যায়যায়দিন
ইসলামী দলগুলো নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে

ইসলামী দলগুলো নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে

ট্রান্সজেন্ডার ও শিক্ষা কারিক্যুলাম ইস্যুতে এবার ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামতে চাইছে ১৩টি ইসলামী রাজনৈতিক দল। সরকার বিরোধী এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকছে ইসলামী আন্দোলন। সঙ্গে সমমনা ১২ দলীয় মোর্চা সম্মিলিতভাবে রাজপথে থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলন বেগবান করার চেষ্টা করবে। নির্বাচনের পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বাতিলের আন্দোলন করছে এমন সময় বহুল আলোচিত ট্রান্সজেন্ডার ও শিক্ষা কারিক্যুলাম ইস্যুতে আন্দোলন নিয়ে সরকারে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সমকামিতা বিরোধী বক্তব্য দেয়ায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আসিফ মাহতাবকে ইতোমধ্যেই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হয়েছে। এই শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের নেৃতত্বে গত ২৬ জানুয়ারি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। দলটির আমির তার বক্তব্যে বলেছেন, বিতর্কিত শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন ও ট্রান্সজেন্ডারকে প্রমোট করার চক্রান্ত চলছে। এমন চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে জনগণ এনিজওটির প্রতিটি ইট খুলে ফেলবে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সরোয়ারকেও একই ইস্যুতে চাকরিচ্যুত করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে দলটির তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইস্যুটিকে বড় করে সারাদেশে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। আহ্বান করা হতে পারে গণআন্দোলনের মতো কর্মসূচির। কর্মসূচি সফল করতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্যে রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী বিশেষ একটি ইসলামী দল। কৌশলগত কারণে দলটি প্রকাশ্যে আন্দোলনে থাকছে না। তবে জনবল দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রটি বলছে, দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামী দলটি দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ রয়েছে। এজন্য ইসলামী দলটি রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কৌশলগত কারণে ইসলামী দলটি বড় রাজনৈতিক সংগঠনটির ব্যানারে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। তবে ইসলামী ওই দলটি ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে সরাসরি গণমিছিল কর্মসূচী বাস্তবায়নের নেপথ্যের কারিগর হিসাবে কাজ করছে। দায়িত্বশীল একজন উর্ধতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘ দিন ধরেই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এজন্য নানা কর্মসূচি আহ্বান করা হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। পরিকল্পনার অংশ হিসাবে তারা ইতোপূর্বে সংবিধানে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনস্থাপন, নারী নীতি ও ফতোয়া সম্পর্কে উচ্চ আদালতের আদেশ বাতিল, শিক্ষানীতি সংশোধন, মহানবী (সঃ) এর কটূক্তিকারী ও ফেসবুকে মহানবী (সঃ) কে ব্যঙ্গ করে ছবি প্রকাশকারীদের শাস্তি প্রদান ও পর্দা প্রথার বিষয়কে ইস্যু হিসাবে সামনে রেখে আন্দোলন করেছে। আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে ফেলে দেওয়া। সেটিতে তারা সফল হয়নি। সূত্রটি বলছে, এমন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ইসলামী ও সমমনা ১২টি দল নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি বিশেষ মোর্চা। দলগুলো ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। ১২টি ইসলামী দল নিয়ে গঠিত মোর্চায় রয়েছে, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদ, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামিক পার্টি, আহকামে শরীয়ত হেফাজত কমিটি, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, মুসলিম লীগ, ন্যাপ ভাসানী, ভাসানী ফ্রন্ট ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচি সফল করতে ইতোমধ্যেই ঢাকার পুরানা পল্টনের একটি অফিসে প্রায়ই ১২ দলীয় মোর্চার বৈঠক হচ্ছে। কর্মসূচির সমন্বয়ক হিসেবে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন দলগুলোর সিনিয়র নেতারা। নেতাদের সার্বিকভাবে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে ডক্টর খলিলুর রহমান মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির আহম্মদ উল্লাহ আশরাফ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুর রব ইউসূফীর ঘনিষ্ঠদের। একজন ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও জানিয়েছেন, মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী, মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, ইসলামিক পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল মুবিন ও মাওলানা জাফর উল্লাহ খানের ঘনিষ্ঠরা দেশে বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে নানাভাবে সহযোগিতার করছেন। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। আর স্বাভাবিক কারণেই পবিত্র ইসলাম ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয়। সকল ধর্মই স্পর্শকাতর। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অতীতেও বার বার একই ইস্যুতে নানাভাবে সরকারকে বেকায়দায় রাখার চেষ্টা হয়েছে। বর্তমানেও সেই ধারা অব্যাহত আছে। তিনি আরও জানান, ইসলামী ও সমমনা ১২ দলীয় মোর্চা বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের অন্তর্ভুক্ত। যেজন্য বিএনপি-জামায়াতের ডাকা যেকোন কর্মসূচিতেই মোর্চাটির দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড থাকাটাই স্বাভাবিক। এমনটি সেটি দেখাও যায়। এবার সরকারবিরোধী যেকোনো কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক লোক সমাগম ঘটানোর পরিকল্পনা নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছে ১২টি ইসলামী দল নিয়ে গঠিত মোর্চাটি। সূত্রটি বলছে, মিছিলে দেশের বিভিন্ন মসজিদের ঈমাম, কওমী ও আলীয় মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের অংশগ্রহণ করানোর জন্য ব্যাপকভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা চলানো হচ্ছে। আন্দোলন বহুমাত্রিক করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। নানা ইস্যুতে আন্দোলন হবে। তবে পবিত্র ইসলাম ও শিক্ষা কারিক্যুলাম নিয়ে আন্দোলন চলমান রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকার রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। তবে প্রয়োজনে সকল ইসলামী দল সম্মিলিতভাবেও আন্দোলন করতে পারে। সে ধরনের পরিকল্পনা ও বোঝাপড়াও রয়েছে দলগুলোর মধ্যে। দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গণমিছিল বা গণআন্দোলনসহ নানা নামে আন্দোলনের চেষ্টা চলছে। তবে ইসলামী দলগুলোর আন্দোলন শুরু তবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে। এরপর ইসলামী দলগুলোর তরফ থেকে আয়োজিত মিছিল জাতীয় প্রেস ক্লাব, সচিবালয়, শাহবাগ, মালিবাগ, মগবাজার, বাংলামোটরসহ আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কর্মসূচির মধ্যে থাকছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের মত কর্মসূচি দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। সূত্রটি বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু হলে স্বাভাবিক কারণেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাঁধার মুখে পড়বে মিছিল। মূলত পরিকল্পিতভাবে ঝামেলা তৈরি করতেই এমন পরিকল্পনা। কর্মসূচি আহ্বানকারীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুবিধাজনক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধানোর চেষ্টা করতে পারে। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতাসীন সরকারকে দেশে-বিদেশে ইসলাম বিরোধী প্রমাণের চেষ্টা করা হবে। এমন আন্দোলনকে পূঁজি করতে পারে সরকার বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। সরকার বিরোধী নানামুখী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার এমন পরিকল্পনা চলছে। এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের তরফ থেকে কোনো ধরনের বাধা না দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে এমন কোন কর্মসূচি পালন করা যাবে না, যা জনগণের জন্য বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর আশঙ্কা রয়েছে, এমন কোন কর্মসূচি করার অনুমতি দেওয়া হবে না। বিনা অনুমতিতে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি কোনো দলকেই পালন করতে দেয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যায়যায়দিনকে বলেন, অতীতে অনেক আন্দোলন কর্মসূচিকে ঘিরে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এজন্য যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ অব্যাহত আছে। এছাড়া আন্দোলনের নামে নাশকতা ঠেকাতে র‌্যাবের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলন কর্মসূচিকে পূঁজি করে গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অতীতে অনেক রেকর্ড আছে। এজন্য র‌্যাবের তরফ থেকে সাইবার ওয়ার্ল্ডে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর চব্বিশ ঘণ্টাই মনিটরিং করা হচ্ছে। যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আন্দোলনের নামে গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে। যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-31 05:51:29.896019 +0100 CET