The Business Standard বাংলা
কাক কমে যাচ্ছে, ঢাকা কি কাকশূন্য হয়ে যাচ্ছে!

কাক কমে যাচ্ছে, ঢাকা কি কাকশূন্য হয়ে যাচ্ছে!

মোরগের ডাকে গাঁয়ের মানুষের ঘুম ভাঙে আর ঢাকাবাসীর ঘুম ভাঙায় কাক। ঢাকা কাকেরই শহর। কাক ছাড়া ঢাকার কথা যে চিন্তা করা যায় না, তার প্রমাণ রনবীর (শিল্পী রফিকুন নবী) টোকাই কার্টুন। কাকের আড্ডাও ঢাকাবাসীর আলোচনার বিষয়। ওরা সামাজিক প্রাণী। একজনের বিপদে অন্য কাকদের এগিয়ে আসার নমুনা অগণিত। কারো মৃত্যুতে ওরা শোকসভা করে। স্ত্রী ও পুরুষ কাক কাছাকাছি থাকে, পরস্পরকে আগলে রাখে। একলা একটা কাক দেখা যায় কদাচিৎ। ঢাকার প্রতীক হিসেবে কাককে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু কাক ছাড়া যে ঢাকা শূন্য লাগে তা বুঝি আজ অনেকেই টের পেতে শুরু করেছেন। সত্যিই কি ঢাকায় কাক কমে যাচ্ছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা এক পর্যায়ে এ প্রশ্নেই এসে থমকে গেল। আনোয়ারুল ইসলাম উত্তরে বললেন, "বছরওয়ারি পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কাকের সংখ্যা আগের সমান নেই। দিনকয় আগে কার্জন হলে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) গিয়েছিলাম । কাক ততটা দেখলাম না। কোথাও পানি জমে থাকলেও তার আশপাশে কিছু কাক দেখলাম। ওই দিন দেখিনি।" আলোচনা শুরু হয়েছিল, কাক পরিবেশের জন্য কতটা দরকারি, এই প্রশ্ন দিয়ে। জনাব ইসলাম বলেছিলেন, এর উত্তর ইনক্যালকুলেবল অর্থাৎ হিসেব কষে বলা সম্ভব নয়। উদাহরণ দিয়েছিলেন ভারতের বাঘ প্রকল্পের। ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভারতে ব্যাঘ্র প্রকল্প চালু করেছিলেন। ভারতে তখন বাঘের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল, এতই দ্রুত গতিতে যে বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা। পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি পরিস্কার হয়, ১৯৪৭ সালে সংখ্যাটি ছিল ৪০ হাজার, ১৯৭০ সালে নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২ হাজারে। উদ্বেগ তীব্র হয় যখন আইইউসিএন বাঘকে বিপন্ন প্রজাতি ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালে আবার গুনে দেখা যায় বাঘের সংখ্যা আরও ২০০ কমে গেছে। তাই ১৯৭৩ সালে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য ব্যাঘ্র প্রকল্প হাতে নেয় ভারত সরকার। তারপর কেটে যায় ৪ বছর। সরকারে পালাবদল ঘটে। মোরারজী দেসাই হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ছিলেন দরিদ্রবান্ধব। সাধারণ মানুষ যখন খেতে পায় না তখন বাঘের জন্য এতো অর্থ খরচ করা হবে কেন, এ প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন। জনাব ইসলামের শিক্ষক প্রখ্যাত পক্ষীবিদ ও প্রকৃতিপ্রেমী সালিম আলীর সমীপে প্রশ্নটি হাজির করা হয়। সালিম আলী তখন বলেছিলেন, "বাঘের জন্য অর্থ খরচ করা কেন জরুরী সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে বাঘ কেন জরুরী তা জানা দরকার। প্রকৃতির নিজস্ব যে চক্র তাতে বাঘও অংশী। এই চক্রে পাখি, পতঙ্গ, সরীসৃপ, মৎস্য, স্তন্যপায়ী, বৃক্ষ ইত্যাদি সকলেই আছে। এটাকে মালা হিসেবে চিন্তা করলে বুঝতে সহজ হবে, কোনো একটি প্রাণী যদি মালাটি থেকে খসে পড়ে তবে স্থানটি শূন্য হয় এবং আর কোনো কিছু দিয়েই তা পূরণ করা সম্ভব হয় না। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণের প্রয়োজনীয়তা অপরিমাপযোগ্য বা ইনট্যানজিবল এবং মূল্য অপরিসীম। তাই বাঘ সংরক্ষণে অর্থ ব্যয় বাজে খরচ হিসেবে ধরা যাবে না।" কথাটি প্রযোজ্য কাকের ক্ষেত্রে, হাতির ক্ষেত্রে, চড়ুই বা প্রজাপতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।" রনবীর টোকাই চরিত্রটি বিচিত্রার পাতায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্তও চরিত্রটি পাঠককে ভাবিয়েছে। ওই পুরো সময় জুড়ে এবং তার পরেও অনেকদিন ঢাকার সড়কগুলোয় সিমেন্ট বাঁধানো ডাস্টবিন ছিল। এখান থেকে টোকাই খাবার কুড়িয়েছে বা ধারে বিশ্রাম নিয়েছে। একটি বা একাধিক কাককেও দেখা গেছে তখন টোকাইয়ের সঙ্গে, ওরাও এসেছিল খাবার সংগ্রহ করতে। টোকাইয়ের সঙ্গে ওদের কখনো সখনো ভাবনা বিনিময়ও হয়েছে, সম্ভবত সেগুলোর বিষয় ছিল খাদ্য সংকট বা উচ্ছিষ্ট খাবারের গুণমান। রনবী টোকাই আঁকছেন না, কাকেরও আর জায়গা হচ্ছে না পত্রিকার পাতায়। শহুরে পাখিটিকে খুঁজে পেতে অধুনা নজর মেলতে হয় প্রশস্ত করে। সামহোয়্যারইব্লগে সপ্রসন্ন নামের এক লেখক অবশ্য ২০১৮ সালেই বিষয়টি টের পেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, "শহরটিতে আগে সকাল শুরু হতো কাকের কর্কশ স্বর দিয়ে। যেমন শহরের এই বাসাটির কথাই ধরা যাক। আগে বাসাটি ছিল টিনশেড, সামনে বেশ জায়গাজুড়ে উঠোন ছিল। আর উঠোনে কয়েকটি নারকেল গাছ ছিল। গাছগুলো উচ্চতায় ছিল একতলা বাসাটির চারগুণ। সেই নারকেল গাছেই ছিল অনেক কাক পরিবারের বাস। কাকগুলো সেখানে নারকেল গাছের ডালে বসে থাকত আর পাতার ফাঁকে ফাঁকে তাদের কালো ঠোঁটগুলো ঠুকে শান দিত…। কাকগুলো তাদের দৈনন্দিন খাবার সংগ্রহ করত শহরের পড়ে থাকা আবর্জনা থেকে। নানাপ্রান্তের ডাস্টবিনে ভিড় লেগে থাকত সবসময়। যেহেতু শহরে মানুষজনের অভাব নেই, তাই ময়লা আবর্জনারও অভাব ছিল না। ভোর হবার আগেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী পুরো শহর ঝাঁট দিত, আর দিনের বাকি সময় এ দায়িত্ব নিত কাকেরা। তারা যতটা না ময়লা ঘাঁটত, তার চেয়ে বেশি চেটেপুটে খেয়ে পরিস্কার করে রাখত। এসব মিলিয়ে কাক ছিল শহরটির জাতীয় পাখি।" তার নিয়োগপত্র নেই মায়নাও পায় না, নিজে থেকেই শহর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় কাক। ঝাড়ুদার বলে পরিচিতিও আছে। তবুও কাক কমে যাওয়া নিয়ে শহরে তেমন শোরগোল নেই কেন? কাকের কালো রং, লম্বা চঞ্চু, কর্কশ স্বর কি এর কারণ? কাকের মাংসও তিতকুটে। তাই শিকারী পাখি বা প্রাণীও এর প্রতি আগ্রহ দেখায় না। কেবল প্রকৃতি দরদী কবি জীবনানন্দ দাশকেই দেখি ভোরের কাক হয়ে আবার এই বাংলায় ফিরে আসার আগ্রহ রাখেন। আর ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। যিনি কবি শামসুর রাহমানের 'কাক' কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে দৃঢ় ও তীর্যক কাক এঁকেছিলেন। কাকের গুণাবলি জেনেই কিন্তু মানুষ ধৈর্যশীল অর্থে তীর্থের কাক, দীর্ঘায়ু অর্থে ভূষণ্ডির কাক, অত্যধিক চেষ্টা অর্থে কাকচেষ্টা, প্রত্যুষ বোঝাতে কাকভোর কথাগুলো চালু করেছে; কিন্তু সেভাবে তাকে সমাদর করেনি। কাক মানুষের মতোই পরিকল্পনা করে কাজ করে যেমন কখন কী খাবে, কোথায় খাবার পাবে, সঙ্গীকে কতটুকু ভাগ দেবে ইত্যাদি। জনাব ইসলাম জানাচ্ছেন, "একটা কাক যা করে তা পৃথিবীর তামাম মানুষ মিলেও করতে পারে না। একটি মরা ইঁদুরের কাছে কাক ঘেঁষে, আবর্জনা পরিস্কার করে। অথচ মানুষ একে আপন ভাবলই না, শকুনের বেলায়ও এমন আচরণই করা হয়েছে। শকুন ছাড়া মরা সাফ করার দায়িত্ব কে নেয়? কোথায় একটু ভালোবাসবে। না, উল্টে বলে শকুনি মামা।" ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে একটা প্রশ্ন অনেকবার করেছেন জনাব ইসলাম, মানুষ কেন প্রয়োজন পৃথিবীর? মানুষ না থাকলে কি ফুল ফুটবে না, প্রজাপতি কি নাচবে না, সূর্য কি অস্ত যাবে না? করোনার সময় যখন মানুষ ঘরে আটকা পড়ল তখন প্রকৃতি রঙে-রুপে অনন্যা হয়ে উঠেছিল। প্রজাপতি বলে পতঙ্গটা না থাকলে, ডলফিন নামের স্তন্যপায়ী প্রাণীটা না থাকলে এমনটা সম্ভব হতো না। আরো জানাচ্ছেন জনাব ইসলাম, "বিবর্তনের গাছটা একটু ভালো করে খেয়াল করুন, মানুষের অবস্থান একেবারে মগডালে। গোড়া ও কাণ্ডে আছে বৃক্ষ ও প্রাণীকুল। এর মানে দাঁড়ালো, মানুষ এসেছে সবার পরে। সে অর্থে মানুষের আসার পথ সহজ করেছে শকুন, কাকসহ আরো সব সহস্র প্রাণ, টিকে থাকাও সহজ করেছে।" ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন প্রণয়নে সম্পৃক্ত ছিলেন জনাব ইসলাম। খসড়ার পাতা উল্টাতে গিয়ে এক জায়গায় আটকে গিয়েছিলেন। সেখানে ইঁদুরের সঙ্গে কাককেও উল্লেখ করা হয়েছিল ভারমিন (ক্ষতিকর) প্রাণী হিসেবে। পরে বাদ দেওয়া হলেও অপমানটা হজম করা সহজ নয়। তাই বুঝি কাক অভিমানে হারিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে! কেন হারিয়ে যাচ্ছে কাক? জবাবে জনাব  ইসলাম বললেন, "কাককে আমরা হেলথ ইন্সপেকটরও বলি। স্বভাবতই পাখিটি পরিবেশে দূষণ ছড়ায় এমন সব উপকরণ খুঁজে বেড়ায় এবং নিজে সেগুলো গ্রহণ করে। এখন সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য জমাকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। তাই কাকের খাবারের কিছু অভাব ঘটতে পারে তবে তা হারিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বলে মনে করি না।" "কিছু হিডেন ফ্যাক্টর কাজ করে থাকবে। যেমন বর্জ্যে এখন প্লাস্টিক বা ধাতব পদার্থের ভাগ (কণা বা গুঁড়া আকারে) আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি, সেগুলো কাকের দেহে বিষক্রিয়া ঘটাবে। এছাড়া কীটনাশক বা ইনসেকটিসাইড বেশি ছিটানো হয় জমে থাকা বর্জ্যের ওপরই। সেগুলোও কাকের শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কাক বেশি দেখা যায় বৈদ্যুতিক তারের ওপর, এখন তারগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাটির তলদেশ দিয়ে। তাই কাকের আড্ডা দেওয়ার জায়গার অভাব পড়ছে। বাসস্থান নিঃসন্দেহে কমেছে। ধানমন্ডির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে। ধানমন্ডিতে সব ছিল একতলা বা দোতলা বাড়ি, সঙ্গে গাছ-গাছালি। গত দুই দশকে ভার্টিক্যাল এক্সপানসন (উঁচু ভবন) বেশি হওয়ায় অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে সেসঙ্গে পাখিদের বসতিও।" উন্নয়ন, নগরায়ণের নামে দিনে দিনে অনেক প্রাণীকেই আমরা তাড়িয়েছি ঢাকা থেকে, কাকও যদি হারিয়ে যায় তবে কতটা ক্ষতি হবে? শেষ এই প্রশ্নের উত্তরে জনাব ইসলাম বললেন, "কাকের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা অন্য অনেক প্রাণীর চেয়ে বেশি। তাই প্রথম আঘাতটা আসবে অনুভূতিতে। এরপর ধরে নিলাম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা আরো উন্নত হবো কিন্তু পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলতে পারব বলে মনে হয় না তখন কাক ডেকে ডেকে হয়রান হওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।"
Published on: 2023-12-01 06:56:09.512116 +0100 CET