যায়যায়দিন
মিল-কারখানায় চতুর্মুখী সংকট, অচলাবস্থার শঙ্কা

মিল-কারখানায় চতুর্মুখী সংকট, অচলাবস্থার শঙ্কা

ইস্পাত, কাঁচ, রি-রোলিং ও সিমেন্টসহ বিভিন্ন ভারী শিল্পকারখানায় উৎপাদন সচল রাখার জন্য গ্যাসের দরকার হয়। তবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফার্নেস তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাস-সংকটের কারণে বেশিরভাগ শিল্প-কারখানার উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ নেমে গেছে। ফলে শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংকঋণ পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম গত এক বছরে ৫০-৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ডলার-সংকটে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খুলতেও মাসের পর মাস ব্যাংকে ঘুরতে হচ্ছে। তাতে বাজারে কাঁচামালের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্রয়াদেশও কিছুটা কমেছে। যতটুকু আসছে, তার একাংশ কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর উপর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চাহিদা বাড়ার পর বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তাতে কল-কারখানার উৎপাদন নতুনভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। চতুর্মুখী এসব সংকটে শিল্পখাতে ভয়াবহ অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। শিল্পখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের দাম বাড়ে। দেশে ডলার-সংকট প্রকট হতে থাকে। তখন ধাপে ধাপে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। জ্বালানি তেলের দামও বাড়ায় সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমানো হয়। শুরু হয় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং। শীত মৌসুম শুরু হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। তবে বাকি সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। এতে সংকটে পড়েছে দেশের সম্ভাবনাময় হালকা প্রকৌশলশিল্প (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং)। সবচেয়ে বিপদে আছেন খাতটির ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, হালকা প্রকৌশল কারখানায় বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত পণ্য, অ্যালুমিনিয়াম, বিয়ারিংসহ বিভিন্ন ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়। যার একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ ডলার সংকটের কারণে ছোট অংকের এলসি খুলতেও এসব প্রকৌশলশিল্পের মালিকদের এ ব্যাংক থেকে ও ব্যাংকে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ২০০ সদস্যের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমে অচলাবস্থার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে প্রকৌশল পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানিও ধাপে ধাপে কমতে শুরু করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৯ কোটি ডলারের প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি হয়, যা তার আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২৬ কোটি ডলারের প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু প্রকৌশল পণ্যই নয়, তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্যেরই রপ্তানি কমেছে। যদিও গত জুনে ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষ হওয়ার পরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বলেছিল, পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য হলো রপ্তানি কমেছে ৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ইপিবির দেওয়া হিসাবের চেয়ে পণ্য রপ্তানির আয় ১ হাজার ১৯৮ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার কম এসেছে। অন্যদিকে শুধু ডলারের অংকেই নয়, পরিমাণের দিক থেকেও পণ্যের রপ্তানির কমেছে। এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি হয় ৬০ লাখ ১৮ হাজার টন। তার আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৭ লাখ ৭৯ হাজার টন। সেই হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে সাড়ে সাত লাখ টন বা ১১ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রকৃতপক্ষে রপ্তানি যা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে। নানামুখী সংকটে ঘোর বিপাকে পড়ার কথা জানান বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, গ্যাস ও ফার্নেস তেলের দাম বাড়ানোর কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান লোহা গলিয়ে পণ্য তৈরি করে, তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আবার চীন থেকে কাঁচামাল আনতে আগে কনটেইনারপ্রতি ১ হাজার ১০০ ডলার খরচ হতো। মাঝে তা বেড়ে ৩ হাজার ৮০০ ডলার হয়েছিল। এখন কিছুটা কমলেও লাগছে ৩ হাজার ২০০ ডলার। তার চেয়ে বড় সমস্যা, ডলার-সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না, তাতে কোনো কোনো কাঁচামালের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিছু কাঁচামালের সংকট তৈরি হওয়ায় উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গিয়ে শিল্পমালিকদের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ প্রসঙ্গে গাজীপুর-ঢাকা সড়ক সংলগ্নস্থ স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানার পরিচালক কাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গ্যাসের চাপ যা থাকে, তা দিয়ে কারখানা চালানো যায় না। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে খরচও বেড়ে যাচ্ছে। কোনাবাড়ী এলাকার এটিএস ফ্যাশন লিমিটেড কারখানার উৎপাদন কর্মকর্তা হামিদুর রহমান জানান, বারবার গ্যাসের চাপ বাড়ানোর দাবি জানিয়েও তিতাস থেকে সুরাহা পাচ্ছেন না। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় বেশ ক্ষতির মুখে রয়েছেন তারা। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নয়ামাটি এলাকায় অবস্থিত রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান আইএফএস নিটওয়্যার লিমিটেডের দিনে উৎপাদন ক্ষমতা ২২ টন। গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন দুই থেকে তিন টনে নেমে গেছে। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও ব্যাংকঋণ পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদ। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাড়তি দাম নিয়েও শিল্পে গ্যাস দিতে পারছে না তিতাস। গ্যাস-সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে শ্রমিকের নতুন ঘোষিত মজুরি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির স্বপ্নও বিলীন হয়ে যাবে। পোশাক রপ্তানিকারকদের আরেক সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সঠিকভাবে জ্বালানি না পাওয়া গেলে কারখানা চলবে না, মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে জ্বালানির কারণে উৎপাদন কমতে থাকলে শিল্প টিকে থাকতে পারবে না। পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট আরেকটি খাত হচ্ছে টেক্সটাইল বা বস্ত্রকল। এ খাতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এর অতিরিক্ত মহাসচিব মনসুর আহমেদ বলেন, গত এক মাস ধরে গ্যাসের সংকটটা মারাত্মক পর্যায়ে। উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ। সক্ষমতার ৩০ শতাংশও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। সংগঠনের এই নেতার দাবি, বিটিএমএর প্রায় ১৭০০ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৫০০ সদস্য লাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভর করে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালায়। এদের ৯০ ভাগ কারখানা গ্যাস সংকটে ভুগছে। তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। গ্যাসের কারণে ডায়িংয়ের বয়লারগুলোও চালানো যাচ্ছে না। এদিকে নিট ডায়িং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, এক বছর আগে শিল্প গ্রাহকদের গ্যাসের মূল্য ৮৬ শতাংশ বাড়ানোর সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছিল সরকার। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং এক সপ্তাহ যাবৎ গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কারখানার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তার ভাষ্য, গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কোয়ার ইঞ্চি) আমাদের চাহিদা কিন্তু আমরা ৫ পিএসআইও পাই না। অধিকাংশ সময় ২/৩ পিএসআই গ্যাসের চাপে কারখানার কার্যক্রম চালাতে হয়। আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না পেলে তৈরি পোশাক শিল্পের উপর বড় আঘাত আসবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের একাধিক সংগঠনের নেতারা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন হ্রাস ও খরচ বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া এবং পণ্য রপ্তানি নিম্নমুখী হওয়াসহ চতুর্মুখী সংকটের নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকদের উপরও পড়তে শুরু করেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এরইমধ্যে বেশকিছু গার্মেন্টসে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়েছে। ক্ষতি পোষাতে না পেরে ছোট ও মাঝারি বেশকিছু পোশাক তৈরির কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সেখানকার শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা জেকে বসেছে। যা যে কোনো মুহূর্তে ক্ষোভে রূপ নিতে পারে। শ্রমিক নেতাদের আশঙ্কা, গরমের শুরুতে বিদ্যুৎ রেশনিং শুরু হলে এবং গ্যাস সংকট আরও বাড়লে বিপুল সংখ্যক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ৭ থেকে ৮ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে যেতে পারে। আর এসব বেকার শ্রমিকরা তাদের চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে আন্দোলনের রাজপথে নামলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। তাদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, খোদ গার্মেন্টস মালিকরাও তা স্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে গাজীপুরের একটি পোশাক তৈরি কারখানার মালিক রাজীব আহমেদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ফ্যাক্টরিগুলো ঠিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বায়ারদের সঙ্গে কমিটমেন্ট অনুযায়ী মাল শিপমেন্ট করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের পেমেন্ট দেওয়া কঠিন। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো যাচ্ছে না। (অথচ) মাস শেষে তাদের বেতন দিতে হচ্ছে। গ্যাস না পেলেও গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে শুধু গার্মেন্টস নয়, সব ধরনের শিল্পকারখানায় শিগগিরই অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-25 05:21:01.927285 +0100 CET