যায়যায়দিন
ডিম-আলু-পেঁয়াজে লাগাম, বেলাগাম অন্য খাদ্যপণ্যে

ডিম-আলু-পেঁয়াজে লাগাম, বেলাগাম অন্য খাদ্যপণ্যে

রাজধানীর বাজারে হঠাৎ করে বেড়েছে ডালের দাম। মসুর বড় দানা ও ছোট দানা দু’টিতেই ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। মুগের ডাল প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়েছে। সবজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত কয়েকদিনে সব ধরনের মাছের দামও বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে সবজি বাজার ভেদে ৬০/৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, তা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একই সময় মাছের দামও কেজিতে বেড়েছে ন্যূনতম ৩০ টাকা। বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অতিসম্প্রতি সরকার ডিম-আলু ও পেঁয়াজের দাম বেঁধে দেওয়ার পর ভোক্তা অধিদপ্তরসহ বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা সরকারি অন্য সংস্থাগুলোর নজরদারি এ তিনটি পণ্যেই আটকে আছে। জোরেশোরে তদারকির পরও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ডিম-আলু-পেঁয়াজ কেন বিক্রি হচ্ছে না তা নিয়ে চলছে নানামুখী পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা। অথচ এ তিন পণ্যে দৃষ্টি আটকে থাকার সুযোগে অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম কতটা বাড়ছে তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। ফলে বাজার সিন্ডিকেট অন্যান্য খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রোববার রাজধানীর মালিবাগ, শান্তিনগর, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মসুর বড় দানা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা কেজি; এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। ছোট্ট দানা বিক্রি হচ্ছে বাজার ভেদে ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা কেজি; এক সপ্তাহ আগে বাজার ও ধরন ভেদে বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা; এক সপ্তাহ আগে ধরন ও বাজার ভেদে বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে ছোলা, অ্যাংকর, ডাবলি ও খেসারি ডালের। একই ডাল বাজার থেকে পাড়া-মহল্লার দোকানে দাম ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ১৫ সেপ্টেম্বরের পণ্যের প্রদর্শিত বাজারের মূল্য তালিকায় বড় দানা মসুর প্রতি কেজির দাম দেখানো হয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। ছোট দানার মসুর ডালের দাম দেখানো হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা। মুগ ডালের মান ভেদে বিক্রি দেখানো হয়েছে ৯৫ থেকে ১২৫ টাকা। কিন্তু বাজারে প্রকৃত চিত্রে টিসিবির এ মূল তালিকার সঙ্গে একটু পার্থক্য রয়েছে। এদিকে এক সপ্তাহ আগে আমদানিকৃত রসুনের দাম ১৯০ টাকা থাকলেও গত দু’দিনে তা বেড়ে ২২০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। দাম বেড়েছে গুঁড়া মরিচ, হলুদ ও ধনিয়ার। আমদানিকৃত হলুদ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও ১৬ সেপ্টেম্বর তা পাইকারিতেই ২২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। একই সময় শুকনা মরিচের দাম ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০০ টাকার ধনে বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়। সবজির দাম গত তিন দিনে কেজি প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। ক’দিন আগে যে মানের বরবটি ৭৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। গোল বেগুন ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায়, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকায়, করলা ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকায়, উস্তে ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা, সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা এবং দেশি মুরগির দাম ১৫ টাকা বেড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ডিম-পেঁয়াজ ও আলুর দাম বেঁধে দিলেও গত চারদিনে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এসব পণ্যের দাম কমানো না হলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তা আমদানি করা হবে সরকারের এ হুমকিতে বাজার সিন্ডিকেট সামান্য টলেনি। বরং তারা নানা কৌশলে আগের দামেই এসব পণ্য বিক্রি অব্যাহত রাখা যায় সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরইমধ্যে বেশকিছু কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রতিবারের মতো এবার ডিম সিন্ডিকেট আরও বেশকিছ ুদিন আগের দামেই বেচাকেনা অব্যাহত রেখে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে। পরে তারা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ডিম বিক্রি করবে। এছাড়া সরকার ভারত থেকে ডিম আমদানির উদ্যোগ নিলে আগের ওই একই সিন্ডিকেট এ টেন্ডার হাতিয়ে নেবে। এতে লাভের লাভ তাদের হাতেই থাকবে। এদিকে ডিম-পেঁয়াজ ও আলুর দাম বেঁধে দেওয়ার এ উদ্যোগকে বাজার পর্যবেক্ষকরা স্বাগত জানালেও কৌশলগত দূর্বলতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, মাত্র তিনটি পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েই সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অথচ এ সুযোগে অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামও হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। এ বাজার পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে উঠতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বাজার তদারকির সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি ছিল বলেও অভিমত দেন তারা। বাজারে ডিম আলু ও পেঁয়াজের দাম বেঁধে দিয়ে এ তিনটি পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে না পারার জন্য দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। এ প্রসঙ্গে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডির) এর সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রিটেইল লেভেলে নজর দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। ভোক্তা অধিকার ও কম্পিটিশন কমিশন খুবই রিয়েক্টিভ। কিছু একটা হলো, তখন তারা যায় অভিযানে। যেমন ভোজ্যতেল বা পেঁয়াজ এসব ক্ষেত্রে দেখা গেল, তারপর পোলট্রি ফার্ম নিয়ে একই ঘটনা ঘটলো। যখন কোনো সমস্যা হাজির হয়, তখন এসব তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু এগুলোকে একটা সার্বক্ষণিক তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নজরদারির মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে। যখন কিছু একটা হয় তখন আমরা স্বল্পমেয়াদে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আসলে ধারাবাহিক ও সার্বক্ষণিক নজরদারির একটা ব্যাপার আছে। বাজার সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দায়ী। অবশ্যই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক উদ্যোগ ও উদ্যমের অভাব রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব পালন করার প্রায়োগিক সক্ষমতাও দুর্বল। এই বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিন্তু তথ্য-উপাত্ত, গবেষণা করে সমস্যা ও সমাধান বের করার বিষয় রয়েছে। প্রতিবেশী দেশে অ্যাগ্রিকালচারাল কমোডিটির জন্য স্থায়ী প্রাইস কমিশন আছে, কারণ খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি খুবই সেনসিটিভ। সরবরাহ থাকলেই হবে না, ক্রয়ক্ষমতারও ব্যাপার আছে। এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষরণ অধিদপ্তর সোচ্চার থাকলেও লোকবল সংকটে তারা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সারা দেশে ভোক্তা অধিকারের কার্যক্রম পরিচালনায় ৮৪১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজনের বিপরীতে সংস্থাটি চলছে ৩৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে। অর্থাৎ ৪৫৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘাটতি নিয়ে চলছে সংস্থাটি, যা মোট জনবলের ৪৫ শতাংশ। তাদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে আটটি বিভাগে বিভাগীয় অফিস রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি জেলায়ও অফিস রয়েছে। জেলা অফিসগুলো চলছে শুধু একজন সহকারী পরিচালক ও একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়ে। একটি জেলায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি উপজেলা থাকে। এসব উপজেলায় এই একজন সহকারী পরিচালক দিয়ে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। ফলে মাসে হয়তো একবার অভিযান করা সম্ভব হচ্ছে। লোকবল সংকট নিয়ে বাংলাদেশ কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তা অধিকারের কার্যক্রমকে আরও বেশি বেগবান করে তুলতে সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকারের লোকবলসহ অন্য যেসব সমস্যা রয়েছে তা গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা জরুরি। সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়লে বাজারে অসাধুদের কারসাজি নিয়ন্ত্রণে সহজতর হবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2023-09-18 05:51:16.012316 +0200 CEST