যায়যায়দিন
শীতের তীব্রতায় উত্তরের জীবনযাত্রা ব্যাহত

শীতের তীব্রতায় উত্তরের জীবনযাত্রা ব্যাহত

চলতি মাসে দেশে দু-একটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। পৌষের শেষে যেমন শীত অনুভূত হচ্ছে, মাঘের শুরুতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে আগামী সপ্তাহে সারাদেশে তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়বে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এদিকে পৌষের শেষ ভাগে তাপমাত্রা কমতে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। শীতের দাপটে কাবু হয়ে পড়েছে এসব অঞ্চলের দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষজন। ঠান্ডায় ব্যাহত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ১৫ জেলার তাপমাত্রা নেমেছে ১২ ডিগ্রির নিচে। ঢাকার তাপমাত্রাও কমেছে প্রায় দুই ডিগ্রি। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি জেলার তাপমাত্রা কমতে পারে। শৈত্যপ্রবাহ শুরু না হলেও উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় হিমেল বাতাস বইছে প্রায় সারাদিনই। এতে কনকনে ঠান্ডার অনুভূতি বাড়িয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, কুয়াশার কারণে কিছু অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হতে পারে। তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গা ও নওগাঁর বদলগাছিতে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গতকাল ছিল রাজশাহীতে ১১। এ ছাড়া ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৮, যা আজ দুই ডিগ্রি কমে ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে নেমেছে। এদিকে ১২ ডিগ্রির নিচে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে আছে, পাবনার ঈশ্বরদী ১০ দশমিক ৮; কিশোরগঞ্জের নিকলী ১১; কুষ্টিয়ার কুমারখালী ১১ দশমিক ৩; গোপালগঞ্জ ১১ দশমিক ৪; যশোর, কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও ডিমলায় ১১ দশমিক ৬, দিনাজপুর ও রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৭, নীলফামারীর সৈয়দপুর, পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া, রংপুর, ফরিদপুর ও মাদারীপুরে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। একই দিনে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল টেকনাফে ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৌষের শেষ দেশব্যাপী ঘন কুয়াশার দেখা মিলছে কয়েকদিন ধরেই। এতে তাপমাত্রা না কমলেও সারাদেশে শীতের অনুভূতি বেড়েছে। একই সঙ্গে ঝরছে বরফের মতো শিশির। এ পরিস্থিতি আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে জানিয়ে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং এটি কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগে সাময়িকভাবে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ আবহাওয়াবিদ আরও জানান, এ সময়ে সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। কুয়াশার কারণে দেশের কোথাও কোথাও দিনে ঠান্ডা পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে। আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া শুক্রবার সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। জানুয়ারি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল, এ মাসে দেশে এক থেকে দুটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় একটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। আবহাওয়ার মডিউল অনুযায়ী, কোনো এলাকাজুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। রাজধানীর ঢাকার তাপমাত্রা বুধবার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। সেই সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ঘন কুয়াশা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঘন কুয়াশার মধ্যে সড়কে একটি পিকআপ উল্টে ১০ শ্রমিক আহত হয়েছেন। হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালের কাছে বুধবার সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মেহেদী হাসান। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন- মো. ইউসুফ, রাসেল হোসেন, রায়হান তালুকদার, মো. কাওছার, মো. আকাশ, মো. আলিম, নুরুল ইসলাম, রাজু আহমেদ, মো. রাজন ও আব্দুল হাকিম। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছে। ঢামেকের মেডিকেল ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। বাকিরা ভালো আছেন।’ শ্রমিকরা জানান, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় এস কে মেশিনারিজের গুদাম থেকে তারা যন্ত্রপাতি পিকআপে করে ঢাকার নবাবপুরের আরেকটি গুদামে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পিকআপটি কাজলা এলাকায় হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালের কাছে পৌঁছালে সেখানে কোনো গর্ত কিংবা স্পিডব্রেকার দেখে চালক হঠাৎ ব্রেক করেন। সঙ্গে সঙ্গে পিকআপটি কাত হয়ে উল্টে যায়। দুর্ঘটনাস্থল এলাকায় ঘন কুয়াশার কারণে চালক সড়কে ঠিকমতো কিছু দেখতে পারেননি বলে জানান আহতরা। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলায় শীতার্ত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ৪৩ হাজার কম্বল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। উত্তরের বিভিন্ন জেলার হতদরিদ্র মানুষজন শীত ও কনকনে ঠান্ডায় খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নিবারণ করছেন। শীত ও কনকনে ঠান্ডায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। মঙ্গলবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ২০ জন শিশু। এ নিয়ে ভর্তি রয়েছে মোট ৪৩ শিশু। আক্রান্তরা সেখানে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে। এদিকে উত্তরীয় হিমেল হাওয়ায় শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাহিল হয়েছে পড়েছে নদ-নদী তীরবর্তী চর ও দ্বীপ চরের মানুষগুলো। শীত ও কনকনে ঠান্ডায় কাজে যেতে না পারায় কষ্টে পড়েছে শ্রমজীবীরা। কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রায়া নামের এক শিশুর মা রশিদা বেগম বলেন, ‘বাচ্চার ডায়রিয়া নিয়ে গত পাঁচ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখন ডায়রিয়া ভালো হয়েছে। তবে মঙ্গলবার পরীক্ষা করে নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে।’ কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘তাপমাত্রা আরও কয়েকদিন এমন থাকবে। তবে এ মাসে আরও একটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।’ নীলফামারী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, শীতের তীব্রতায় কাঁপছে নীলফামারী। উত্তরের হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশায় দুর্ভোগ বেড়েছে দরিদ্র মানুষের। তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। ভোর থেকে বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। দিনে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ঘন কুয়াশায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠা-নামা ব্যাহত হচ্ছে। রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, বুধবার সকাল ৯টায় রাজারহাট উপজেলাসহ জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঘন কুয়াশা ও প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে রাস্তা-ঘাটে যানবাহন থাকে খুবই কম। ঘন কুয়াশার কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চলাচল বন্ধ থাকছে। রাজারহাট সদর ইউনিয়নের মেকুরটারি গ্রামের ভ্যান চালক সাহেব আলী বলেন, দুইদিন থাকি বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ছে। এমন কুয়াশায় ভ্যান নিয়ে বের হওয়া যায় না। দুইদিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায় না।’ এদিকে শীত ও কনকনে ঠান্ডায় শীতজনিত সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজারহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, মৃদু শৈত্যপ্রবাহ কেটে গেলেও ঘন কুয়াশার সঙ্গে হাড় কাঁপানো কনকনে শীতল বাতাসে দুর্ভোগে পড়েছেন পঞ্চগড়ের মানুষ। আকাশ মেঘে ঢেকে থাকায় গত দুইদিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে কমছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা আরও জানিয়েছেন এই অবস্থা চলবে আরও ২/৩ দিন। এরপর মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হলে বাড়বে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। তবে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। বুধবারও দিনভর দেখা মেলেনি সূর্যের। মঙ্গলবার বিকাল থেকেই শুরু হয় কুয়াশা। সন্ধ্যার পরই ঘন কুয়াশা অন্ধকার হয়ে ঢেকে যেতে থাকে গোটা জেলা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন কুয়াশা ঝরতে থাকে হালকা বৃষ্টির মতো। বুধবার সকালে বৃষ্টির পানির মাটির উপরিস্তর ভিজে থাকতে দেখা যায়। রোদ না থাকায় এবং কনকনে শীতল বাতাসে কাহিল শীতার্ত মানুষগুলো বিছানা ছেড়ে উঠেই শরীরে উষ্ণতা ছাড়াতে বসতে হয়েছে আগুনের পাশে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় প্রায় সারাদিনই আগুন জ্বালিয়ে শীতার্ত মানুষগুলোকে আগুন পোহাতে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি কাহিল হয়েছে জীবিকার তাগিদে সকালে কাজে যোগ দেয়া খেটে খাওয়া মানুষগুলো। সীমাহীন কষ্টে রয়েছেন রিকশা-ভ্যানচালক, কৃষি শ্রমিক ও পাথর শ্রমিকরা। কনকনে শীতের কারণে দৈনন্দিন আয় কমে গেছে এসব শ্রমজীবী মানুষের তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহ বলেন, বুধবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা খুব কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে প্রচণ্ড শীত অনুভূত হচ্ছে। এ অবস্থা আরও দুই/তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-11 04:53:41.395119 +0100 CET