প্রথম আলো
উপজেলা নির্বাচনে দলের অবস্থান নিয়ে 
এখনো অস্পষ্টতায় বিএনপির তৃণমূল

উপজেলা নির্বাচনে দলের অবস্থান নিয়ে এখনো অস্পষ্টতায় বিএনপির তৃণমূল

উপজেলা পরিষদের প্রথম ধাপের নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হতে বাকি রয়েছে মাত্র দুই দিন। কিন্তু স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া না–নেওয়ার প্রশ্নে দলের অবস্থান সম্পর্কে এখনো অস্পষ্টতায় রয়েছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতারা। কারণ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। ঈদের আগেই দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা বলা হলেও সেই বৈঠক হয়নি।উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী বিএনপির তৃণমূলের নেতাদের অনেকে বলেছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট করলে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ভয় তাঁদের মধ্যে রয়েছে। সে জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকবেন তাঁরা। গত দুই সপ্তাহে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুটি বৈঠক স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে। দলের স্থায়ী কমিটির ওই দুটি বৈঠক না করার পেছনে কৌশল থাকতে পারে বলে বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, দলের তৃণমূলের নেতাদের অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। তাঁদের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখানো হতে পারে—এমন আলোচনাও রয়েছে দলটির ভেতরে। এমন পটভূমিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এখনই দলগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ার বিষয় থাকতে পারে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হলে বিষয়টিতে আলোচনা হতে পারে।’ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শুরু হচ্ছে আগামী ৮ মে। প্রথম ধাপে ১৫২টি উপজেলা পরিষদের এই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৫ এপ্রিল। এবার মনোনয়নপত্র জমা অনলাইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৪৮১টি উপজেলায় চার ধাপে নির্বাচন হবে।২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পরেও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোয় প্রথম দিকে অংশ নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি বিএনপির পুরোনো অবস্থান। সরকারবিরোধী আন্দোলনে থেকে গত ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। সেই আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে পুরোনো অবস্থানই আরও জোরালো হয়েছে। উপজেলাসহ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অন্য কোনো নির্বাচনেও দলীয়ভাবে অংশ না নেওয়ার অবস্থানের কথা বলে আসছেন বিএনপির নেতারা।কিন্তু এবারের উপজেলা পরিষদের নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতিটা ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক না দিয়ে বা দলীয়ভাবে এই নির্বাচন না করার কৌশল নিয়েছে। ফলে ‘নৌকা’ প্রতীকে কোনো প্রার্থী থাকছে না। ক্ষমতাসীনদের এই কৌশল বিএনপির তৃণমূলে প্রভাব ফেলছে। দলটির তৃণমূলের নেতাদের অনেকে উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী হয়েছেন। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত না পেয়ে ভোটে অংশ নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার ভয় কাজ করছে তাঁদের মধ্যে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর সদর উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চান ওই উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ইজাদুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবেন। দল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না পেলে এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে ভোট করা না করার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবেন।> > ‘উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে স্থায়ী > কমিটির বৈঠক হলে বিষয়টিতে আলোচনা হতে পারে।’ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপিরংপুরের পীরগাছা উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফসার আলীও ভোট করা না করার প্রশ্নে দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, দিনাজপুরসহ আরও ছয়টি জেলায় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে একই রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। তৃণমূলের এই নেতারা মনে করেন, যেহেতু আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক থাকছে না এবং সব জায়গায় দলটির একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। ফলে ক্ষমতাসীনদের ‘একতরফা’ প্রভাব থাকবে না। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিএনপির তৃণমূলের ওই নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান।বিএনপির তৃণমূলের নেতাদের অনেক মনে করছেন, উপজেলা নির্বাচনে তাদের দল পুরোনো অবস্থানের কারণে দলীয়ভাবে অংশ নেবে না। সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল হিসেবে বিএনপি নেতাদের স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনে বিএনপির বহিষ্কৃত দুজন নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁরা দল থেকে অনেক আগে বহিষ্কৃত হলেও তাঁদের দুজনের পক্ষে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা ভাগ হয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই ঘটনাকেও বিএনপির তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।বিএনপির নেতারা মনে করেন, তাঁদের আন্দোলনের কারণে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে। আর সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক দিচ্ছে না উপজেলা নির্বাচনে। আন্দোলনে ব্যর্থতার অভিযোগের মধ্যেও উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক না দেওয়ার বিষয়কে বিএনপির ওই নেতারা তাঁদের জয় হিসেবে দেখছেন। আওয়ামী লীগ অবশ্য দলীয় প্রতীক না দেওয়ার পেছনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়কেও অন্যতম কারণ হিসেবে বলেছে। যেহেতু ‘নৌকা’ প্রতীক নেই উপজেলা নির্বাচনে, ফলে দলের নেতাদের স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পক্ষেও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কারও কারও মত রয়েছে।বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপির তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতাদের ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে—এ প্রশ্নেও আলোচনা রয়েছে দলে। মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় উপজেলা নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দোটানায় রয়েছেন বিএনপির নেতৃত্ব। সে জন্য দলটি সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেওয়ার বিষয়কেও কৌশল হিসেবে উল্লেখ করছেন বিএনপির ওই নেতা। তিনি বলেন, প্রথম ধাপের ১৫২টি উপজেলার মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা চলে এসেছে। তাই তাঁরা দেখতে চাইছেন তৃণমূলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ কতটা। তবে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা যদি ব্যাপক হয়, তা দলের নেতৃত্বের ওপরে চাপ বাড়াবে।
Published on: 2024-04-13 14:48:35.696362 +0200 CEST