যায়যায়দিন
ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বাড়ায় কুড়িগ্রামে ভাঙন আতঙ্ক

ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বাড়ায় কুড়িগ্রামে ভাঙন আতঙ্ক

উজানে ও দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া বাড়ছে অন্যান্য নদ-নদীর পানিও। ইতোমধ্যে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। তলিয়ে গেছে আমন ক্ষেত। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার বন্যার আশঙ্কা নেই। সোমবার বিকালে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২১৩ সেন্টিমিটার, কুড়িগ্রাম সদর পয়েন্টের ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে লালমনিরহাটের ৫ উপজেলাসহ রংপুরের কয়েকটি উপজেলার ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে পড়েছেন। বন্যার পানি নেমে যেতে না যেতেই ফের বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তিস্তার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ। এ নিয়ে ১০ বারের মতো বন্যার কবলে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। সোমবার দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচে। স্থানীয়রা জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট রোববার সকাল থেকেই খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তিস্তার পানি প্রবাহ বাড়ায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ফের পানিবন্দি হতে শুরু করেছে এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলো। এসব অঞ্চলে বিগত বন্যায় শুরু হওয়া ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে দাবি করেছে জেলা প্রশাসন। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা জানান, তিস্তার পানি প্রবাহ কাউনিয়াতে বেশি থাকলেও ডালিয়া পয়েন্টে কম রয়েছে। মূলত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির ফলে তিস্তা নদীতে পানি বেড়েছে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে তিস্তায় পানি কমতে শুরু করবে। এ নিয়ে চরাঞ্চলের মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কুড়িগ্রামের দলদলিয়া ইউনিয়নের তিস্তা নদীর অববাহিকার চাপড়ার পাড় এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘রোববার থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে আমার আমন ক্ষেতে চলে এসেছে। আজ (সোমবার) ধানক্ষেত ডুবে গেছে। জমিতে পানি ওঠায় খুব চিন্তায় পড়েছি। এর আগেও দুইবার ফসল নষ্ট হয়েছে।’ সোমবার সকালে রংপুরের কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলার নদীপারের বাসিন্দারা সাংবাদিকদের জানান, তিন দিনের বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়ল না। এখন পানি বাড়ার কারণ হলো, উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে। গঙ্গাচড়ার ল²ীটারি ইউনিয়নের ইছলি ও বাগডোগড়া এলাকায় বাড়ির উঠানে পানি উঠতে শুরু করেছে। ইছলি এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এবার অসময়ে নদীর পানি বাড়লে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। চরের জমির আমন ধান নিয়ে চিন্তায় আছেন তিনি।’ গঙ্গাচড়ার ল²ীটারি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহেল হাদী বলেন, ‘এবার নিয়া ছয়বার উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসার ঘটনা ঘটছে। তাই নদী তীরবর্তী মানুষের কষ্টের শেষ নেই। বলাও যায় না যে পানি কখন বাড়বে-কমবে।’ পানি বাড়ায় তিস্তাপারের কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা, উত্তর চিলাখাল, সাউথপাড়া, মটুকপুর, গজঘণ্টা ইউনিয়নের ছালাপাক, মহিষাসুর, রমাকান্ত, আলালচর, জয়দেব এলাকা এবং নোহালী ও আলমবিদিত ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে রংপুর পাউবোর তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, ‘দেশের উজানে ভারতের কোচবিহার, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পংসহ আরও কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি হয়েছে। সেই উজানের পানি নেমে আসায় তিস্তার পানি বাড়ছে।’ এদিকে কুড়িগ্রামে সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার নদের পানি চার দিন থেকে সমতলে বাড়া অব্যাহত আছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। চিলমারী উপজেলার শাখাহাতির চর, নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর পদ্মারচর, রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়ন এবং রৌমারী উপজেলার চর শৈলমারী ইউনিয়নের সুখের বাতির চরে নদের ভাঙন বেড়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পদ্মার চরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে পাগলার বাজারের ২২টি দোকান নদে বিলীন হয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র ভাঙনে পদ্মারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পদ্মারচর আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ তিন শতাধিক বসতবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।’ কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। ভারী বৃষ্টি কমে গেলে সব নদ-নদীর পানি স্বাভাবিক হবে।’ কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘এরকম বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে শীতকালীন মরিচ ও চালকুমড়াসহ বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া রোপা আমনেরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’ কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে মঙ্গলবারের মধ্যে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ যাযাদি/ এস
Published on: 2023-09-26 05:44:50.295256 +0200 CEST