প্রথম আলো
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত এগোয় না, কর্তৃপক্ষও চুপ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত এগোয় না, কর্তৃপক্ষও চুপ

চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগে ছয় মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়। চারটি করে কর্তৃপক্ষ এবং একটি ঠিকাদার। এসব মামলায় ১৯ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়। এখনো একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আসামিরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করলেও পুলিশ বলছে, খুঁজে পাচ্ছে না। অন্যদিকে এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা তদন্ত কমিটিও প্রতিবেদন দেয়নি। তদন্ত চলছে, এই অজুহাতে কর্তৃপক্ষও চুপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা বলছেন, তদন্ত কার্যত থেমে আছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হওয়ায় ঘটনা তদন্তে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গরজ দেখায় না। ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছেই।সর্বশেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা পাঁচ দিন ধরে ছাত্রলীগের তিনটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ৪৪ জন আহত হন। এসব ঘটনায় মামলা না করলেও একটি তদন্ত কমিটি করে কর্তৃপক্ষ। সেই তদন্তও এখনো শেষ হয়নি। যে চার ঘটনায় পাঁচটি মামলা করা হয়, তা ঘটে গত বছরের ২৯ আগস্ট, ৭ ও ২৫ সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি। পাঁচটি মামলাই হয়েছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায়। পুলিশের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে তথ্য দেয় না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নূরুল আজিম সিকদারের দাবি, পুলিশ যখন যে তথ্য চেয়েছে, সে তথ্যই তাঁরা দিয়েছেন। তদন্ত শেষ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।চার মামলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওই দিন শাটল ট্রেনের দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিরীণ আখতারের বাসভবন, পরিবহন দপ্তর, পুলিশ বক্স ও শিক্ষক ক্লাব ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। এতে ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কে এম নূর আহমদ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করে। দুটি মামলাতেই ৭ জন করে ১৪ জনকে চিহ্নিত করে আসামি করেছিল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আরও এক হাজার অজ্ঞাতপরিচয়ের শিক্ষার্থীদের আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে ১২ জনই শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষের নেতা-কর্মী। তাঁরা হলেন ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির পদধারী শফিকুল ইসলাম, ছাত্রলীগ কর্মী রিয়াদ হোসেন, সৌরভ ভূঁইয়া, আনিছুর রহমান, নাসির উদ্দীন মো. সিফাত উল্লাহ, অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, মো. আজিমুজ্জামান, অনিক দাশ, ইমরান নাজির, শাকিল হোসেন, দীপন বণিক ও নূর মোহাম্মদ। তবে এ দুটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের আসামি উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিন পান। ওই শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে অপহরণের পর পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে হাটহাজারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল আলম বলেন, তদন্ত চলছে।একই অবস্থা আরেক মামলায়। গত বছরের ২৯ আগস্ট চাঁদা না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীকে মারধর ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছিল ছাত্রলীগ নেতা রাজু মুন্সির বিরুদ্ধে। তিনি বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ ঘটনায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিবাদের মুখে রাজুকে আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ২৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকসহ চার শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাতেও প্রশাসন বাদী হয়ে মামলা করেছিল। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এটি তদন্ত করছেন হাটহাজারী থানার উপপরিদর্শক সুমন দেবনাথ। তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, মামলার বাদীকে আসতে বলা হয়েছিল। তবে তিনি আসেননি। পরে মামলার বাদী শেখ মো. আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, ঘটনার তথ্য–উপাত্ত তিনি পুলিশকে দিয়েছেন। এদিকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি চাঁদা না পেয়ে হলের কক্ষে আটকে রেখে এক ঠিকাদারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল ছাত্রলীগের চার নেতার বিরুদ্ধে। এতে মামলা করেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার মো. তামজিদ উদ্দীন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি এম মেহেদী হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক শাফায়েত হোসেন, উপকর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক মাশরুর কামাল এবং সহসম্পাদক মো. হৃদয়।ঠিকাদারের করা এ মামলার তদন্ত করছেন হাটহাজারী থানার পরিদর্শক (অভিযান) মোল্লা জাহাঙ্গীর কবীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন তথ্য চেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়েছেন। এখনো পাননি। যে চার ঘটনায় মামলা হয়েছে, এর মধ্যে তিনটি ঘটনায় আলাদা দুটি তদন্ত কমিটিও করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একটি শাটল ট্রেনের দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে চার স্থানে ভাঙচুরের ঘটনায়, আরেকটি ২৪ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকসহ চারজনকে মারধরের ঘটনায়। এ দুটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। প্রশাসনের গাফিলতির কারণে ক্যাম্পাসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলে মনে করেন শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য প্রশাসন দায়সারা একটি মামলা করে। পুলিশও সেটি বোঝে। পুলিশের উচিত যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা।
Published on: 2024-03-03 21:47:05.424497 +0100 CET