The Business Standard বাংলা
দেশের জুতা শিল্পকে নতুন রূপ দিতে প্রস্তুত স্যু সিটি

দেশের জুতা শিল্পকে নতুন রূপ দিতে প্রস্তুত স্যু সিটি

সম্ভাবনা সত্ত্বেও প্রায় দুই দশক ধরে জুতাসহ বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ১০০ কোটি ডলারেই আটকে আছে। অথচ একই সময়ে আকাশচুম্বী অগ্রগতি দেখিয়েছে ভিয়েতনাম। যেখানে দেশটির এই খাতে রপ্তানি আয় ছিল ১০০ কোটি ডলারেরও কম, সেখানে এখন তাদের আয় দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি ডলারে। দুই দেশের মধ্যকার সম্পূর্ণ এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে বাধা সৃষ্টিকারী চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, জুতা উৎপাদনের জন্য আমদানি করা উপকরণের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের এই রপ্তানি স্থবিরতার বড় একটি কারণ। এই নির্ভরশীলতা শিল্পটিকে সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং বিনিময় হারের ওঠানামার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। জুতা শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে উদ্ভাবন ও অগ্রগতির আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ স্যু সিটি লিমিটেড (বিএসসিএল)। জেনিস গ্রুপের নেতৃত্বে যুগান্তকারী এ উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে একটি একক ও অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে এক জায়গায়ই জুতা উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৫০টি উপকরণ তৈরি করা হবে। গাজীপুরের মৌচাক ইউনিয়নে ৩৫ একর বিস্তীর্ণ জমিতে বৈশ্বিক জুতা উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তন করতে চায়  বিএসসিএল। বিএসসিএলের এক্ষেত্রে অগ্রগতি অনস্বীকার্য। কারণ ইতোমধ্যে কানাডার একটি প্রতিষ্ঠানসহ চারটি প্রতিষ্ঠান সেখানে কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রকল্পটি জাপান এবং চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫টি অতিরিক্ত বিনিয়োগকারীর নজর কেড়েছে যারা এই উদ্যোগে যোগ দিতে আগ্রহী। জেনিস গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএসসিএলের চেয়ারম্যান নাসির খান অত্যাধুনিক এই সুবিধার মধ্যে শতভাগ মূল্য সংযোজন অর্জনে সংস্থাটির দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে নাসির খান পাদুকাশিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। আমদানি করা পণ্যের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করে নাসির খান বলেন, ক্রেতারা প্রায়ই আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল সাপ্লাই চেইনের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, যা আরো স্থিতিস্থাপক ও সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরছে। তিনি বলেন, এই উদ্বেগগুলো মোকাবেলা করতে এবং জুতা উৎপাদন বাস্তুতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে বিএসসিএল তার সুবিধাগুলোর মধ্যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার একটি ব্যাপক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই সামগ্রিক পদ্ধতির মধ্যে কাঁচামাল ও ব্যবহার অনুপযোগী (ফেলনা) উভয় ধরনের পণ্য নিয়েই কাজ হবে। আর এগুলো হবে কেবল একটি একক ও কৌশলগতভাবে অবস্থিত কমপ্লেক্সের ভেতরেই। বিএসসিএলের প্রকল্প পরিচালক সঞ্জয় সাহা প্রতিষ্ঠানটিকে পাদুকা তৈরির জন্য একটি ওয়ান স্টপ শপ (এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে গ্রাহকরা এক ছাদের নিচে সব পণ্য বা সেবা পেয়ে থাকে) হিসেবে পরিকল্পনা করেছেন। এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি শেষ হলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সাহা বলেন, বর্তমানে জুতা উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। সাধারণত জুতা তৈরির জন্য প্রায় ৫০টি উপকরণের  প্রয়োজন হয়। এই উপকরণগুলো আমদানি করা একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হতে পারে। প্রক্রিয়াটিকে সহজ করার প্রচেষ্টায় সাহা বলেন, বিদেশি ক্রেতারা প্রায়ই ৪০ থেকে ৫০ দিনের জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলেন। চীন থেকে পণ্য অর্ডার করা এবং সেগুলো পৌঁছানো পর্যন্ত বেশ সময় লেগে যায়। সাহা বলেন, "উৎপাদন ইউনিটগুলোকে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় বাজারের চাহিদা পূরণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে আমাদের এই উদ্যোগ সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো ২৮টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন হবে।" সাহা জোর দিয়ে বলেন, বিএসসিএল জমি ইজারা দেবে না, তবে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঁচ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে অবকাঠামো (ভবন) লিজ দেবে। এর উদ্দেশ্য হলো উৎপাদনের জন্য একটি সহজ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যেখানে কোম্পানিগুলো পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে পারে। স্যু সিটির বিভিন্ন ধরনের জুতা ও আনুষাঙ্গিক পণ্য তৈরির একটি ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে চামড়ার জুতা, খেলাধুলার জুতা, এসপাড্রিল (পাট ও কাপড়ের তৈরি) জুতা, নিরাপত্তা জুতা, শিশুদের জুতা, নারীদের ফ্যাশন জুতা, ক্যানভাস জুতা, স্কুলের জুতা, রাবারের জুতা, গুডইয়ার ওয়েল্টেড জুতা, গ্যাগস, ওয়ালেট এবং বেল্ট। পাশাপাশি স্যু সিটি আউটসোল, রাবার, ক্রেপ, আঠা, সিন্থেটিক সামগ্রী, বাক্স, কার্টন, প্রিন্টিং, লেবেলিং, ট্যাগ, থ্রেড, ছাঁচ, রং, পায়ের আঙুলের পাফ, টেপসহ জুতা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের আনুষঙ্গিক শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করবে। স্যু সিটি বলছে, একটি জায়গাতেই একেকটি কারখানা একেকটি পণ্য তৈরি করবে। জুতা তৈরির উপকরণগুলো পাওয়া যাবে হাতের নাগালেই। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার্ড সার্ভিস মডেল ব্যবহার করে বিদ্যমান ভ্যালু চেইনের মধ্যে ব্যয়সাশ্রয়ী উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান একটি জায়গাতে হওয়ার কারণে প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারীদের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমে আসবে। সঞ্জয় সাহা বলেন, আমাদের অনুমান অনুযায়ী, সদস্য কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ ২০ শতাংশ কমে যাবে। ফলে তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হবে। প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হয়েছিল। এখানে এক লাখ বর্গফুটের বেশি আয়তনের একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণাধীন। পাঁচটি কোম্পানি ইতোমধ্যেই উৎপাদন শুরু করেছে। আমরা ইউরোপ, চীন এবং জাপানের অতিরিক্ত ১৫টি কোম্পানির সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছি। এই অংশীদারিত্ব জুতা তৈরির বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে সহায়তা করবে। *চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে স্যু সিটি* সাহা বলেন, "মহামারির পর থেকে আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আমাদেরও প্রভাবিত করেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন অনিশ্চয়তার কারণে যেসব বিদেশি কোম্পানি এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী তারা সময় নিচ্ছে। যাইহোক, আমরা আশাবাদী যে ২০২৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানি এখানে উৎপাদন শুরু করবে।" উন্নত দেশগুলোর ক্রেতারা স্বচ্ছ ও টেকসই সাপ্লাই চেইনের ওপর জোর দিচ্ছে।  এসব চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশি ক্রেতারা সব প্রতিষ্ঠানে কঠোর সম্মতি মান প্রয়োগ করছে। তারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখছেন যে প্রতিষ্ঠানগুলোর লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন আছে কি না। সাহা আরও বলেন, "আমরা আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। আমাদের এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ট্যানারি বা প্রতিষ্ঠানের ইটিপি লাগলে তা দেওয়া হবে। আমরা একটি গ্রিন রেজিলিয়েন্স জোনও প্রতিষ্ঠা করব, যা এখানকার ইনস্টিটিউট থেকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সার্টিফিকেশন অর্জন সহজ করবে। সেই সঙ্গে আমরা রিনিউয়েবল এনার্জি সলিউশনস বজায় রাখব।" *যেসব কোম্পানি এখন উৎপাদনে* ফাইভ-আর ফুটওয়্যার লিমিটেড: একটি পূর্ণাঙ্গ চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এটি দৈনিক প্রায় দুই হাজার জোড়া চামড়ার জুতা তৈরি করে। সেই সঙ্গে প্রতিদিন ২০ হাজার বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রতিদিন তিন হাজার জোড়া সোল উৎপাদনে সক্ষম ইউনিট রয়েছে। কোম্পানিটির একটি গুদাম এবং একটি ইটিপি রয়েছে যেখানে কার্যকরভাবে বর্জ্য পরিশোধন করা যায়। এছাড়াও একটি ভারতীয় কোম্পানি এখন চামড়ার ইলাস্টিক, একটি পর্তুগিজ কোম্পানি জুতার জন্য ব্যবহৃত তেল এবং একটি কানাডিয় কোম্পানি কাপড় ও চামড়ার সমন্বয়ে স্যুভেনির পণ্য তৈরি করছে। সাহা বলেন, "জুতা উৎপাদনের পাশাপাশি কাপড় উৎপাদনের জন্যও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সুবিধাটি বিশেষভাবে চামড়াভিত্তিক স্যুভেনির আইটেম যেমন– হ্যান্ডব্যাগ ও গ্লাভস প্রস্তুতকারকদের দেওয়া হবে।" আধুনিক উৎপাদন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি চামড়া শিল্প পার্কটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জন্য প্রাণবন্ত ও সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত সুবিধা প্রদান করবে। এই সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে– প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, শিশু যত্ন কেন্দ্র, চিকিৎসা কেন্দ্র, গ্রন্থাগার, প্রার্থনা কক্ষ, কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভবন, প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র, পরিদর্শন কেন্দ্র, পর্যবেক্ষণাগার, গুদাম, ফায়ার স্টেশন, পরিবহন কোম্পানি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোম্পানি, আবাসিক হোটেল, মুদি দোকান এবং একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা। সঞ্জয় সাহা বলেন, "আমরা বিনিয়োগকারীদের ইউটিলিটিসহ (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) সব সুযোগ-সুবিধা দিতে প্রস্তুত। আমরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার এমনকি একটি হেলিপ্যাডও নির্মাণ করেছি। সরকার আমাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।" বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এক হাজার কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ১,৭০০ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। স্যু সিটি দেশকে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন সঞ্জয় সাহা।
Published on: 2023-11-25 10:10:06.106549 +0100 CET