প্রথম আলো
চুলায় গ্যাস নেই, তবু মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা

চুলায় গ্যাস নেই, তবু মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা

দিনের বেশির ভাগ সময় রান্নার চুলায় হয় গ্যাস থাকে না, নয়তো গ্যাসের চাপ খুবই কম থাকে। কয়েক মাস ধরেই রাজধানীর শাহজাহানপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, রায়েরবাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় এ অবস্থা চলছে। প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি রাজধানীর পাশের জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অন্য বড় শহরগুলোতেও। চুলায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস থাকুক বা না থাকুক, একজন গ্রাহককে মাসে গ্যাস বিল (দুই চুলা) দিতে হয় ১ হাজার ৮০ টাকা। এই বিল এখন ৫১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব মানা হলে দুই চুলার ক্ষেত্রে মাসে বিল আসবে ১ হাজার ৫৯২ টাকা। অন্যদিকে এক চুলার জন্য এখন মাসে বিল দিতে হয় ৯৯০ টাকা। এই বিলও ৩৯০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের সপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য–উপাত্ত আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থাকে গতকাল সোমবার চিঠি দিয়েছে ওই কমিটি। তথ্য–উপাত্ত যাচাইয়ের পর চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই নিজেদের সিদ্ধান্ত কমিশনকে জানাবে তারা। যাদের বাসায় গ্যাসের চুলা রয়েছে, তাদের একটি অংশ মাস শেষে গ্যাসের বিল জমা দেয়। তাদের বলা হয় মিটারবিহীন গ্রাহক। অন্যদিকে যাদের বাসায় গ্যাসের মিটার রয়েছে, তাঁরা যতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন, ঠিক ততটুকুই বিল দেন। তাঁদের বলা হয় প্রিপেইড মিটার গ্রাহক। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে যাঁদের বাসায় দুই চুলা রয়েছে, সে ধরনের একজন গ্রাহক মাসে সাধারণত সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন। সেখানে মিটারবিহীন গ্রাহকেরা মাসে ৬০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন—এমন হিসাব করে বিল নেওয়া হয়। মিটারবিহীন গ্রাহকেরা আরও বেশি গ্যাস ব্যবহার করেন—এ রকম হিসাব করে এখন বিল বৃদ্ধি করতে চায় বিতরণ সংস্থাগুলো। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৪৩ লাখ গ্রাহকের বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রিপেইড গ্রাহক প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার।চুলায় গ্যাসের ব্যবহার ৬০ ঘনমিটারের চেয়ে বেশি ধরে মাসিক বিল সমন্বয় করতে গত বছর বিইআরসিতে আবেদন করে ঢাকা ও আশপাশের জেলায় গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। এর বাইরে আরও পাঁচটি গ্যাস বিতরণ সংস্থা থাকায় এ বিষয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) মতামত চায় বিইআরসি। তিতাসের আবেদন অন্যদের জন্যও বিবেচনায় নিতে সুপারিশ করে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। সর্বশেষ গত মাসে বিইআরসির সভায় এটি বিবেচনায় নেওয়া হয়। আর গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে গঠন করা হয় কারিগরি কমিটি। দুই চুলার ক্ষেত্রে ৮৮ দশমিক ৪৪ ঘনমিটার ও এক চুলায় ৭৬ দশমিক ৬৫ ঘনমিটার নির্ধারণের আবেদন করেছে তিতাস। আবাসিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম এখন ১৮ টাকা। তিতাস গত অর্থবছরে (২০২২–২৩) সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ৭০৬ কোটি টাকা। এরপরও তারা মুনাফা করেছে ১৫৮ কোটি টাকা। তিতাস গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. নূরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গণশুনানি বা পরবর্তী করণীয় বিষয়ে বিইআরসির সভায় সিদ্ধান্ত হবে।২০২২ সালের জুনে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের দাম বাড়ায় বিইআরসি। তখন প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৮ টাকা করা হয়। তবে মিটার ছাড়া গ্রাহকদের জন্য মাসে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে দুই চুলায় ৬০ ঘনমিটার এবং এক চুলায় ৫৫ ঘনমিটার ধরা হয়। এতে দুই চুলার মাসিক বিল ১ হাজার ৮০ ও এক চুলার বিল ৯৯০ টাকা ঘোষণা করা হয়। বিইআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন, বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ রান্নার জন্য চুলায় সার্বক্ষণিক গ্যাস পাচ্ছেন না। অথচ প্রতি মাসে গ্যাস বিল পুরোটাই দিতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাসের দাম বাড়াতে চাইছে। তাদের প্রস্তাব যাচাই করে দেখতে হবে। মূল্যবৃদ্ধির জন্য বিতরণ সংস্থার প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে বিইআরসির পরিচালক (গ্যাস) ফজলে আলমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কারিগরি কমিটি এখন কাজ করছে। গত ছয় মাসে প্রিপেইড মিটারে গ্যাসের ব্যবহার, মিটারবিহীন চুলায় ব্যস্ত ও প্রান্তিক এলাকায় গ্যাসের ব্যবহারসহ বিতরণ সংস্থার কাছ থেকে তারা বিভিন্ন তথ্য চেয়েছে। সব তথ্য পাওয়ার পর কমিটি নিজেও সরেজমিন অনুসন্ধান করে সত্যতা যাচাই করবে। এরপর সব তথ্য বিশ্লেষণ করে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে কমিটি। বিইআরসির পরিচালক (গ্যাস) ফজলে আলম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস বিতরণ সংস্থার আবেদনের যৌক্তিকতা যাচাই করতে নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন। সব যাচাই–বাছাই করে এ মাসের মধ্যেই কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি।গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাসের দাবি, কোনো ধরনের সমীক্ষা বা তথ্য বিশ্লেষণ না করেই চুলায় কত ঘনমিটারের গ্যাস ব্যবহার হয়, সে পরিমাণ নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। রান্নার বাইরেও পানি বিশুদ্ধ করতে গ্যাসের ব্যবহার হয়। আবার শিল্পকারখানা এলাকায় এক বাসায় একাধিক পরিবার ভাড়া (সাবলেট) থাকে, ফলে রান্নায় গ্যাসের ব্যবহার বেশি হয়। এতে কারিগরি ক্ষতি বেড়েছে এবং তিতাস আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে তিতাস দেখিয়েছে, আবাসিক গ্রাহকেরা মাসে গড়ে ৯৭ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন। তবে প্রিপেইড মিটার গ্রাহকদের কোনো তথ্য প্রস্তাবে উল্লেখ করেনি।বিইআরসি সূত্র বলছে, গ্যাসের দাম নিয়ে ২০২২ সালের মার্চ মাসে গণশুনানিতে তিতাসের ৩ লাখ ২০ হাজার ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির ৫০ হাজার প্রিপেইড মিটার গ্রাহকের গ্যাস বিল বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তখন দেখা যায়, দুই চুলার গ্রাহকেরা গড়ে ৪৫ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন মাসে। এটি কিছুটা বাড়িয়ে ৬০ ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়েছিল মিটারবিহীন গ্রাহকদের জন্য। ওই সময় বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে ঘনমিটারের পরিমাণ আরও কমানো হবে। তিতাসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমানে তিতাসের প্রিপেইড মিটার গ্রাহক আছে ৩ লাখ ৮০ হাজার। প্রতি মাসে গড়ে ১৬ থেকে ১৮ কোটি টাকা বিল পায় তারা। সে হিসাবে মাসে গ্রাহকপ্রতি গড়ে বিল দাঁড়ায় ৪৭৪ টাকা। মাসে একজন গ্রাহক গড়ে ২৭ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন। এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত তিতাসের প্রিপেইড মিটার গ্রাহকদের বিল বিশ্লেষণ করে ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। তাতে দেখা যায়, প্রতি মাসে মিটার গ্রাহকদের কাছ থেকে গড়ে ১৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা আয় করেছে তিতাস। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের ওই সময়কার দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা হিসেবে তাদের মাসিক ব্যবহার দাঁড়ায় গড়ে প্রায় ৩৪ ঘনমিটার। মাসে তাদের গড় বিল ছিল ৪২৮ টাকা।রাজধানীর অনেক এলাকার গ্রাহকেরা গ্যাসের অভাবে চুলা জ্বালাতে পারছেন না। গত দুই মাসে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করে জানাচ্ছেন গ্রাহকেরা। কেউ কেউ ফেসবুকেও পোস্ট দিচ্ছেন ভোগান্তির কথা জানিয়ে। বেশির ভাগের অভিযোগ, রাতে কয়েক ঘণ্টা থাকলেও দিনে একদমই গ্যাস থাকে না চুলায়। রায়েরবাজার মাদ্রাসা গলির বাসিন্দা মো. হাছান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রাত ১১টার দিকে গ্যাস আসে, সকাল ছয়টায় চলে যায়। কিন্তু মাসে ঠিকই বিল দিতে হচ্ছে। আবার রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারও কিনতে হচ্ছে। এক সিলিন্ডারে খরচ হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকার মতো। একই অভিযোগ করলেন মোহাম্মদপুরের গৃহিণী কামরুন্নেছা রুহী। তিনি বলেন, আগে সকাল আটটা পর্যন্ত রান্না করা যেত। এখন সেই সুযোগও নেই। এমনিতেই বাজারে বাড়তি খরচ, এর সঙ্গে গ্যাসের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দিনে ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে শিল্প–আবাসিকের চাহিদার অনেকখানি পূরণ করা সম্ভব হয়। এখন সরবরাহ হচ্ছে ২৫০ কোটি ঘনফুটেরও কম। ডলার–সংকটে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন কমেছে। আমদানি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না দিয়ে বিল বাড়ানোর প্রস্তাব অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এই সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, চুলায় ঠিকমতো গ্যাস না থাকলেও গ্রাহককে পুরো বিলই দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রান্নার চুলায় গ্যাস না দিয়ে এলপিজির বাজার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এতে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ আছে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষ কষ্টে আছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা আসে কীভাবে?
Published on: 2024-01-16 10:08:16.101351 +0100 CET