The Business Standard বাংলা
এম এস স্বামীনাথন: ভারতের পাতে খাবার তুলে দিয়েছিলেন যিনি

এম এস স্বামীনাথন: ভারতের পাতে খাবার তুলে দিয়েছিলেন যিনি

পরিবার চেয়েছিল তিনি ডাক্তার হবেন। কিন্তু পঞ্চাশের মন্বন্তরে বাংলাজুড়ে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ না খেতে পেয়ে মরে যাওয়ার পর এম এস স্বামীনাথনের জীবনপথ বদলে গেল। মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী এ তামিল তরুণ চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে কৃষি নিয়ে পড়া শুরু করলেন। সদ্যস্বাধীন ভারতে তার দায়িত্ব হলো দেশের দরিদ্ররা যেন ঠিকমতো দুটো খেতে পায় তা নিশ্চিত করা। ৯৮ বছর বয়সে গত ২৮ সেপ্টেম্বর চেন্নাইয়ে মারা গেছেন স্বামীনাথন। ভারতের কৃষি গবেষণা ও কৃষিনীতিতে তার অবদান এক কথায় অপরিমেয়। খাদ্য আমদানিতে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ভারতকে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝিতে ধান ও গমে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছিলেন স্বামীনাথন — সারা ভারতে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন উচ্চ ফলনশীল ধান ও গমের বিভিন্ন জাত। পরবর্তী দশকগুলোতে নিজের খ্যাতিকে তিনি ব্যবহার করেছেন উন্নয়নশীল অনেক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পক্ষে কথা বলতে। এ বিষয়ে বৈশ্বিকভাবে বর্তমানে দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। তারপরও স্বামীনাথন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সবার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিতের লক্ষ্য আবারও হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে, বিশেষ করে এ হুমকি তৈরি হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। পঞ্চাশের মন্বন্তর ছিল রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ভারতের ব্রিটিশ শাসকেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সৈন্যদের খাওয়াতে ভারতবর্ষ থেকে খাদ্য নিয়ে গিয়েছিল। সদ্যস্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিলো কৃষির স্বল্প উৎপাদন। ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না দেশটির খাদ্য উৎপাদন। তখন বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন, দেশটিতে ভবিষ্যতে আরও বেশি দুর্ভিক্ষ ও গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটবে। তবে স্বামীনাথন ও তার সহকর্মীরা এ বিশেষজ্ঞদের মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন কেবল উন্নত জাতের ফসলের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এসব ফসল সার ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারত। সাধারণ ফসলে সার দেওয়া হলে সেগুলোর দেহ লম্বা হয়ে পড়ত। তখন ফলনের ভার সইতে না পেরে মাটিতে পড়ে যেত গাছ, নষ্ট হতো ফসল। মার্কিন কৃষিবিদ নরম্যান বোরলাউগ ও দ্য ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর আবিষ্কার করা ধান ও গমের নতুন জাত ছিল তুলনামূলকভাবে শক্ত। ১৯৬০-এর দশকে উত্তর ভারতে এসব জাত লাগানোর পর ফলন উপচে পড়ল। এভাবেই ভারতে শুরু হয়েছিল 'সবুজ বিপ্লব'। বোরলাউগ একবার লিখেছিলেন, স্বামীনাথন না থাকলে 'এশিয়ায় সবুজ বিপ্লব না ঘটারই সম্ভাবনা ছিল'। এ ধরনের উদ্যোগগুলো ভারতকে একটি কৃষিশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত আর কখনো বড় কোনো দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েনি। ১৯৭৪ সাল থেকেই দেশটিকে ধান–গমের চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানির ওপর আর ভরসা করতে হয়নি। বর্তমানে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধান রপ্তানিকারক দেশ। ২০২২ সালে ধানের বৈশ্বিক বাজারের ৪০ শতাংশ ভারতের দখলে ছিল। বৈশ্বিকভাবে গমের দ্বিতীয় বৃহৎ উৎপাদনকারী ভারত — এ ফসলটিও কিছুটা রপ্তানি করে দেশটি। তবে ভারত সম্প্রতি ধানের কিছু জাতের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এছাড়া অন্য কয়েকটি শস্য রপ্তানিতে এটি শুল্ক আরোপ করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ক্রমশ অনির্ভরশীল উৎপাদন পরিস্থিতির মাঝে বিশ্বজুড়ে গত কয়েক বছরে কৃষির ফলন কিছুটা কমে গেছে। ভারত এর শস্য রপ্তানিতে সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞাটি দিয়েছে অনিয়মিত বর্ষা মৌসুমের পর। বৃষ্টি এবার দেরিতে হয়েছে, ফলে ধান রোপণের মৌসুমও পিছিয়ে গেছে। কিন্তু সে বৃষ্টি আবার এত তীব্রভাবে নেমেছে যে মাঠের ফসল মাঠেই মরে গেছে। এ আগে তীব্র গরমে ভারতের গমের ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার এ পাগলামিও ক্রমশ বাড়বে। আর এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীর ক্ষমতায়ন ও পুষ্টিনীতির পক্ষেও কথা বলেছেন স্বামীনাথন। সেসব আলোচনায়ও তিনি খাদ্য নিরাপত্তায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকির কথা বারবার স্মরণ করে দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে তিনি লেখেন, 'কৃষকেরা এখন আর বৃষ্টি ও তাপমাত্রার চিরায়ত গড় হিসাবের ওপর নির্ভর করতে পারছেন না।' খরা ও বন্যার ফলেও 'দুর্যোগের সৃষ্টি' হতে পারে। তার উত্তরসূরীরা এসব হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছেন — উচ্চ তাপ ও বন্যার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারে এমন ধান ও গমের জাত তৈরি করছেন। তারপরও বিভিন্ন লক্ষণ বলছে, এসব উদ্ভাবনও হয়তো পর্যাপ্ত হবে না। বর্তমানে আবাদি জমির বিশাল একটা অংশ ভবিষ্যতে অনাবাদি হয়ে পড়তে পারে। সবুজ বিপ্লবের সময় জনপ্রিয় হওয়া অন্যান্য পদ্ধতিগুলোও এখন আর ব্যবহার না করার পক্ষে অভিমত তৈরি হচ্ছে। যেমন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেচ বা এক জমিতে একবার একটি ফসল উৎপাদনের মতো পদ্ধতিগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠছে। কারণ এসবের ফলে ভূ-অভ্যন্তরে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, মাটির পুষ্টিগুণ নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় ঝুঁকির পরিমাণ বাড়ছে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য নতুন ও আরও উন্নত একটি সবুজ বিপ্লবের দরকার এখন।
Published on: 2023-10-04 18:33:34.024517 +0200 CEST