প্রথম আলো
উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ

উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও লড়াই হতে যাচ্ছে মূলত আওয়ামী লীগের নেতাদের নিজেদের মধ্যে। প্রথম ধাপে ১৫০টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলটির গড়ে তিনজন করে প্রার্থী হচ্ছেন। গতকাল সোমবার ছিল প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন। ১৫০টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মোট ৬৯৬ জন। ১৪১টি উপজেলায় দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তত ৪৬৬ জন নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতা আছেন কমবেশি ৪৫ জন। তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী। আর জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ২২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় সারা দেশে স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এখনো আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান আছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনেও নেই। তাদের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করতে আওয়ামী লীগ এবার উপজেলায় দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দিচ্ছে না। দলটির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন।> > সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুরুতে এই নির্বাচনে কিছু জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী > দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। > দলটির যেসব নেতা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, তাঁদের তা প্রত্যাহার করার নির্দেশ > দেওয়া হয়েছে।ক্ষমতাসীনেরা এই ‘স্বতন্ত্র কৌশল’ নেওয়ার সময় আশা করেছিল, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে না থাকলে বিএনপির নেতাদের অনেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন। কিন্তু প্রথম ধাপে সেটা খুব একটা হয়নি। প্রথম ধাপের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হয়ে গেলেও গতকাল পর্যন্ত বিএনপি এই নির্বাচনের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। গত রাতে এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুরুতে এই নির্বাচনে কিছু জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির যেসব নেতা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, তাঁদের তা প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএনপিও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে এবারের উপজেলা নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, সেটা নিয়ে সংশয় আছে।> > এবার প্রথমবারের মতো অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে > মনোনয়নপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটলেও বাধা দেওয়া > পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি।আগামী ৮ মে প্রথম ধাপের ১৫০টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ হবে। গতকাল বিকেল চারটায় এসব উপজেলায় মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হয়।নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ১৫০টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মোট ১ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৬৯৬ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭২৪ জন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৭১ জন। এবার প্রথমবারের মতো অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে মনোনয়নপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটলেও বাধা দেওয়া পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে নাটোরের সিংড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক দেলোয়ার হোসেন, তাঁর ভাইসহ তিনজনকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লুৎফুল হাবীবকে দায়ী করা হচ্ছে। তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদের শ্যালক।> > বাছাইয়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ হলে এই দুই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোটের > প্রয়োজন হবে না।এবার মোট চার ধাপে ৪৮০টি উপজেলা পরিষদে ভোট হওয়ার কথা। এর মধ্যে প্রথম ধাপের ১৫২টি উপজেলার তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে দুটি উপজেলার (নারায়ণগঞ্জ সদর ও কুমারখালী) ভোট স্থগিত করা হয়। প্রথম ধাপের মনোনয়ন ফরম যাচাই-বাছাই হবে ১৭ এপ্রিল। মনোনয়ন ফরম প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২২ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ ২৩ এপ্রিল, আর ভোট গ্রহণ ৮ মে। দ্বিতীয় ধাপে ১৬৬টি উপজেলায় নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২১ মে ওই সব উপজেলায় ভোট হবে। আর তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। আগামীকাল বুধবার তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।> > দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, এরপর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন > নিয়ে মানুষের খুব বেশি আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এই নির্বাচনও সর্বশেষ জাতীয় > নির্বাচনের আদলে আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যেই হবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু > নেই। তবে এই নির্বাচন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতও > হতে পারে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনপ্রথম ধাপে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় কোথাও কোথাও ভোটের প্রয়োজন হবে না। বাগেরহাট সদর ও মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে একজন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। বাছাইয়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ হলে এই দুই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোটের প্রয়োজন হবে না। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আনিছ উজ্জামান। তিনি মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফয়সালের আপন চাচা।> > এই আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির সমঝোতা হয়েছিল। নৌকা নিয়ে > নির্বাচন করে একটি করে আসন পেয়েছিল জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি। আরেকটি আসন > পেয়েছিল কল্যাণ পার্টি।বাগেরহাট সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি সরদার নাসির উদ্দিন একক প্রার্থী। ইসি সূত্র জানায়, ভাইস চেয়ারম্যান পদে একটি করে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে কক্সবাজার সদর, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়। আর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একটি করে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে কুষ্টিয়া সদর, চাঁদপুরের মতলব, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী, নোয়াখালীর হাতিয়া, বাগেরহাট সদর ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায়।এ ছাড়া ১৫টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দুজন করে। এসব উপজেলায় মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে কোনো একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে বা শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থিতা তুলে নিলে সেখানে আর ওই পদে ভোটের প্রয়োজন হবে না। অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদে সর্বোচ্চ ১১ জন করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায়। ভাইস চেয়ারম্যান পদে সর্বোচ্চ ১৪ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায়। আর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সর্বোচ্চ ৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায়। গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় ওই নির্বাচনে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে উৎসাহ দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মোট ২৮টি দল। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে ২২৪ জন জয় পান। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য জয় পান ৬২ জন, তাঁদের মধ্যে ৬০ জনই আওয়ামী লীগের নেতা। এর বাইরে জাতীয় পার্টি থেকে জয় পেয়েছিলেন ১১ জন। এই আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির সমঝোতা হয়েছিল। নৌকা নিয়ে নির্বাচন করে একটি করে আসন পেয়েছিল জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি। আরেকটি আসন পেয়েছিল কল্যাণ পার্টি।সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, এরপর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে মানুষের খুব বেশি আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এই নির্বাচনও সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আদলে আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যেই হবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে এই নির্বাচন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতও হতে পারে।
Published on: 2024-04-16 04:53:01.726579 +0200 CEST