The Business Standard বাংলা
হতাশার ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক

হতাশার ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক

ঢাকা থেকে ১২২ কিলোমিটার দূরে নবীনগরের গ্রামাঞ্চল। ধানখেত ও ছোট ছোট বসতবাড়ি পেরিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে বিটুমিন বিছানো পাকা সড়ক। এই সড়ক নবীনগরকে জেলা শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। নীল-সবুজ স্কুল ড্রেস পরে রঙিন ব্যাগ নিয়ে ছোট ছোট মেয়েরা ব্যাটারিচালিত রিকশায় চেপে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের হাসি আর কথায় মুখরিত চারপাশ। এই পাকা রাস্তাটির কারণে তাদের স্কুলে যাতায়াত সহজ হয়েছে। একটু পরপরই তাদের রিকশাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ছোট ছোট ট্র্যাক। এসব ট্রাক বাজারে কৃষিপণ্য অথবা বিভিন্ন গ্রামে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যায়। কিন্তু এই মেয়েদের বা ট্রাকচালকদের জন্য যাতায়াত যতটা সহজ হওয়া উচিত ছিল, ততটা সহজ নয়। কারণ রাস্তাগুলো মেরামত করা হয় না। জায়গায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, সঙ্গে বিটুমিন উঠে গেছে। গত তিন বছরে ১২,১৭০ কিলোমিটার নতুন পাকা সড়ক যোগ হওয়ার পাশাপাশি পুরাতন সড়ক সংস্কার করা হয়েছে মাত্র ২৪,৬০০ কিলোমিটার। সেই হিসাবে তিন বছরে রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে আছে ১.২০ লাখ কিলোমিটার সড়ক। এক কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে চলতি অর্থবছরে গড়ে ৮৫,৭৯০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর উপজেলা স্থানীয় সরকার অফিসের তালিকাভুক্ত অগ্রাধিকার সড়ক হিসাবে নিলে কিলোমিটারপ্রতি বরাদ্দ ৩৬.৭৮ লাখ টাকা। তবু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলীরা সারা দেশের ২০টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে আসা চাহিদাপত্রগুলো যাচাই করে বলছেন, তালিকাভুক্ত সড়কগুলোর মেরামত কাজ শেষ করতে এবং সবগুলো গ্রামীণ সড়ক ব্যবহারযোগ্য রাখার জন্য বার্ষিক বাজেটে যে বরাদ্দ রয়েছে, তার পাঁচগুণ অর্থ প্রয়োজন। এলজিইডির তথ্য বলছে, সংস্থাটির আওতায় থাকা মোট ৩.৭৩ লাখ কিলোমিটার সড়কের বিশাল নেটওয়ার্কে পাকা সড়ক রয়েছে ১.৫৬ লাখ কিলোমিটার। নিম্ন মানের কাজ, নিম্ন মানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার, দুর্বল তদারকি, অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি অধিকাংশ পল্লি সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এর ফল হলো কয়েক দশক ধরে গ্রাম ও শহরকে সংযুক্তকারী পাকা রাস্তার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধ হওয়া গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের গতিশীলতা হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে। মানুষের জীবনে গতিশীল করে তুলেছে পাকা রাস্তা। রিকশা ও ভ্যানচালকদের জীবন সহজ হয়ে উঠেছে পাকা রাস্তার সুবাদে, তারা যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছে যে এসব রাস্তা মোটরচালিত যান চলাচলের প্রায় অনুপযোগী। চালক ও যাত্রীদের জন্য দুর্ভোগের উৎস হয়ে উঠেছে এসব সড়ক। এসব সড়কে চলাচলকারী যানবাহন দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এতে যানবাহন মেরামতের খরচ বাড়ে, পাশাপাশি যানবাহনের মালিকরা ভাড়াও বাড়িয়ে দেন। ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নিজের দোকানের জন্য রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী আনেন জাবেদ আল-হাসান। তিনি বলেন, 'জেলা শহর থেকে অরুয়াইল বাজারে ইট, বালি ও সিমেন্ট আনতে রাজি হয় না পিকআপ ভ্যান চালকরা। প্রতি ট্রিপে স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া দিয়ে পণ্য আনতে হয়।' জেলা শহর থেকে নবীনগর যাওয়ার সড়কটির বেশ কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেহাল দশায় আছে। জেলা শহরের পৈরতলা থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত অংশে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। কিছু অংশের পিচ উঠে বেরিয়ে পড়েছে নিচের স্তর। পৈরতলা-কৃষ্ণনগর সড়কে অটোরিকশা চালান হারেছ মিয়া। তিনি বলেন, 'এই সড়কে গাড়ি চালাতে কোমর ব্যথা হয়ে যায়। সময়ও বেশি লাগে। গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিতে হয়।' দেশের ৩.৭৩ লাখ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের প্রায় অর্ধেকই এখনও পাকা হয়নি। এই রাস্তাগুলো বর্ষাকালে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গভীর কাদায় রাস্তাগুলোতে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। কখনও হাঁটু পর্যন্ত কাদা হয়ে যায় অনেক সড়কে। নওগাঁর ভীমপুর গ্রামের বাসিন্দা রুবেল হোসেন। চালান অটোভ্যান। তার বাড়ির পাশ দিয়ে রাস্তা, কিন্তু কাঁচা। একটু বৃষ্টি হলেই এই রাস্তায় গাড়ি তো দূরের কথা, কোনো মানুষেরই হাঁটা-চলা দায়। বাধ্য হয়ে রুবেল তার অটোভ্যান বাড়ি থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরের বাজারে রাখেন। রুবেল বলেন, 'আমাদের এলাকায় এখন কোনো পাইকার ধান, সবজি, মাছ কিনতে আসেন না। শুধুমাত্র এই রাস্তার কারণে। বর্ষার মৌসুমে এই রাস্তায় কোনো গাড়ি ঢুকলে সেটি আর ফেরত যেতে পারবে না। অথচ আমার বাবা প্রায় ৩০ বছর ধরে শুনে আসছে এই রাস্তা পাকা হবে। বাবার বয়স হয়েছে অনেক। আমিও এই রাস্তার কাঁদার মধ্যে হাঁটি। কবে এই রাস্তা হবে কেউ জানে না। আমার ক্ষতিও কমে না।' বগুড়ার ধুনট উপজেলার বেড়েবাড়ি এলাকার বাসিন্দা খালিদ বিন সাঈদ বর্ষায় তাদের সড়কের দুর্দশা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'রাস্তায় ঢেউ খেলে, এটা দেখার ভাগ্য সবার হয় না। যদি কেউ বগুড়ার ধুনটের সোনাহাটা মোড় থেকে গাবতলীর বাগবাড়ির দিকে যায় কিংবা আসে, তাহলে এমন রাস্তা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবে।' তিনি জানান, আগে এই রাস্তা দিয়ে গাবতলী ও ধুনটের মধ্যে অনেক গাড়ি যাওয়া-আসা করত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, কিন্তু এখন আর যায় না। সরেজমিনে দেখে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের জেলা সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, এলজিইডির অনেক সড়ক বছরের পর বছর ধরে মেরামত হচ্ছে না। ফলে গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গত আগস্টের বন্যায় বান্দরবান জেলার ভেঙে পড়া গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মেরামত করে এক মাসেও সচল করা যায়নি। জেলা শহরের সঙ্গে সুয়ালক-লামা অভ্যন্তরীণ সড়কটিতেও সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় লোকজন বিকল্প পথ হিসেবে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও আমিরাবাদ হয়ে চলাচল করছে। টংকাবতী ইউনিয়নের মেন রাও ম্রো কার্বারী বলেন, 'সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় লোকজন উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে পারছে না। তাই যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতে সমস্যা হচ্ছে।' কুমিল্লার দেবিদ্বার-রসুলপুর ১০ কিলোমিটার সড়কটি তিন বছরের বেশি সময় ধরে ভাঙা। কোথাও সড়কের পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও রাস্তায় খানাখন্দ। এতে দৈনিক যাতায়াতের সময় বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষকে। স্থানীয় শরীফুল ইসলাম বলেন, 'দেবিদ্বার সদরে পৌঁছাতে আগে ২০ মিনিটের লাগত, এখন লাগে এক ঘণ্টার বেশি। সুস্থ মানুষ গাড়িতে উঠলেও কোমর ব্যথা শুরু হয়। আর রোগীদের দুর্ভোগ তো সীমাহীন।' নাঙ্গলকোটের কাশিপুর-জোড্ডা সড়কের একাংশের সংস্কার দুই বছর আগে শেষ হলেও বাকি অংশের কাজ আটকে আছে। বৃষ্টি হলে পানি জমে সড়কটি অন্তত ১৫ দিন ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। বুড়িচংয়ের জগৎপুর সড়কের সংস্কার হয়নি গত ১৩ বছরেও। মাত্র দুই কিলোমিটার এই সড়ক পার হতে অটোরিকশার সময় লাগে ৫০ মিনিট। কুমিল্লা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আশরাফ জামিল টিবিএসকে জানান, চলতি অর্থবছরে ২২টি নোটিশের মাধ্যমে শতাধিক সড়ক মেরামতের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে এসব সড়কের কাজ শুরু হবে। গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক মূলত ১৯৯০-এর দশক থেকে উন্নত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিতে এবং গ্রামকে জেলা ও উপজেলা শহর, স্কুল, স্বাস্থ্য সুবিধা, গ্রামীণ উন্নয়ন কেন্দ্র, ইউনিয়ন সদর দপ্তরের, স্থানীয় বাজার ও খামারের সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন মানুষ জ্বালানি ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন ব্যবহার করছে। ফলে কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি মিলেচে, কমেছে যাতায়াতের সময়। *সড়কের অবস্থা* দেশের গ্রামীণ এলাকার পাকা রাস্তার বড় একটি অংশের অবস্থাই বেহাল। যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য যারা এসব রাস্তা ব্যবহার করেন, তাদেরকে রোজই অসংখ্য গর্ত ও পিচ উঠে যাওয়া সড়কে ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করতে হয়। একটি সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুসারে, বন্যা, বৃষ্টি ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় গত কয়েক বছরে পাকা সড়কের ৬০ শতাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, ভালো অবস্থায় আছে মাত্র ৪০ শতাংশ সড়ক। যদিও গত বছরও ৪৮ শতাংশ সড়ক ভালো অবস্থায় ছিল। ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন, নিম্ন মানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার, দুর্বল তদারকি, দুর্নীতি, বন্যা, বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রকৃতিক দুর্যোগ এবং সংস্কারে অনীহার কারণে পল্লি সড়কগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তবে মেরামতের জন্য বরাদ্দের অপ্রতুলতাকেও এ বেহাল দশার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এলজিইডিকে ৩,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়নি; আর চলতি অর্থবছরে ৩,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এলজিইডির কর্মকর্তারা বলেন, আম্ফান, বুলবুলসহ বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়, গত বছরে সিলেট ও রংপুর বিভাগে বন্যা, চলতি বছরে রংপুরের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যার কারণে কয়েক হাজার কিলোমিটার পল্লি সড়কের ক্ষতি হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্কার করা হয়েছে মাত্র ৮,৫০০ কিলোমিটার সড়ক। ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি ৮,১০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করেছিল। আর চলতি অর্থবছরে ৭,৭৪৩ কিলোমিটার থেকে ৮,৭০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করতে চায় এলজিইডি। এ হিসাবে বছরে মোট সড়কের মাত্র ৫.৮১ শতাংশ করে সংস্কার করা হচ্ছে। যেহেতু চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ বরাবরই কম থাকে, সেজন্য উপজেলা ও জেলা কার্যালয়গুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাস্তার অগ্রাধিকার তালিকা দিতে বলে এলজিইডি। *এলজিইডি যা বলছে* গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থায়নকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ মনে করে এলজিইডি। এছাড়া পূর্ত কাজের গুণগত মান উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনে করে সংস্থাটি। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন টিবিএসকে বলেন, সবগুলো গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, এলজিইডির জন্য বরাদ্দ তার চেয়ে অনেক কম। এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ) আনোয়ার হোসেন বলেন, সংস্থাটির ২০টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের রিসোর্সের মোট চাহিদা প্রকৃত বরাদ্দের চেয়ে অন্তত পাঁচগুণ বেশি। সেজন্য উপজেলা ও জেলা কার্যালয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাস্তার অগ্রাধিকার তালিকা দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এলজিইডির ২,০৮০ কিলোমিটার পাকা সড়কের অধিকাংশই এখন স্থানীয়দের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল মান্নান বলেন, 'আমাদের বেহাল থাকা সড়কগুলো সংস্কারের জন্য ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে ৫০ শতাংশ সড়কের সংস্কার করা যাবে।' কুমিল্লা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আশরাফ জামিল টিবিএসকে জানান, চলতি অর্থবছরে ২২টি নোটিশের মাধ্যমে শতাধিক সড়ক মেরামতের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে এসব সড়কের কাজ শুরু হবে। বগুড়া এলজিইডির আওতায় প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে অর্ধেক রাস্তা পাকা। পাকা রাস্তার মধ্যে এখন অন্তত ১,০০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। গত অর্থবছরে বগুড়ার ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার হলেও এবার ২০০ কিলোমিটার মেরামতের জন্য বরাদ্দ মিলেছে বলে জানান বগুড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোর্শেদ। লক্ষ্মীপুর এলজিইডি অফিস জানিয়েছে, গত অর্থবছরে ২৫০ কিলোমিটার সড়ক মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান শেষে কাজের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা ২০ শতাংশ কাজও করতে পারেনি। কমলনগর উপজেলার এলজিইডি প্রকৌশলী সোহেল আনোয়ার বলেন, উপজেলার প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলজিইডি সড়ক খারাপ। চলতি অর্থবছরে ১৮.৫ কিলোমিটার রাস্তার জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, কিন্তু অর্থ পাওয়া গেছে ৮ কিলোমিটারের জন্য। সিলেটের অবস্থাও ভালো নয়। গত বছর সিলেটে বন্যায় এলজিইডির প্রায় ৪৩৮ কিলোমিটারের পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলজিইডি কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লগবে। বরাদ্দ স্বল্পতার কারণেই সংস্কার কাজ হচ্ছে না। এলজিইডি সিলেট কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী একেএম সহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'গত অর্থবছরে আমরা ১৭৫ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করেছি। এই অর্থবছরেও কিছু সংস্কার হবে। তারপরও কিছু ভাঙাচোরা সড়ক থেকে যাবে। এগুলো বরাদ্দপ্রাপ্তি সাপেক্ষে পরবর্তীতে সংস্কার করা হবে। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের উত্তরবিঘা বিলে দশ বিঘা বাগদা চিংড়ির ঘের রয়েছে আজগর আলীর। তিনি জানান, রাস্তা খারাপ থাকার কারণে একদিকে যেমন সময় ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে পরিবহন খরচও বেড়েছে। 'পিকআপ চালকরা রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে নানা অজুহাত দেখায়—গাড়ির পার্টস নষ্ট হচ্ছে, ভাড়া বেশি দিতে হবে। যারা ব্যবসা করেন, তাদের বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়েই পিকআপ ভাড়া করতে হয়,' বলেন তিনি। সাতক্ষীরা সুলতানপুর কাঁচাবাজার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম বলেন, 'সড়ক খারাপ থাকার কারণে কৃষকরা সঠিক সময়ে অনেকসময় তার সবজি বাজারে তুলতে পারেন না। ফলে কখনও কখনও কৃষকরা ন্যায্য দাম পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হন।' *বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?* পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, 'গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় একটা অংশ এসেছে গ্রাম থেকে এবং পল্লি অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি এলজিইডির সড়কগুলো। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে এসব সড়ক।' অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা এ সব সড়কের এত ভার বহন করার শক্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কারণে পাওয়ার টিলার, হারভেস্টর, এক্সকেভেটর, ফিশারিজ ও ডেইরি পণ্যবাহী ট্রাক, পাকা অবকাঠামো নির্মাণের হার বেড়ে যাওয়ায় ইট, সিমেন্ট, বালুবাহী ট্রাক, বিদ্যুতায়নের পোলসহ ভারী যন্ত্রপাতি এখন গ্রামে ঢুকছে।' গত ১৫ বছর ধরে সংস্কার হচ্ছে না এমন সড়কও রয়েছে। অনেক সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে; এতে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে যাতায়াতকারীরা। বৃষ্টি হলে এসব রাস্তায় পানি জমে মোটরযান চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়ে। *যখন আরও উন্নতি করা প্রয়োজন, তখন আরও খারাপ হচ্ছে সড়কের অবস্থা* রুরাল অ্যাকসেস ইনডেক্সের (আরএআই) তথ্য বলছে, অবস্থা খারাপ হলেও দেশের অধিকাংশ গ্রামে পাকা রাস্তা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আরএআই অনুসারে, ২০১৫ সালে গ্রামে বসবাসকারী প্রায় ৮৬.৭ শতাংশ মানুষ তাদের বাসস্থানের দুই কিলোমিটারের মধ্যে পাকা রাস্তা ব্যবহার করতে পারত। গত অর্থবছরে এই হার কিছুটা বেড়ে ৮৮ শতাংশ হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) একটি নথি অনুসারে, হাওর (জলাশয়), জলা অঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের উপজেলা ছাড়া এই হার ৯০ শতাংশের বেশি। ৮৭ হাজার ২৩৩টি গ্রামের মধ্যে ৭০ হাজারের গ্রাম ভালোভাবে সংযুক্ত। এলজিইডি মনে করছে, গ্রামীণ সড়কগুলো নির্মাণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। এখন ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে সড়কগুলো উন্নত করা দরকার। এর আগে 'আমার গ্রাম আমার শহর' প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর সাদেক টিবিএসকে বলেছিলেন, গ্রামীণ সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার কথা মাথায় রেখে নতুন এলজিইডি রোড ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ২০ বছর সড়ক ডিজাইন ও নির্মাণের জন্য এ পরিকল্পনা ব্যবহার করা যাবে।
Published on: 2023-10-03 19:43:59.231677 +0200 CEST