The Business Standard বাংলা
প্রথম প্রান্তিকে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে, বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকে

প্রথম প্রান্তিকে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে, বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকে

পুনঃতফসিল সুবিধা না পাওয়ায় ২০২৩ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, নির্বাচনপূর্ব অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিল্প-উৎপাদন ও জনগণের আয় কমাসহ বেশ কিছু কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতের ৪৪টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৭.০৬ শতাংশ। *বেড়েছে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি* ব্যাংকিং খাতে সার্বিক খেলাপি ঋণ কমলেও প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৩ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৫ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, যা জুনে ছিল ২১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়েছে। সাধারণত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যখন বেড়ে যায়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা নগদ প্রভিশনের পরিমাণ বাড়াতে হয়, যাতে সম্ভাব্য লোকসানের ঝুঁকির থেকে এই প্রভিশন নিরাপত্তা দিতে পারে। খেলাপি ঋণের ধরনভেদে প্রভিশন রাখা হয়। যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি, সে ব্যাংককে তত বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। বকেয়া ঋণের ২০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১২ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার, আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। *সার্বিক খেলাপি ঋণ কমেছে* বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়লেও ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ কমেছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৬৪৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৫৫ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৯.৯৩ শতাংশ। তিন মাস আগে, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১.৫৬ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১০.১১ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ কমার পেছনের মূল কারণ হলো রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমেছে। সূত্রমতে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের বড় দুই খেলাপি গ্রাহকের ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। এতেই তিন মাসের ব্যবধানে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমেছে। সব মিলিয়ে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ কারণে ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। একই সময়ে জনতা ব্যাংক জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দুটি ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ২১.৭০ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৭৪ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমেছে ৮ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যাংক খাতে সার্বিক খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত তারল্য চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং দেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে গেছে। পাশাপাশি মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও কমছে, যার কারণে গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। 'অনেক গ্রাহকের এক বছর মেয়াদি ডিমান্ড লোনকে টার্ম লোন করতে হচ্ছে, কারণ এই চাপের সময়ে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের অবস্থা নেই,' সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন। সামনে নির্বাচন পর্যন্ত এমন অবস্থা যাবে বলেও জানান তিনি। । একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী ডিসেম্বর প্রান্তিকে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। নির্বাচনের আগে অনেক ঋণখেলাপির ঋণ সহজ শর্তে পুনঃতফসিল করতে হবে। ব্যাংকগুলো আসলে তাদের খেলাপি ঋণ আদায় করবে না। তিনি আরও বলেন, পোশাক খাতে বিদেশি অর্ডার ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। তার ওপরে সব শিল্পেই মূলধনী পণ্য এবং কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আমদানি এভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং কোম্পানিগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও নিষ্পত্তি যথাক্রমে ১১.৫২ শতাংশ এবং ২৪.০৭ শতাংশ কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে শিল্প কাঁচামাল আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.১২ শতাংশ কমেছে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৪৭ শতাংশ কমেছে।
Published on: 2023-11-21 18:34:26.772641 +0100 CET