প্রথম আলো
ছাত্রলীগের প্রবেশের প্রতিবাদ অনড় বুয়েটের শিক্ষার্থীরা, বিক্ষোভ

ছাত্রলীগের প্রবেশের প্রতিবাদ অনড় বুয়েটের শিক্ষার্থীরা, বিক্ষোভ

বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রবেশের প্রতিবাদে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা পরীক্ষা বর্জন করে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিক্ষোভের পর পাঁচ দফা দাবিতে আজ রোববার আবার বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে ‘সহমত’ জানিয়েছেন বুয়েটের উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার। তিনি দাবি পূরণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য সময় প্রয়োজন বলে জানান। তবে বিক্ষোভকারীরা বুধবার মধ্যরাতের পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সমাগমের মূল সংগঠক হিসেবে এক শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে তাঁকে শনিবার বেলা দুইটার মধ্যে স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য সময় বেঁধে দেন। তাঁরা আজ রোববারও পরীক্ষা (টার্ম ফাইনাল) ও একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে গতকাল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শেষ করার আড়াই ঘণ্টা পর বেলা তিনটায় বুয়েটের শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ ছাত্র। তাঁরা নিজেদের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছেলে’ উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ স্বার্থ হাসিল করছে। হিযবুত তাহ্রীর, ইসলামী ছাত্র শিবিরের মতো সংগঠনগুলো এখানে কাজ করছে।> > শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে আমরাও সহমত। কিন্তু নিয়মের মধ্যে সবকিছু করতে > সময়ের প্রয়োজন। সত্য প্রসাদ মজুমদার উপাচার্য, বুয়েটগত দুদিন ধরে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যার পর বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। এরপরও গত বুধবার মধ্যরাতের পর ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চালান। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা গত শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্ষোভ করে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও রাজনৈতিক সমাগমের মূল সংগঠক পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র ইমতিয়াজ হোসেন। ইমতিয়াজ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। বিক্ষোভকারীরা ইমতিয়াজকে বুয়েট থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ও হলের সিট বাতিলসহ তাঁর সহযোগীদেরও বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে সময় বেঁধে দেয়। এ ছাড়া ‘বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিরা’ কেন কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার অনুমতি পেলেন, সে ব্যাপারে বুয়েট প্রশাসনের সুস্পষ্ট জবাব, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের (ডিএসডব্লিউ) পদত্যাগ এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতিসহ মোট পাঁচ দফা জানান। এসব দাবিতে শনিবার ও রোববারের (৩০ ও ৩১ মার্চ) পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন ও বিক্ষোভের ডাক দেয় তাঁরা। এরপর শুক্রবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে বুয়েট কর্তৃপক্ষ পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র ইমতিয়াজ হোসেনের হলের সিট বাতিলের কথা জানায়। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠন ও কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম চালু থাকবে বলে জানানো হয়।আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবিতে অটল থেকে গতকাল শনিবার সকাল সাতটায় বুয়েটের শহীদ মিনারে জড়ো হন। তাঁরা গতকালের পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভ শুরু করেন। বেলা ১১টায় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে পাঁচ দফা দাবি কিছুটা সংযোজন করে আবারও তুলে ধরা হয়। তাতে পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র ইমতিয়াজ হোসেনকে বেলা দুইটার মধ্যে (শনিবার) বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে জড়িত হিসেবে আরও পাঁচ ছাত্রের নাম উল্লেখ করে তাদেরও বহিষ্কারের দাবি করা হয়। এ ছাড়া জড়িত অন্যদের অবিলম্বে শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া; ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের লিখিত নোটিশ ও বাস্তবায়ন; দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের পদত্যাগ এবং আন্দোলনরত বুয়েট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দাবি করা হয়। শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলনের পর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বুয়েটের ড. এম এ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন সেখানে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিক্ষোভে পর আন্দোলনকারীদের একজন প্রতিনিধি বলেন, সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিক্ষোভ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে দাবির বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আন্দোলনরত বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সে জন্য এ দিনের কর্মসূচি সমাপ্ত করে রোববার সকালে আবার বুয়েটের শহীদ মিনারে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর গতকাল বেলা সোয়া একটার দিকে বুয়েটের উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে আমরাও সহমত কিন্তু নিয়মের মধ্যে সবকিছু করতে সময়ের প্রয়োজন’ উপাচার্য বলেন, ‘আজকে থেকে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে ৷ ৬ সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটিকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে ৷ প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর সদস্যদের মতামতও আমরা শুনব।’ তিনি জানান, ডিএসডব্লিউর পদত্যাগের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো চিন্তা করছে না৷ কারণ ডিএসডব্লিউর বলেছেন, তাঁর পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বর্জনের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা স্থগিত করিনি, তারা (শিক্ষার্থী) বর্জন করেছে ৷ তারা এখানে ভুল করেছে৷ ’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, গভীর রাতে কেউ (ক্যাম্পাসে) ঢুকলে এটা অবশ্যই অনিয়মতান্ত্রিক ৷ কে ঢুকেছে, তাঁকে আগে চিহ্নিত করতে হবে৷ তার জন্য সময় প্রয়োজন৷ যদি কোনো নিরাপত্তারক্ষী বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢুকতে দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছেলে’ দাবি করে গতকাল বিকেল তিনটার দিকে বুয়েটের শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করেন পাঁচ ছাত্র। তাঁরা শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে একটি ‘অন্ধকার সংগঠনের’ ইন্ধন দেখছেন বলে জানান। তাঁরা বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবির ও নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মতো সংগঠন বুয়েটে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান তানভীর মাহমুদ স্বপ্নীল নামের এক বুয়েট ছাত্র ৷ তিনি দাবি করেন, তাঁরা কোনো ছাত্রসংগঠনের পদধারী নন৷ সংবাদ সম্মেলনে ক্যাম্পাসে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমের’ বিষয়ে বলতে গিয়ে আরেক ছাত্র আশিক আলম বলেন, ‘বুয়েটে আবরার ফাহাদ ভাইয়ের সঙ্গে খুব খারাপ একটি ঘটনা ঘটেছে৷ আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই ৷ কিন্তু হিযবুত তাহরীর ও ছাত্র শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আবেগকে পুঁজি করে প্রকাশ্যেই নিজেদের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে৷ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হয়ে যিনিই কথা বলবেন, তাঁকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে বারবার অত্যাচার করা হচ্ছে৷ ’আজ রোববার বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ করবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। ‘মৌলবাদী গোষ্ঠীর কালোছায়া থেকে মুক্ত করে বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতির’ দাবিতে এবং বুয়েট কর্তৃক গৃহীত অসাংবিধানিক, মৌলিক অধিকার পরিপন্থী, শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই সমাবেশ ডাকা হয়েছে।
Published on: 2024-03-30 21:04:11.753687 +0100 CET