যায়যায়দিন
হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে দেশ

হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে দেশ

পৌষের শেষে শীতের তীব্রতা বাড়ায় গত কয়েকদিন ধরেই কাঁপছে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘন কুয়াশার কারণে কোথাও কোথাও সারা দিনও মিলছে না সূর্যের দেখা। হাড় কাঁপানো শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশার দাপটও বেড়েছে। আর এর প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। কয়েকদিন ধরে চলা শীতের তীব্রতার মধ্যে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আসতে পারে বৃষ্টি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এমনটাই জানা গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর নওগাঁর বদলগাছীতে রেকর্ড করা হয়েছে ৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯ ডিগ্রি, রাজশাহীতে ৯.৬ ডিগ্রি এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে ৯.৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল টেকনাফে ২৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৭ ডিগ্রি, আর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশজুড়ে চলা কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ায় বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। এ ছাড়া শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত নানা রোগ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ঠান্ডায় শীতকালীন ফসলের আবাদ ভালো হলেও ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কুয়াশার কারণে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। শনিবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলাসহ রংপুর বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেছেন, ‘আগামী ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরও দুই-একদিন কুয়াশা থাকবে। এরপর কমবে। আস্তে আস্তে তাপমাত্রা বাড়বে।’ এর আগে চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল, এই মাসে দেশে এক থেকে দুটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় একটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, বড় এলাকাজুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। তাপমাত্রা ৬-৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। ৯.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বিপাকে জেলাবাসী পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, মেঘে ঢাকা আকাশের সঙ্গে উত্তরের হিম শীতল বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মানুষ। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরেই এমন অবস্থা বিরাজ করছে উত্তরের এই জনপদে। তীব্র শীতে বিপাকে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ থেকে শুরু করে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা। শনিবার সকাল ৯টা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। যা আগের দিনের চেয়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি কম। শুক্রবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা রয়েছে সূর্য। ভোর থেকে বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। এমন বৈরী পরিবেশে পাথর-চা শ্রমিক, দিনমজুরসহ নানা পেশার শ্রমজীবী মানুষের কমে গেছে দৈনন্দিন রোজগার। পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনযাপন করছেন তারা। প্রয়োজন ছাড়াও অনেকে ঘর থেকে বের না হলেও জীবিকার তাগিদে অনেকেই শীত উপেক্ষা করে কাজে বেরিয়েছেন। একই সঙ্গে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। তারাও ঠান্ডার প্রকোপের কারণে ক্ষেতে কাজ করতে পারছেন না। শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষদের মিলছে না প্রয়োজনীয় গরম কাপড়। রাস্তায় চলা ভবঘুরে মানুষরাও পড়েছে শীত দুর্ভোগে। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জানান, শীত মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া ২৮ হাজার কম্বল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। আরও শীতবস্ত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই পাওয়া যাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ করছে। রংপুরে বিপর্যস্ত জনজীবন রংপুর প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশা, হিমেল ও তীব্র শীতের আধিক্যের কারণে বিপর্যস্ত রংপুরের মানুষ। বিশেষ করে চরাঞ্চলে ঘরহীন মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেকে খড়কুটো জ্বালিয়ে শরীরে উত্তাপ নিতে দেখা গেছে। রাস্তা ছিল অনেকেটাই ফাঁকা। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সূর্যের আলো দেখা যায়নি। রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ৪০ জনের মতো অগ্নিদগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের বেশিরভাগই শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুনের উষ্ণতা নিতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। আবার কেউ কেউ শীত নিবারণে গরম পানি ব্যবহার করতে গিয়েও দগ্ধ হয়েছেন বলে জানান রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টি সার্জারি ওয়ার্ডের চিকিৎসক ফারুক আলম। টানা শৈত্যপ্রবাহে জনদুর্ভোগ চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, দ্বিতীয় দফা পাঁচ দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হিমেল হাওয়া ও কনকনে শীতে লোকজন বাড়িঘর থেকে তেমন একটা বের হচ্ছে না। কাজকর্মে গেলেও হাত-পা হিম হয়ে আসায় কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে ফিরে আসতে হচ্ছে। সূর্যের দেখা মিলছে না। ফলে যানবাহন হেডলাইট জ¦ালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে। তীব্র শীতে বেশি সমস্যায় পড়েছেন দিনমজুর, নিম্নআয়ের ও ছিন্নমূল মানুষ। চার দিন সূর্যের দেখা নেই ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, শীত জেঁকে বসেছে উত্তরের এই জনপদে। ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে রাস্তা-ঘাট, টানা চার দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। তীব্র শীতের কারণে বিশেষ কাজ ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অধিকাংশ মানুষ। শহরের রাস্তা-ঘাট প্রায় ফাঁকা। বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল এই শৈত্যপ্রবাহকে দুর্যোগ ঘোষণা করে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য গরম কাপড়সহ ত্রাণ কর্মসূচি বিতরণের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ৪১৬০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশাদুজ্জামান বলেন, ‘শনিবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটিই চলতি শীত মৌসুমে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড।’ ৯ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাহিল জনজীবন স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী থেকে জানান, চলমান শৈত্যপ্রবাহে কাহিল হয়ে পড়েছে নীলফামারীর জনজীবন। দুর্ভোগ বেড়েছে এই জেলার দরিদ্র মানুষের। গত পাঁচ দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি এই জেলায়। ভোর থেকে বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে। হাটবাজার ও রাস্তাঘাটে জনসমাগম কমে গেছে। বিশেষ করে ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীর কোল ঘেঁষা গ্রাম ও চরের মানুষজন সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন। শীতের তীব্রতার কারণে জ্বর, সর্দি ও কাশিসহ শীতজনিত রোগের প্রার্দুভাব বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। ঘন কুয়াশার কারণে শনিবার দুপুর পর্যন্ত সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা ব্যাহত হয়েছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হোসেন জানান, শনিবার নীলফামারীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র শীতে কাঁপছে নওগাঁর মানুষ বরেন্দ্র অঞ্চল (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁয় বেড়েছে শীতের তীব্রতা। এতে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খেটে খাওয়া ছিন্নমূল মানুষ। কমে গেছে তাদের আয়-রোজগার। শনিবার নওগাঁর বদলগাছী আবহাওয়া অফিস জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে ৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের কৃষক রবিউল ইললাম বলেন, ‘খুব শীত। মাঠে ঠিকমত কাজই করতে পারছি না। কবে নাগাদ শীত কমবে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।’ রিকশাচালক মুন্টু বলেন, ‘খুব শীত পড়েছে। রিকশা চালাতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। তবুও পেটের দায়ে কাজ তো করতেই হবে। রিকশা না চালাতে পারলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’ নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) খলিলুর রহমান জানান, জেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো বীজতলা তৈরি হয়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে কিছু কিছু এলাকায় বীজতলা ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে কুয়াশা দীর্ঘায়িত না হলে তেমন ক্ষতি হবে না। নওগাঁ জেলা প্রশাসক গোলাম মওলা জানান, জেলায় সরকারিভাবে এক লাখ শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৫০ হাজার শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এদিকে প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তীব্র শীতে দুর্ভোগে পড়েছেন পাবনার ভাঙ্গুড়া, জামালপুরের মাদারগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জনপদের মানুষ। শনিবার সকালে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদের দেওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়, দেশের ১৩ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। জেলাগুলো হচ্ছে- রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাট। এই পরিস্থিতি জানুয়ারি মাসব্যাপী অব্যাহত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-14 04:50:38.975849 +0100 CET