাকা, যা প্রতি কেজির দাম পড়ে ৩৮ টাকা। আর রাজশাহীর প্রতি বস্তা (৬৫ কেজি) ২৬০০ টাকা। প্রতি কেজির দাম পড়ে ৪০ টাকা। গত কয়েক তিন ধরে বাজারে আলুর সরবরাহ কম। যেখান প্রতিদিন শ্যামবাজারে ১০টি গাড়ি আসত, সেখানে ৩টি আসছে। কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু ছাড়ছে ধীরে। মূলত বড় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। এই কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে আলু ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেখানে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে হবে তাহলে দাম কমে যাবে। কাপ্তান বাজারের পাইকারি ডিম ব্যবসায়ী অগর মণ্ডল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, খামার থেকে এখন ডিম কম আসছে। ডিমের সরবরাহ কম, এ কারণে দাম বেড়েছে। কম দামে আনতে পারলে ভোক্তাদের কম দামে ডিম দিতে পারব। আমরা তো খামারিদের কাছ থেকে কম দামে আনতে পারছি না, মুরগির খাবারের দাম বৃদ্ধির পর যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে। ফলে খামারিদেরও ডিম বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব খন্দকার মো. মোহসিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, দেশে জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বরের দিকে ডিমের দাম বাড়তি থাকে। তবে সরকার ডিমের যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে দরে আমরা ডিম বিক্রি করতে পারব যদি আমাদের শুধু ডিম বিক্রি করার জন্য সরকার একটা জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়। তাহলে ডিম বেশি হাতবদল হবে না। এতে খরচ কমবে। এদিকে, রাজধানীর বাজারে হঠাৎ বেড়েছে ডালের দাম। মসুর বড়দানা, ছোটদানা নির্বিশেষে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। মুগের ডালের প্রতি কেজিতে ১০ টাকা করে দাম বেড়েছে। শনিবার রাজধানীর তেজগাঁও ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। রাজধানীর বাজারে মসুর বড় দানা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি; এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। ছোট্ট দানা বিক্রি হচ্ছে বাজার ভেদে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা কেজি; এক সপ্তাহ আগে বাজার ও ধরন ভেদে বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা; এক সপ্তাহ আগে ধরন ও বাজার ভেদে বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে ছোলা, অ্যাংকর, ডাবলি ও খেসারি ডালের। একই ডাল বাজার থেকে গলির দোকানে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি দাম। ট্রেডিং কর্পোরেশনের (টিসিবি) শুক্রবারের পণ্যের প্রদর্শিত বাজারের মূল্য তালিকায় বড়দানা মসুর প্রতি কেজির দাম দেখানো হয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। ছোট্টদানার মসুর ডালের দাম দেখানো হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা। মুগ ডালের মান ভেদে বিক্রি দেখানো হয়েছে ৯৫ থেকে ১২৫ টাকা। আমিরুল ইসলাম নামে এক বিক্রেতা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এক সপ্তাহ আগে ২৫ কেজির এক বস্তা বড়দানার ডাল মোকামে থেকে যে দামে কিনছি শুক্রবার একই ডাল ১০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়েছে। বলেন তো কীভাবে আগের দামে বিক্রি করি। মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের পাইকারি বাজারে খোঁজ নিলে পাইকার মো. আরমান হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বড় দানার দুই ধরনের ডাল আছে। এক ধরনের ২৫ কেজি ওজনের এক বস্তা ডালের দাম দুই হাজার ৪২০ টাকা ও আরেক ধরনের বস্তার দাম দুই হাজার ৩২০ টাকা। ছোট্ট দানার মসুরের ডালের ২৫ কেজির বস্তার দাম তিন হাজার ১৫০ টাকা। শনিবার মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন গিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এ বছর যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়েছে তাতে ঘাটতি থাকার কথা নয়। একটি অদৃশ্য হাত আলুর বাজার অস্থির করে তুলেছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে আলু দাম বাস্তবায়ন করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। শনিবার বিকালে টাঙ্গাইলের সখীপুরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে কৃষিমন্ত্রী ডক্টর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা একটি কঠিন কাজ। দ্রব্যমূল্যের ওঠা-নামা মূলত এর চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। সরকার সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আমরা একটি পন্থা অবলম্বন করছি এতে কিছুটা হলেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ হবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-09-17 06:15:52.254656 +0200 CEST