যায়যায়দিন
খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে দেশ

খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে দেশ

চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার বিদ্যুৎ খাতেও পড়তে শুরু করেছে। আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা যখন বাড়বে তখন এই সংকট ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় চলতি বোরো মৌসুমে সেচে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট যেভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে তাতে গ্রীষ্মে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কৃষক ঠিকমতো বিদ্যুৎ না পেলে সেচকাজ ব্যাহত হবে; উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলেন, সার-বীজসহ সব ধরনের কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে। এর ওপর বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিজেল ও কেরোসিনচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে শস্য খেতে সেচের পানি দিতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। এর ফলে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হবে, যা পোষাতে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। আর এভাবে দাম বাড়ালে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাদের ভাষ্য, বোরো উপকরণনির্ভর ফসল। কিন্তু উপকরণের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে, কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেললে; সে ঠিকমতো উপকরণ ব্যবহার করতে পারবে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হবে। উৎপাদন খারাপ হলে চালের ঘাটতি হবে। এমনিতেই এখন প্রায় ৭০ লাখ টন গম ও ভুট্টা আমদানি করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে যদি চাল আমদানি করতে হয়; তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষক ও অর্থনীতিবিদরা জানান, সারা বিশ্ব নানারকম সংকটে ভুগছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে অন্তত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। সেজন্য ফসল উৎপাদন কাজে প্রয়োজনীয় সেচের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কারণে তা শতভাগ সম্ভব না হলে জেনারেটরের মাধ্যমে সেচ কাজ চালিয়ে রাখতে যে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে কৃষককে সে পরিমাণ নগদ অর্থ সহায়তা দিতে হবে। ২০০৯-১০ সালের দিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এক কোটির বেশি কৃষককে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনে এবারও সে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, প্রতি বছর সেচ মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল) বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। গত মৌসুমে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট। গত বছরের তুলনায় এবার সেচ মৌসুমে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ পিক সিজনে ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে। তাই গ্যাস, ফার্নেস ও ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতির কথা বললেও ডলার সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সব দিক সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সেচ সংযোগ আছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫১টি। এ ছাড়া ৯ হাজার ৪৩২টি নতুন সেচ সংযোগের আবেদন করা আছে। শুধু সেচের জন্য ফেব্রুয়ারিতে ৮৬৫ মেগাওয়াট, মার্চে ১ হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট ও এপ্রিলে ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে দিনে গ্যাসের চাহিদা ১৫৪ থেকে ১৭৬ কোটি ঘনফুট হতে পারে। বিদ্যুকেন্দ্রে ফার্নেস তেল লাগবে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫০ টন, ডিজেল লাগবে ১৫ হাজার ৬০০ টন। দুই মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মতো জ্বালানি তেলের মজুত রাখতে হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। বিদ্যুৎ খাতের সঞ্চালন ও বিতরণের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ করতে হবে। এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চতুর্মুখী সংকটে তা কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। এদিকে গরমকালে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আগেভাগেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য তারা সরকারের নীতিকেই দায়ী করছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গ্যাসের বর্তমান সংকট চলমান থাকলে আসছে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এতে কলকারখানার উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, গরমকালে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যাবে। তখন যদি এই গ্যাসের সমস্যা থাকে, তাহলে গরমকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রকট হবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডেফিনেটলি সেটার একটা নেতিবাচক ইফেক্ট পড়বে। তিনি আরও বলেন, আগামীতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আমদানি করে চাহিদা পূরণ করাই হবে দেশের বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা জ্বালানি সংকট যেটা, সেটা ডলারের সংকট না কাটলে স্বল্পকালীন কোনো সমাধান নেই। জ্বালানি বিেেশষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘আমদানি করব বলে আমরা নিজেদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো অবহেলা করলাম। এখন শীতকালে চাহিদা কম থাকার পরও আমরা গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না। গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে সেটির বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৪০ শতাংশের মতো। গরমে এ সংকট আরও তীব্র হলে বিদ্যুতের বড় ঘাটতি সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে।’ অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি এবং ডলার সংকট মিলিয়ে এ বছর বিদ্যুৎ চাহিদা কীভাবে সামাল দেয় সরকার সেটি দেখার বিষয়। সক্ষমতা থাকার পরও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারাটা সরকারের কাঠামোগত সমস্যা হিসেবেই দেখেন তিনি। এই অর্থনীতিবিদের ভাষ্য, বাংলাদেশের এ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের জায়গা একটা হলো বিদ্যুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি। আবার এ সরকারের সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাই হলো সেই অর্থে একটা খুবই ভ্রান্ত বিদ্যুৎ বা জ্বালানি নীতি। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ৭৮টি। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার ৭৭৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে তেল ভিত্তিক ৪৭টি কেন্দ্রের ক্ষমতা ৫ হাজার ৩৬০ মেগাওয়াট। অথচ বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী তেল আমদানি করতে পারছে না। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বিপিসির কাছ থেকে তেল কিনতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন ডলার সংকট এবং এলসি জটিলতা না কাটলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে এ বছর। যা শুধু শিল্প উৎপাদনই নয়, কৃষি উৎপাদনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়েক বছর আগেও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে গ্যাস নির্ভরতা ৫০ শতাংশের কম। নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ এখন এলএনজি আমদানির মাধ্যমে গ্যাস সংকট মেটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যা গ্রীষ্মের আগে না কাটলে বড় সংকট সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে খাদ্য নিরাপত্তায় ‘বিদ্যুৎ ঝুঁকি’ বড় হয়ে দাঁড়াবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্য, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রীষ্মকালে সময়মতো জমিতে সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন কমে খরচ বাড়বে। এছাড়া শ্রমিক খরচ বৃদ্ধি পাবে। যা ফসলের দামের সঙ্গে যোগ হবে। অথচ ধান বা অন্যান্য ফসল বিক্রির সময় এই বাড়তি খরচ করা টাকা তোলা ততটা সহজ হবে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দাম বেড়ে যাওয়ায় গত মৌসুমের চেয়ে এবার টিলার মেশিন ও পানির পাম্প, সার, কীটনাশক, বীজ, শ্রমিকসহ সবকিছুর জন্য বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হবে। আর যারা অন্যের জমিতে চাষ করেন, তাদের জন্য এবার বোরো চাষ করে লাভ করা আরও কঠিন হবে। অথচ বোরোর উৎপাদন দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট জরুরি। এ প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের ৫৪ শতাংশই আসে বোরো থেকে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় এ বছর বোরোর ভালো ফলন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত অবিলম্বে বাড়তি খরচ কৃষককে নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া। এটি পেলে কৃষক আরও বেশি জমিতে ধান চাষে উৎসাহিত হবেন বলে মনে করেন তিনি। যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-31 05:29:26.933261 +0100 CET