প্রথম আলো
‘রান্নার জন্য এমন ঠান্ডায় রাতবেরাতে উইঠা বইয়া থাকতে হয়’

‘রান্নার জন্য এমন ঠান্ডায় রাতবেরাতে উইঠা বইয়া থাকতে হয়’

শেষরাতে বৃদ্ধ আরশ আলীর ঘুম ভেঙে যায় প্রতিদিন। এরপর বিছনা ছেড়ে সোজা চলে যান রান্নাঘরে। চুলার চাবি ঘুরিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, গ্যাসের চাপ আছে কি না? গ্যাসের চাপ বেশি থাকলে স্ত্রী কামরুন্নেসাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আরশ আলী বলেন, ‘চুলায় গ্যাস আছে। রান্না বসাও।’ স্বামীর ডাকে উঠে পড়েন বৃদ্ধা কামরুন্নেসা। এরপর হাতমুখ ধুয়ে চলে আসেন রান্নাঘরে। চুলা জ্বালিয়ে ভাত চড়ান। কামরুন্নেসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে শীতের দিন আসলে কমতো কিন্তু কোনো রকম রান্না কইরা খাইতে পারতাম। এখন যে রকম হইতাছে, চলার মতো না। গ্যাসের চাপ এতই কম থাকে যে পাক করার (রান্না করা) কোনো উপায় থাকে না। রান্না করতে হইলে ভোররাত তিনটায় উঠতে হবে। দুই মাস ধরে সকাল ছয়টার পর গ্যাস চলে যায়।’ ৬০ বছরের সংসার আরশ আলী ও কামরুন্নেসার। গ্রামে বাড়ি কুমিল্লায় হলেও অনেক বছর ধরে আছেন ঢাকায়। বসবাস করেন পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের রূপলাল দাস লেনের একটি বাসায়। প্রায় এক কাঠা জমির ওপর সেমিপাকা টিনের তৈরি নিজেদের ঘরের বাইরে গ্যাসের চুলা। মাঘের হাড়কাঁপানো এই শীতের রাতে সেখানে বসেই সারতে হয় রান্নার কাজ।কামরুন্নেসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘রান্নার জন্য এমন ঠান্ডায় রাতবেরাতে উইঠা বইয়া থাকতে হয়। সন্ধ্যারাত্রি তরিতরকারি কুইট্টা রাখতে হয়। গতকালও (সোমবার) রাত ১১টা বাজে তরিতরকারি কুইট্টা কমপ্লিট করে ফ্রিজে রেখে দিই। ভোর রাতে উঠে রান্না করে ফেলি। কারণ ছয়টা–সাতটা বাজে তো গ্যাসও চলে যায়।’ *যতই শীত থাকুক, পেট তো মানবে না* আরশ আলী বললেন, ‘মাঘের এই সময় গভীর রাতে অনেক শীত থাকে। যতই শীত থাকুক, পেট তো মানবে না। রান্নার সময় আজান দিলে আমি নামাজ পড়ে নিই। এরপর আমি রান্নাঘরে আসি। তখন সে (স্ত্রী) নামাজ পড়তে যায়। আমি তরকারি নাড়াচড়া দিই। যাতে আমরা টাইমের ভেতর রান্নাবান্না করে নিতে পারি।’ দিনের বেলা গ্যাসের চাপ কম থাকায় আরশ আলী ও কামরুন্নেসা দম্পতির রাতে রান্না করার এমন চিত্র এখন তাঁদের যাপিত জীবনের অংশ। এই দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ের সবারই বিয়ে হয়ে নিজেদের সংসারে ব্যস্ত। ছেলেদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো না বলে জানালেন আরশ আলী। বললেন, ‘জিনিসপত্রের দামও অনেক বেশি। আমার তেমন রোজগার নেই। আত্মীয়স্বজনেরা কিছু দেয়। ঘরভাড়া দেওয়া লাগে না বলে কোনো রকম খেয়েপরে আমরা বেঁচে আছি।’*‘রাতে রান্না না করে উপায় নেই’ * আরশ আলী দম্পতির মতোই অবস্থা পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ রোডের ভাড়াটে জোহরা বেগম ও মোতালেব হোসেন দম্পতির। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সবার বিয়ে হয়েছে। তবে দুই ছেলেও স্ত্রী–সন্তান নিয়ে  ফরাশগঞ্জেই বসবাস করেন। দুই মাস ধরে দিনের বেলা গ্যাসের চাপ কম থাকে ফরাশগঞ্জে। রাতের বেলা রান্না করেন জোহরা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শীত আইলে গ্যাসের সমস্যা হয়। এবারও হয়েছে। কিন্তু এবার দিনের বেলা গ্যাস থাকে না বললেই চলে। রাতে রান্না করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। রান্নার জন্য গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠি। কোনো দিন রাত তিনটায়, কোনো দিন চারটায়।’*‘ছয় দিন আগে এলপি গ্যাস কিনে নিয়েছি’ * আরেক ভুক্তভোগী পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার মো. আলমগীর। তাঁর পরিবারের সদস্য ৯ জন। মাসখানেক ধরে দিনের বেলা এই এলাকায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। আলমগীরের ভাষ্য, গ্যাসের সমস্যা থাকায় এক মাস আগে তিনি একটা রাইস কুকার কিনেছিলেন। সেটিতে ভাত রান্না হতো। আর মধ্যরাতে বাকি রান্না করতে হচ্ছিল। আলমগীর মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় দিনের বেলা সকাল থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। সন্ধ্যা সাতটার পর একটু পিনিপিনি (কম) আসে। মাসখানেক ধরে এই অবস্থা। রান্নার জন্য আগে দুইটা বাজেও উঠতে হয়েছে, তিনটা বাজে উঠতে হয়। এ জন্য ছয় দিন আগে এবার এলপি গ্যাস কিনে নিয়েছি।’ শুধু এই তিন পরিবারই নয়, এমন অবস্থা এখন রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোরও। দিনের বেশির ভাগ সময় রান্নার চুলায় হয় গ্যাস থাকে না, নয়তো গ্যাসের চাপ খুবই কম থাকে। প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি রাজধানীর পাশের জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অন্য বড় শহরগুলোতেও। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক চুলা ও লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে।এদিকে নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি আরও দুই শিল্প এলাকা সাভার ও গাজীপুরের শ্রীপুরেও শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস–সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। মোটামুটি ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পেলে বড় ধরনের অসুবিধা হয় না। কিন্তু এ সরবরাহ ধরে রাখা যায়নি। দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এলএনজি আনা হচ্ছে কম। তাই এখন দিনে ২৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে গ্যাসের সরবরাহ। এতে শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকেরা গ্যাস–সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
Published on: 2024-01-23 18:51:50.962051 +0100 CET