প্রথম আলো
কল্যাণী মিনজি শিশুদের স্বপ্ন দেখান, মানুষ গড়েন

কল্যাণী মিনজি শিশুদের স্বপ্ন দেখান, মানুষ গড়েন

বাড়িতে মাঝেমধ্যেই ভাতের চাল থাকত না। ছোটবেলায় একবার দোকানে গেলেন চাল আনতে। দোকানদার বললেন, ‘বাকিতে চাল দেওয়া যাবে না।’ খালি হাতে ফিরতে হলো তাঁকে। একইভাবে পরনের পোশাক ও লেখাপড়ার উপকরণেও কষ্ট করতে হয়েছে। নানা বাধা পেরিয়ে ওঁরাও সম্প্রদায়ের কল্যাণী মিনজি এখন সফল। এখন তিনি বই লেখেন, মানুষ গড়েন ও স্বপ্ন দেখান শিশুদের। কল্যাণী মিনজি ছয় বোন ও এক ভাই মিলে অনেক কষ্টে বড় হয়েছেন। ছয় বোনের মধ্যে কল্যাণীসহ পাঁচজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ভাই কলেজে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বর্তমানে কল্যাণী মিনজি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। এ বছর বিভাগীয় পর্যায়ে কল্যাণী মিনজি শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। আজ শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি জাতীয় পর্যায়ের এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। কল্যাণী মিনজি ১৯৬৯ সালে ২৭ অক্টোবর জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই গ্রামে ওঁরাও সম্প্রদায়ে জন্ম নেন। তাঁর বাবা কমলা মিনজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মা বাসন্তি রানী গৃহিণী। পরিবারে আর্থিক অনটন ও সামাজিক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন কল্যাণী।কল্যাণী মিনজি বলেন, তাঁদের টানাটানির সংসার ছিল। বাবা স্কুল থেকে ফিরেই মাঠে নিয়ে যেতেন। নিজেরা জমি বর্গা নিতেন। সেই জমিতে কোনো শ্রমিক নিতেন না। নিজেরাই কাজ করতেন। স্কুলে যাওয়ার আগেও কাজ করতে হতো। খাওয়াদাওয়ার অভাব–অনটনের পাশাপাশি লেখাপড়ার উপকরণ কিনতেও কষ্ট হতো। বাবা বিদ্যালয় থেকে পুরোনো পরীক্ষার খাতা এনে দিতেন। খাতার পেছনে একটি দুটি পৃষ্ঠা পাওয়া যেত লেখার জন্য। তা দিয়েই বাড়িতে লিখতেন। তবে বিদ্যালয়ে গিয়ে সব পড়া পারতেন। কল্যাণী বলেন, ‘শিক্ষকেরা আমাদের উদাহরণ দিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের শাসন করতেন। আর বলতেন, ওরা এত কষ্ট করে পারে, তোমরা পারো না কেন।’ বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কল্যাণী মিনজি দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়িতে এনে আলাদা করে পড়ান। সাঁতার ও সাইকেল চালানো শেখান। ছোট শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন ফুটবল। তাঁর বিদ্যালয় বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে উপজেলা পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ৯ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০১২ ও ২০১৭ সালে দুবার উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে তাঁর বিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় নির্বাচিত হয়। ওঁরাও সম্প্রদায়ের জন্য সাদরি ভাষায় শিশু, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য পাঠ্যবই লিখছেন। তাঁর বিদ্যালয়ে বাল্যবিবাহ নেই, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী নেই। শুধু তা–ই নয়, ওঁরাও সম্প্রদায়ের জন্য সহজ ভাষায় শিশু, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির জন্য বই লিখেছেন। জয়িতার বাইরেও ২০১৮ সালে বেগম রোকেয়া দিবসে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কৃতী নারী সম্মাননা পদক লাভ করেন।> > কল্যাণী মিনজি ১৯৬৯ সালে ২৭ অক্টোবর জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই > গ্রামে ওঁরাও সম্প্রদায়ে জন্ম নেন। তাঁর বাবা কমলা মিনজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের > শিক্ষক ছিলেন। মা বাসন্তি রানী গৃহিণী।গত ৩ ফেব্রুয়ারি শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় কল্যাণী মিনজি বলেন, ‘আমার গ্রাম থেকে আমি প্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ডিগ্রি অর্জন করেছি। ধান কাটা থেকে শুরু করে যা কিছু আছে সব করেছি। আজকের দিনটি আমার শ্রেষ্ঠ দিন। বিদ্যালয়ের দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলাদা করে পড়াই। তাদের সাঁতার, সাইকেল চালানো শেখাই। আমি ভালোবেসে কাজগুলো করি।’*স্বপ্ন দেখাতে ভালো লাগে কল্যাণীর*চিত্তরঞ্জন সরদার ও কল্যাণী মিনজি দম্পতির কোনো সন্তান নেই। এতে কল্যাণীর কোনো আক্ষেপ নেই, নেই কষ্টও। কল্যাণী বলেন, ‘সন্তান হয়নি এতে কোনো খারাপ লাগে না। আমার স্বামীরও কষ্ট হয় না। বিদ্যালয়ের সব বাচ্চা আমার বাচ্চা।’ শিক্ষকতা পেশাতে আসার পর তিনি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাতে শেখানো শুরু করেন। নারী ও পুরুষ ভেদাভেদ ভুলিয়ে সবাইকে দক্ষ করে তুলছেন। পুকুরে নেমে পড়েন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। নিজে সাঁতার কেটে কেটে শেখান। শিক্ষার্থীরা যাতে দূর থেকে আসতে কষ্ট না হয়, এ কারণে সাইকেল চালানো শিখিয়েছেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে থেকে সাইকেল নিয়ে দিয়েছেন। শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বিষয়ে তৎপর। শিক্ষার্থীরা স্কাউটস থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে ভালো করছে। তার শিক্ষার্থী রণবীর লাকড়া গান শিখে তাইওয়ান ও মালয়েশিয়া গিয়েছিল ২০১২ সালে। কল্যাণী বলেন, বাড়িতে নিজের সন্তান নেই বলেই হয়তো এত সময় দিতে পারেন। ঘুমানোর সময় বাদ দিয়ে বাকিটা সময় শুধু তাদেরই সময় দেন। বাচ্চাদের কাপড়চোপড়ও বাড়িতে এনে ধুয়ে দেন।> > আমি বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছি। ওরা দক্ষ হচ্ছে। কোনো দাপ্তরিক কাজে > বাইরে গেলে শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করে থাকে। পরে এসে তাদের গল্প বলতে হয়। কল্যাণী মিনজি, প্রধান শিক্ষক, গোদাগাড়ী উপজেলার সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়এসব কাজে বহু বাধা দেওয়া হয়েছে কল্যাণীকে। তিনি বলেন, ‘অনেক বাধা আসে। এখানে সংস্কৃতিমনা পরিবেশ নেই। নানা রকম গোঁড়ামি আছে। ফুটবল খেলানোর সময় আশপাশের মানুষজন বলত, ম্যাডাম তো মেয়ে মানুষ না, ছেলে মানুষ। এ জন্য জার্সি পরায়, খেলায়। কিন্তু আমি এগুলো কানেই নিতাম না। যে যাই বলে বলুক। এগুলো নিয়ে ভাববার আমার সময় নেই এটা মনে করতাম। বাচ্চাদের অভিভাবকেরা এখন আর এমন করেন না।’ কল্যাণী মিনজি বলেন, ‘আমি বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছি। ওরা দক্ষ হচ্ছে। কোনো দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করে থাকে। পরে এসে তাদের গল্প বলতে হয়।’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহ হলে খুব কষ্ট পাই। কেন অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো সেভাবে পড়ানো হয় না। আমার এখনো মাটির ঘর, বিল্ডিং নাই। এগুলো নিয়ে লোভও হয় না। টাকাটুকা দিয়ে কী হবে? নিজে ভালো কর্ম করতে পারলে, পরে মানুষ বলবে। শুধু বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে চাই। তাদের শেখাতে চাই। স্বপ্ন দেখাতে চাই।’গোদাগাড়ী উপজেলার সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা তাসলিমা নাসরিন বলেন, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তাঁকে একটি ফরম দিয়ে বলেছিলেন, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য আছে—এমন নারী আছে কি না। তখন তিনি কোনো চিন্তা না করেই কল্যাণী মিনজিকে দিয়ে ফরম পূরণ করান। তিনি তাঁর পেশাগত জায়গায় খুব আন্তরিক। উনার বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে কয়েকবার জাতীয় পর্যায়ে গেছে। তাঁর অবদান অনেক বেশি।
Published on: 2024-03-08 10:18:16.401514 +0100 CET