প্রথম আলো
‘নারী কামরায় ভিড় কম যাঁরা বলেন, তাঁরা একবার দেখে যান’

‘নারী কামরায় ভিড় কম যাঁরা বলেন, তাঁরা একবার দেখে যান’

সকাল ৯টা বাজতে তখন আরও চার মিনিট বাকি। রাজধানীর মিরপুরে মেট্রোরেলের পল্লবী স্টেশনে ঢোকার মুখে তত ব্যস্ততা নেই। টিকিট কাটার লাইনটিও সহনীয় মাত্রার দীর্ঘ। এই প্রতিবেদকের মতো যাঁরা মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী নন, তাঁদের জন্য এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে ‘ধন্দ’ সৃষ্টি করে। আজ বুধবার অফিস যাত্রার এই সময়ে স্টেশনে তো উপচেপড়া ভিড় থাকার কথা! তার মানে কি যাত্রী কম! তবে মেট্রোরেলের কামরা দেখার পর সেই ভুল ভাঙল। প্রতিটি জায়গায় শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য হওয়ায় অযথা জটলা নেই। কিন্তু একেকটা কামরায় তিল পরিমাণ ফাঁকা জায়গা নেই। ব্যক্তিক্রম নয় নারী কামরার অবস্থাও। এক নারী যাত্রীর ভাষ্য, ‘অফিস যাওয়ার সময়ও নারী কামরায় ভিড় কম যাঁরা বলে বেড়ান, তাঁদের এই কামরা একবার ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার।’ তাঁর মতো আরও কয়েক নারীর দাবি, অন্তত ‘পিক আওয়ারে’ (অফিসে যাওয়া-আসার সময়) নারীদের জন্য তিনটা বগি বরাদ্দ করা উচিত। কারণ, চলাফেরার সুবিধার ওপরও অনেক নারীর চাকরি করা, অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া নির্ভর করে।পল্লবী স্টেশনের টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল সিরাজুম মুনীরা নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, তিনি নারী কামরা ও সাধারণ কামরা—দুটিতেই যাতায়াত করেন। আজ নামবেন শাহবাগ স্টেশনে। তাঁর ছেলের স্কুলে একটি আবেদনপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজনে যাচ্ছেন। এই প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ও নারী কামরায় যাওয়ার কথা শুনে তিনিও আজ নারী কামরায় চড়লেন। রেলের ইঞ্জিনের কাছে একদম শুরুর কামরাটি নারী যাত্রীদের জন্য বরাদ্দ। প্ল্যাটফর্মে গোলাপি রঙের ওপর ‘মহিলা’ লিখে রেলের নারী কামরাটি কোথায় এসে দাঁড়াবে, সেই নির্দেশনা দেওয়া। প্ল্যাটফর্ম থেকে কামরায় প্রবেশের ব্যারিয়ারেও গোলাপি রং দিয়ে নির্দেশনা লেখা রয়েছে।২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর আংশিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য মেট্রোরেল উদ্বোধন হয়। এ বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে সপ্তাহে ছয় দিন সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু করেছে। পুরোপুরি চালু হওয়ায় অফিসে যাওয়া-আসার সময়টাতে মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড় থাকে।৯টা ৮ মিনিটের মেট্রোরেলের নারী কামরায় উঠে দেখা গেল, যাত্রীতে ঠাসা কামরাটি। দিয়াবাড়ির উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে পল্লবী স্টেশন আসতে তিনটি স্টেশন পার হয়েছে ট্রেনটি। পল্লবীতে ট্রেন থামার পর নারী কামরা থেকে কাউকে নামতে দেখা যায়নি। এরপর মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও ও বিজয় সরণি স্টেশন থেকে নারী যাত্রীরা উঠছিলেন আর উঠছিলেন। হাতে গোনা কয়েকজন শুধু নেমেছেন। একপর্যায়ে ‘দম বন্ধ করা’ ভিড় হয়ে গেল। কামরার এক নারী যাত্রী সালমা আক্তার। তাঁর গন্তব্য মতিঝিলে। তিনি আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডে কর্মরত। মিরপুর-১০ স্টেশন থেকে উঠেছেন।সালমা বললেন, মেট্রোরেল চালুর আগে তিনি সকাল পৌনে আটটায় মিরপুর-১০ থেকে নারী বাসে উঠতেন। মতিঝিল যেতে দেড়-দুই ঘণ্টা লাগত। এখন ২২ মিনিটে পৌঁছান। সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করা ও সংসারের কিছু কাজ গুছিয়ে রাখার সময় পান এখন। বললেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছি। আমি কি চাকরি করব না? যাতায়াত যদি ভালো হয়, তাহলে আরও বেশিসংখ্যক নারী চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন। তাই নারীদের কথা ভেবে পিক আওয়ারে মেট্রোতে অন্তত তিনটা কামরা বরাদ্দ রাখা দরকার। প্রধানমন্ত্রী অনেক নারীবান্ধব। আপনাদের লেখার মাধ্যমে তুলে ধরলে তিনি নিশ্চয় কামরার বরাদ্দ বাড়াবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনিই দেখুন কামরার কী অবস্থা! এখন স্টেশন সংখ্যা বেড়েছে। ভিড়ও বেড়েছে। যাঁরা বলেন, নারী কামরায় ভিড় কম। তাঁরা একবার দেখে যান কামরাটি।’ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত হালিমাতুস সাদিয়া বললেন, মেট্রোরেলে নারী কামরা থাকার প্রয়োজন আছে। নারীদের সঙ্গে ভিড়েও দাঁড়ানো যায়। অস্বস্তি হয় না। মেট্রোরেলে চলাচলে সময় বাঁচে। ফলে পুরুষদের মতো নারী যাত্রীরাও মেট্রোতে বেশিসংখ্যক উঠবেন, এটাই স্বাভাবিক।সিরাজুম মুনিরা নামের যাত্রী বললেন, অনেক সময় অন্য কামরায় উঠলে পুরুষ যাত্রীরা বলেন, ‘“আপনারা নারী কামরায় যান, ভিড় কম।” নারী কামরায় ভিড় আসলে কম নয়। নারী যাত্রীদের কথা ভেবে কামরার সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত।’ মিরপুর-১১ স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে উঠেছিলেন বেলী আক্তার নামের এক পোশাককর্মী। তিনি জানালেন, ৫ মাসের ছেলে সন্তানকে চিকিৎসক দেখাতে বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২-এ (মা ও শিশু) যাচ্ছেন। পুরুষদের সঙ্গে এত ভিড়ে উঠতে চান না বলে তিনি নারী কামরায় উঠেছেন। আর ছেলেকে নিয়ে স্বামী অন্য কামরায় আছেন। শাহবাগ আসার পর কামরার ভিড় কমে বসার জায়গা পাওয়া গিয়েছিল। টিএসসি স্টেশন থেকে উঠে নারী কামরায় বসার জায়গা পেয়েছিলেন হালিমা আক্তার। তিনি মতিঝিলের অফিসপাড়ার নিয়মিত যাত্রী। এই প্রতিবেদককে বললেন, তিনি সব সময় নারী কামরাতে যাতায়াত করেন। তিনি এতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন।মতিঝিল থেকে ফেরার পথে ওই নারী কামরাটিই ‘সাধারণ কামরা’ হয়ে গেল। অন্য যাত্রীরা বললেন, শুরুর কামরাটি নারী কামরা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফিরতি পথে কামরাটি শেষের কামরা হিসেবে সাধারণ কামরা হয়ে গেছে। নারী কামরার উদ্যোগটিকে ভালো বললেও সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে নন মো. আতিকুল ইসলাম নামের এক যাত্রী। তিনি মতিঝিল থেকে উঠেছিলেন। গন্তব্য ফার্মগেট। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। তিনি বললেন, অফিস যাতায়াতের সময় অন্য কামরাগুলোতে এত ভিড় থাকে যে নারীরা আলাদা কামরায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। কামরাটিতে অত ভিড় থাকে না। বিশেষ করে অফ পিক আওয়ারে (অফিস যাতায়াতের সময় বাদে) একদম ফাঁকা থাকে। ফলে নারী কামরার সংখ্যা বাড়ালে পিক আওয়ারে অন্য কামরাগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।ফেরার সময় এবং অফিস যাতায়াতের সময় বাদে নারী কামরা কেন, সব কামরাই তুলনামূলক ফাঁকা থাকে বলে মন্তব্য করলেন মেহনাজ আক্তার নামের এক চাকরিজীবী নারী। ফেরার পথে নারী কামরায় ভিড় কেমন হয়, বোঝার জন্য কারওয়ান বাজারে নারী কামরার প্ল্যাটফর্মের সামনে অপেক্ষার সময় কথা হয় মেহনাজের সঙ্গে। তিনি কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। অফিসের কাজে আগারগাঁও যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ফেরার সময় সব কামরাই ফাঁকা থাকে। এর সঙ্গে পিক আওয়ারে নারী কামরার সংখ্যা না বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাতাশা আক্তার বললেন, মেট্রো তাঁর জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তাঁর বাসা মানিকনগরে। আগে রিকশায় যেতেন। এখন সময়ের সঙ্গে ভাড়াও তাঁর চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এসব হিসাব-নিকাশ সামনে থাকায় নারী কামরার বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনার সুযোগ নেই। কোনো কোনো যাত্রী বললেন, উদ্বোধনের পর মাত্র কয়েক দিন ধরে সব স্টেশনে চলাচল শুরু করেছে মেট্রোরেল। গরমের সময় ভিড়ের অভিজ্ঞতা এখনো হয়নি যাত্রীদের। গরমের সময় এত ভিড়ে কামরায় ঘামের দুর্গন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেটি রোধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের চিন্তাভাবনা করা দরকার।
Published on: 2024-01-31 14:10:55.901822 +0100 CET