যায়যায়দিন
ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন!

ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন!

ঢাকা-১৩ আসনের মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া হাউজিং স্কুল অ্যান্ড কলেজে (৭৯ নম্বর কেন্দ্র) প্রথম ছয় ঘণ্টায় ভোট পড়েছিল ৫৫৪টি। তবে দুপুর ২টার পর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শেষের দুই ঘণ্টায় ৫২১টি ভোট পড়েছে এই কেন্দ্রে। এর মধ্যে শেষ আধ ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রটির ৭টি বুথে ৩৮০টি ভোট পড়েছে। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ভোটের এ তথ্য পাওয়া গেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা পর্যন্ত কেন্দ্রটিতে ৯২টি ভোট পড়ে, যা মোট ভোটারের ২ দশমিক ৫ শতাংশ। আর দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ৭ দশমিক ৮। যা পরবর্তী দুই ঘণ্টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে। তবে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তা এক লাফে ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। স্থানীয় ভোটাররা জানান, সকাল থেকে এই কেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকার প্রার্থীর পক্ষে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও ভোটারের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতেগোনা। দুপুরের পর তা সামান্য বাড়লেও মাত্র দুই ঘণ্টায় কোনোভাবেই ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়ার কথা না। শুধু এই একটি কেন্দ্রেই নয়, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সারাদেশের অধিকাংশ বুথেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভোটারের খরা থাকলেও বিকাল ৩টার পর থেকে ৪টা পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টায় অস্বাভাবিক গতিতে ভোটের হার বেড়েছে। যা শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা নির্বাচন পর্যবেক্ষকদেরই নয়, সাধারণ ভোটারদেরও হতবাক করেছে। নির্বাচন কমিশনের স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম ছয় ঘণ্টায় ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনে ভোট পড়েছে ২৫ শতাংশ (আংশিক)। এর মধ্যে ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে সবচেয়ে বেশি ৩৮ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। ওই সময় পর্যন্ত আসনটির ১৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৩টি কেন্দ্রে তথ্য পায় নির্বাচন কমিশন। আর সবচেয়ে কম ভোট পড়েছিল ঢাকা-১৫ (শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের একাংশ) আসনে। এখানে দুপুর ২টা পর্যন্ত ১১ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। এই আসনে মোট কেন্দ্র ১৩৬টির মধ্যে ৫৫টি কেন্দ্রের তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া দুপুর ২টা পর্যন্ত ঢাকার আসনভিত্তিক ভোট পড়ার হার ছিল ঢাকা-১ আসন : ২৮ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৮৬টি, তথ্য পাওয়া যায় ৪৬টির); ঢাকা-২ আসন : ২৪ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৯৭টি, তথ্য পাওয়া যায় ৬৯টির); ঢাকা-৩ আসন : ২৮ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১২৪টি, তথ্য পাওয়া যায় ৫৯টির); ঢাকা-৪ আসন : ১৯ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ৭৯টি, তথ্য পাওয়া যায় ৪টির); ঢাকা-৫ আসন : ১৮ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৮৫টি, তথ্য পাওয়া যায় ৩৪টির); ঢাকা-৬ আসন : ১৯ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ৯৮টি, তথ্য পাওয়া যায় ৩২টির); ঢাকা-৭ আসন : ১৮ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১২৫টি, তথ্য পাওয়া যায় ১৪টির); ঢাকা-৮ আসন : ১৪ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১১০টি, তথ্য পাওয়া যায় ৩টির); ঢাকা-৯ আসন : ১৬ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৬৯টি, তথ্য পাওয়া যায় ৮৪টির); ঢাকা-১০ আসন : ১৪ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১২০টি, তথ্য পাওয়া যায় ৪৪টির); ঢাকা-১১ আসন : ১৬ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৭৫টি, তথ্য পাওয়া যায় ২৩টির); ঢাকা-১২ আসন : ১৬ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৪০টি, তথ্য পাওয়া যায় ৬১টির); ঢাকা-১৩ আসন : ১৫ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৩৫টি, তথ্য পাওয়া যায় ৩৭টির); ঢাকা-১৪ আসন : ১৭ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৬৬টি, তথ্য পাওয়া গেছে ৪৩টির); ঢাকা-১৬ আসন : ১৬ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১৩৭টি, তথ্য পাওয়া যায় ৬৫টির); ঢাকা-১৭ আসন : ১৪ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ১২২টি, তথ্য পাওয়া যায় ৪২টির); ঢাকা-১৮ আসন : ১৯ শতাংশ (মোট কেন্দ্র ২১৮টি, তথ্য পাওয়া যায় ৯২টির); ঢাকা-১৯ আসন : ২৩ শতাংশ (মোট কেন্দ্রে ২৯২টি, তথ্য পাওয়া যায় ৮৪টির)। তবে শেষ দুই ঘণ্টায় এই চিত্র রাতারাতি পাল্টে যায়। ঢাকা-৩ আসনে দিন শেষে ৩৯ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়। এই হিসাবে মাত্র দুই ঘণ্টায় সেখানে ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ। একইভাবে ঢাকা-১ আসনে শেষ দুই ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ৮ শতাংশেরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার যেসব আসনে নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন, ওইসব আসনে ভোট কাস্টিং তুলনামূলক কম হয়েছে। সেখানে শেষ সময় ভোটার উপস্থিতির হারও ছিল স্বাভাবিক। আর যেসব আসনে নৌকার প্রার্থীর শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিল না, সেখানে শেষ সময় ভোট বেড়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ডক্টর বদিউল আলম মজুমদার ভোটের এই হার (৪০ শতাংশ) অসম্ভব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম ছিল। নির্বাচন কমিশন যে হারের কথা বলছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ও রাজনৈতিক সংকট কাটবে না বরং আরও গভীর হবে। বিভাজন আরও বাড়বে। মানুষের ভোটাধিকার আবারও হরণ করা হলো। এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আরও বলেন, ‘এই নির্বাচন আগেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক দল পাঠায়নি। এখন যা হলোÑ এতে আমাদের মাথা হেট হয়ে গেল। তারা এখন তাদের কোর্স অব অ্যাকশনে যেতে পারে।’ এদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনে শতকরা কতভাগ ভোট পড়ল, এর ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। কারণ, আইনে এ রকম কিছু নেই। পাশের দেশ ভারতেও ভোট কম পড়ে। কিন্তু সমস্যা হলোÑ পাবলিক পারসেপশন নিয়ে। আর আন্তর্জাতিকভাবে কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ ভোট পড়লে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ছিল। ফলে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সেভাবেই দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করার কারণে ভোট কম পড়েছে। এমনিতেই মানুষের ভোট নিয়ে এখন আগ্রহ কম। এর ওপর এই বর্জন ভোটের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কারণ, বিএনপির কমপক্ষে ৩৬ শতাংশ ভোট আছে। তিনি মনে করেন, এই ভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংকট কেটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংকট কাটেনি। বিএনপি যদি তার আন্দোলনে মানুষকে আরও সম্পৃক্ত করতে পারে, তাহলে সংকট আরও বাড়বে। আগেও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়নি, এখনো হলো না। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে হয়ত সংকট কাটত। এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশ ভোট বেড়ে যাওয়ার তথ্য সন্দেহজনক। তার ভাষ্য, সাত ঘণ্টায় ২৭ আর এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশের তথ্য দিয়ে অবিশ্বাস্য করে তুলেছে ভোটের হারের বিষয়টি। তিনি আরও বলেন, ‘আমি ঢাকার যে কেন্দ্রে ভোট দিয়েছি, সেখানে ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বিকাল সাড়ে ৩টার পর পর্যন্ত। আমি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদও দিলাম।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ডক্টর ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৭ শতাংশ হলে এক ঘণ্টায় এতটা কী করে হতে পারে, সেটা নিয়ে সবার ভেতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভোট কাস্টিং কম হতেই পারে। কারণ, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ যাযাদি/ এস
Published on: 2024-01-09 05:26:01.621 +0100 CET