প্রথম আলো
তাঁরা প্রথম ‘ট্রেনবালা’, কেমন কাটছে চাকরিজীবন

তাঁরা প্রথম ‘ট্রেনবালা’, কেমন কাটছে চাকরিজীবন

এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন আনিকা আক্তার। পারিবারিক সমস্যায় পড়ালেখা আর এগোয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর আনিকার মা, দুই বোন ও এক ভাইয়ের পরিবার সামলে রেখেছিলেন তাঁর মামারা। আনিকাও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। অবশেষে সফল হয়েছেন। তিনি এখন ‘ট্রেন স্টুয়ার্ড’। তবে গণমাধ্যমে ‘ট্রেনবালা’ শব্দটি ব্যবহার হওয়ায় এটিই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। ৪৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে গত ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কক্সবাজার এক্সপ্রেস। এই ট্রেনেই নারীদের জন্য প্রথম চালু হওয়া ট্রেন স্টুয়ার্ড পদে নিয়োগ পেয়েছেন আনিকা। তিনি ট্রেনের যাত্রীদের, বিশেষ করে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করে থাকেন। কক্সবাজার এক্সপ্রেস দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে কক্সবাজার রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছাতে আট ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। আবার রাত সাড়ে ১০টায় ট্রেনটি পুনরায় কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করে। আনিকা এক দিন পরপর কক্সবাজার-ঢাকা এবং ঢাকা-কক্সবাজার রুটে দায়িত্ব পালন করেন।ট্রেনের যাত্রী বা অন্যদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন বা বাজে মন্তব্য শুনতে হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে ২৩ বছর বয়সী আনিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশপাশের লোকজন কে কী বললেন, তা শুনলে চলবে না। আমি চলিও না। ট্রেনের যাত্রীরা বেশির ভাগই ইতিবাচক মন্তব্য করেন, শুভেচ্ছা জানান। দু-একজনের মন্তব্য কানে আসে অবশ্য। তাঁরা বলেন, “মেয়েরা ছেলেদের আর কাজ করতে দেবে না।” কেউ কেউ বাজে ইঙ্গিতও করেন। তবে সংখ্যাটা একেবারেই নগণ্য। আমার পরিবারের এ কাজে কোনো আপত্তি নেই।’> > ট্রেন স্টুয়ার্ড পদে নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এইচএসসি পাস।কক্সবাজার এক্সপ্রেস, একই রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে যাত্রীদের সহায়তার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ৩০ জন নারী ট্রেন স্টুয়ার্ড হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি পর্যটক এক্সপ্রেসে পাঁচ নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে চলাচলকারী যাত্রীরা নারীদের কাছ থেকে এ সহায়তা পাচ্ছেন। ট্রেন স্টুয়ার্ড পদে নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এইচএসসি পাস। বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এখন পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া নারীদের বেশির ভাগেরই বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। প্রাথমিক পর্যায়ে এই নারীরা বেতন পাচ্ছেন ১৫ হাজার টাকা করে। দায়িত্ব পালনের সময় থাকা-খাওয়ার সব খরচ বহন করছে নিয়োগ দেওয়া বেসরকারি সংগঠনগুলো।চলন্ত ট্রেনে অগ্নিনিরাপত্তাসহ কোন বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে, যাত্রীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে; অর্থাৎ সার্বিক বিষয়ে নারী ট্রেন স্টুয়ার্ডদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ রেলওয়ে অনবোর্ড ক্যাটারিং সার্ভিস প্রোভাইডার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। এ অ্যাসোসিয়েশনের তালিকাভুক্ত দুটি সংস্থা এখন পর্যন্ত নারীদের নিয়োগ দিয়েছে। এই নারীরা নির্দিষ্ট পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রামের মেয়ে সাদিয়া আফরিন বিবিএ প্রথম বর্ষে পড়ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনিও কক্সবাজার এক্সপ্রেসে স্টুয়ার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা ছয় ভাই-বোন। বাবা ব্যবসা করেন। জানালেন, একসঙ্গে এত দীর্ঘপথ ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই প্রথম দিকে খারাপ লাগত। এখন আর খারাপ লাগে না।> > শুধু ট্রেনের এসি চেয়ার কোচে এই নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন।বাংলাদেশ রেলওয়ে অনবোর্ড ক্যাটারিং সার্ভিস প্রোভাইডার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, এই নারীরা ট্রেন স্টুয়ার্ড হিসেবে নিয়োগ পেলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রথম ট্রেনবালা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাই এই শব্দই পরিচিতি পেয়েছে। বিমানের যাত্রীদের সেবায় থাকা নারীদের অনেকে যেমন বিমানবালা বলেন, এ ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে।মোহাম্মদ শাহ আলম এসএ করপোরেশন নামক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানালেন, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে তাঁর এই সংস্থা নারীদের নিয়োগের বিষয়টি তদারকি করছে। আর পর্যটক এক্সপ্রেসে নারীদের নিয়োগ ও তদারকি করছে হাবিব বাণিজ্য বিতান নামের একটি সংস্থা। নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই শুধু ট্রেনের এসি চেয়ার কোচে এই নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে জান্নাত আক্তার বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। বিএসএস সম্পন্ন করা জান্নাত পরিবারের বড় মেয়ে। তাঁর দুই বোন ও এক ভাই আছেন। বাবা ব্যবসা করেন। কাজের অভিজ্ঞতায় বললেন, যাত্রীরা আন্তরিক ব্যবহার করেন। যাত্রীদের কেউ কেউ ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার আগে তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণও জানান। জান্নাত বললেন, ‘নারীদের নতুন কাজ বা এ ধরনের কাজ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা থাকে, তা দূর করার জন্যই এখানে কাজ করতে এসেছি। তবে পুরুষ যাত্রীরা সবাই ভালো না-ও হতে পারেন। তাই একটু সতর্ক থাকতেই হয়। এখন পর্যন্ত বাজে কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।’আনিকা, জান্নাতেরা যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে সহায়তা করেন। বয়স্ক যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজর রাখেন। নারী ও শিশুদের শৌচাগারে যেতে সহায়তা করা বা অন্য কোনো সহায়তা চাইলে তা করেন। বগির শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না, বগি নোংরা হলো কি না, এগুলো তদারকি করে যথাযথ ব্যক্তিদের দিয়ে কাজগুলো করিয়ে নেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে অনবোর্ড ক্যাটারিং সার্ভিস প্রোভাইডার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, এখন পর্যন্ত নারীদের অস্থায়ীভাবে এ নিয়োগের বিষয়টিকে সবাই সাধুবাদ জানাচ্ছেন। এতে নারীদের কর্মস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিরতিহীন সব আন্তনগর ট্রেনে নারীদের নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে।
Published on: 2024-01-15 16:12:14.422368 +0100 CET