The Business Standard বাংলা
সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল সাত রুটে, এখন মাত্র ৩টি চালু আছে

সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল সাত রুটে, এখন মাত্র ৩টি চালু আছে

চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানের প্রধান প্রধান বন্দরগুলোয় সরাসরি জাহাজ চলাচলের রুট শুরুতেই বন্ধের মুখে। জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ), রপ্তানির বুকিং ও আমদানি কার্যাদেশ হ্রাস পাওয়ায় শিপিং লাইনগুলো এসব রুটে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। ২০২২ সালে এই সম্ভাবনা দেখা দেয়, যখন অন্তত সাতটি আন্তর্জাতিক রুট চালু হয়। এতে নতুন আশার আলো দেখেন দেশের রপ্তানিকারকরা। এসব রুটের মাধ্যমে জাহাজে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু, মাত্র এক বছরের মধ্যেই চারটি রুটে শিপিং লাইনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হতাশ হতে হয়েছে রপ্তানিকারকদের। বাকি তিনটিও বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। জাহাজ পরিচলনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন রুটে জাহাজে মালবহনের ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) কমে গেছে ৮০ শতাংশ। তার ওপর, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি পণ্যের বুকিং কমে গেছে ৬০ শতাংশের বেশি। এছাড়া, চীন থেকে আসা আমদানি পণ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায়, তারা ক্রমাগত লোকসান গুনছেন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এরমধ্যেই বন্ধ হওয়া রুটগুলো হলো– নেদারল্যান্ডস, স্পেন, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য। অনিশ্চিয়তার মধ্যে রয়েছে ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেন রুটে জাহাজ চলাচল। এসব রুট চালুর আগে ইউরোপের গন্তব্যগুলোতে কনটেইনারে পণ্য পাঠাতে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার তানজুম পালাপাস, ইন্দোনেশিয়ার কেলাস ও চীনের কিছু ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হয়ে যেত। সেখান থেকে ইউরোপের রটারড্যাম, অ্যান্টওয়ার্প ও হামবুর্গের মতো মূল বন্দর (বেজ পোর্ট) হয়ে পণ্য পৌঁছাত গন্তব্যে। এতে সময় লাগত প্রায় ৪০ দিন। সরাসরি রুটে পণ্য পরিবহন শুরু হওয়ায় এই সময় কমে এসেছিল ২০ থেকে ২২ দিনে। এগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবারো ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হয়ে পাঠাতে হচ্ছে গন্তব্যে। নেদার‌ল্যান্ডস-স্পেন ও ইতালি সরাসরি রুটগুলোয় জাহাজ পরিচালনা করতো দেশের রিলায়েন্স শিপিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাশেদ টিবিএসকে জানান,  চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ইতালি রুটে জাহাজ পরিচালনা অলাভজনক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ২০২২ সালে যখন সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়– তখন প্রতিটি কনটেনার ভাড়া ছিল ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার ডলার। বর্তমানে সেই ভাড়া নেমে এসেছে দুই হাজার ডলারে। প্রতিটি জাহাজে পণ্য বোঝাই হতো প্রায় ১,২০০ টিইইউ। এখন সেটি নেমে এসেছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টিইইউ'তে। তিনি আরো বলেন, এভাবে লোকসান দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম-ইতালি রুটে জাহাজ চালাচল চালু রাখা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক টিবিএসকে বলেন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর সরাসরি জাহাজ চালুর বিষয়ে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু, সরাসরি সার্ভিস চালুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিপিং কোম্পানি এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের বিষয়। যেকোন প্রতিষ্ঠান চাইলে সরাসরি রুটে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সহায়তা করে। তবে বন্ধ কিংবা চালুর ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় উপকারভোগী হয় দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। এতে সময় কম লাগা ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বায়ারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটির। সরাসরি জাহাজ চলাচলে কমে যাওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ উল্লেখ করেন– তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন– বিজিএমইএ-র সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রেইট চার্জ কমে যাওয়ায় শিপিং লাইনের মালিকরা আগ্রহ হারিয়েছেন। এছাড়া, সরকারের কড়াকড়ির কারণে আমদানি কমেছে। রপ্তানিতে কয়েকটি খাতে ভলিউম (পরিমাণ) অনেক কমেছে। তাছাড়া, রপ্তানি চাহিদা ও জাহাজ ভাড়া ব্যাপকভাবে কমায় সরাসরি রুটগুলোর জাহাজে পণ্য বহনের বুকিং কমেছে। বেশি সময় লাগলেও, রপ্তানিকারকরা এখন ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর দিয়ে চালান পাঠাচ্ছেন। তবে এসব রুট বন্ধ হওয়াকে দেশের পোশাক শিল্পের জন্য 'খারাপ খবর' বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্ববাজারে আমদানি-রপ্তানির চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি শিপিং বন্ধ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার। তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংকটের সময় এ উদ্যোগটি শুরু করা হয়। ফলে পর্যাপ্ত বুকিং পায়নি শিপিং লাইনগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ভালো হলে এ রুটগুলো চালু থাকবে। লিড টাইম কমে গেলে বায়াররা আমাদের কাছ থেকে পণ্য নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। *দ্রুত পতন* ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইতালিতে এবং একই বছরের জুনে নেদারল্যান্ড ও স্পেনে সরাসরি পণ্য পরিবহন চালু হয়। এ দুটি রুট পরিচালনা করত স্থানীয় শিপিং কোম্পানি রিলায়েন্স শিপিং। ২০২৩ সালের আগস্টে নেদারল্যান্ড-স্পেন রুট বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে চট্টগ্রাম–ইতালি রুটের জাহাজ চলাচলও বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। রিলায়েন্স শিপিং-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাশেদ জানান, চট্টগ্রাম–ইতালি এবং চট্টগ্রাম–নেদারল্যান্ডস-স্পেন রুটে প্রতি ২০ দিন অন্তর জাহাজ চলাচল করত। ২০২২ সালের মে মাসে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি চট্টগ্রাম–চীন রুটে একটি নতুন কন্টেইনার শিপিং পরিষেবা চালু করে। চারটি জাহাজ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হয়ে চীন থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহন করত। এতে আমদানির সময় প্রায় ১২ দিন কমেছিল। তবে কোম্পানিটি গত তিন মাস ধরে চীন থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহন স্থগিত রেখেছে। জাহাজগুলো এখন চট্টগ্রাম থেকে কেবল ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে যাতায়াত করছে। মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, এলসি (লেটার অভ ক্রেডিট) খোলার জটিলতায় আমদানি কমে যায়। ফলে চীন থেকে আমদানি পণ্যের বুকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে পণ্য পরিবহন স্থগিত হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের জুনে ফিনিক্স শিপিং চট্টগ্রাম–রটারডাম-লিভারপুল রুটে একটি নতুন কন্টেইনার শিপিং পরিষেবা চালু করে। তবে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পণ্য রপ্তানি হ্রাসের কারণে চার মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় পরিষেবাটি। ফিনিক্স শিপিং-এর সিইও ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত বলেন, সেবা শুরুর পর প্রথমদিকে প্রতিমাসে দুটি জাহাজ চলাচল করত। বুকিং কমে যাওয়ায় ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ইউরোপীয় রুটটিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালের মে মাসে ফরাসি শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম চট্টগ্রাম থেকে দুবাইয়ের জেবেল আলী-খলিফা বন্দর রুটে একটি নতুন কন্টেইনার শিপিং পরিষেবা চালু করে। তবে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় পরিষেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। এ রুটে চলাচলকারী প্রথম জাহাজ এমভি সান পেড্রো চট্টগ্রাম থেকে ১৫ দিনের মধ্যে জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছাতে পারত। এতে আমদানির সময় কমে ১০ দিনে নেমে এসেছিল। এখন জেবল আলী বন্দর থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর যেমন সিঙ্গাপুর, কলম্বো, পোর্ট কেলাং ইত্যাদি হয়ে চট্টগ্রামে পণ্য পাঠাতে ৩০–৩৫ দিন সময় লাগবে। *এখনও চালুর অপেক্ষায় যেসব রুট* ২০২২ সালের ২১ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি জাহাজ চালুর বিষয়ে আলোচনা করতে স্লোভেনিয়ার কোপার বন্দরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। তবে প্রায় দেড় বছর পার হলেও এ রুটে জাহাজ চলাচল শুরু হয়নি। গত বছরের নভেম্বরে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড চট্টগ্রাম–দুবাই রুটে তিনটি জাহাজ চালুর ঘোষণা দেয়। ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুবাইতে নিবন্ধিত সাইফ মেরিটাইম এলএলসি এ পরিষেবা চালু করার জন্য এডি পোর্ট গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাফিন ফিডার-এর সাথে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করে। তবে গত এক বছরে এ রুটে কোনো জাহাজ চালু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। *চট্টগ্রাম বন্দরে কমেছে কনটেইনার হ্যান্ডলিং* চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের প্রথম নয় মাসের তুলনায় ২০২৩ সালের একই সময়ে রপ্তানি ও আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং যথাক্রমে এক লাখ ৪০ হাজার ৪১৪ টিইইউ এবং ৯৬ হাজার ৩০৪ টিইইউ কমে গিয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে আমদানি পণ্যের নয় লাখ ১৭ হাজার ৯১৬ টিইইউ এবং রপ্তানি পণ্যের পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০২২ সালের নয় মাসে এ সংখ্যা ছিল রপ্তানি পণ্যের জন্য এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৩০ টিইইউ এবং আমদানি পণ্যের জন্য ছয় লাখ ৩৪ হাজার ৮৪৫ টিইইউ।
Published on: 2023-10-11 20:11:30.649475 +0200 CEST