The Business Standard বাংলা
বিলাসবহুল হোটেল বাণিজ্যে প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠন

বিলাসবহুল হোটেল বাণিজ্যে প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠন

প্রথাগত ভূমিকার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ)। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে পাঁচ তারকা মানের হোটেল স্থাপনের জন্য সদস্যদের কাছে শেয়ার বিক্রি শুরু করেছে সংগঠনটি। এছাড়া সংগঠনটির মালিকানায় খুলনায় একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। দেশের প্রতিটি জেলায় ডরমিটরি, অ্যাডমিন সেন্টার, রিসর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বিএএসএ। সংগঠনের সদস্যদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত ২৯ অক্টোবর বিএএসএ সভাপতি ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামাল সব সচিব, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি দিয়ে সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে যে হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার শেয়ার বিক্রির অনুরোধ করেছেন। ওই চিঠির পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা তাদের আওতাধীন দপ্তরের বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের শেয়ার কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। ওই চিঠিতে বিএএসএ সভাপতি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ১ হাজার একর জমি নিয়ে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণ করছে। এ পার্কে বেজা বিএএসএকে ১০ একর জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে, যেখানে একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল নির্মাণ করা হবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির বেশ কিছু শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য আরও ৩ হাজার শেয়ার বিক্রি করা প্রয়োজন। প্রতিটি শেয়ারের দাম ৫০ হাজার টাকা। বিএএসএর একজন সদস্য কমপক্ষে তিনটি এবং সর্বোচ্চ ২০টি শেয়ার নিতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে চিঠিতে। *সাবরাং পার্কে হোটেল নির্মাণ কেন?* সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিনোদন কেন্দ্র, ইকো-ট্যুরিজম, সামুদ্রিক পার্ক, গলফ কোর্সসহ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। পার্কটি ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সংযুক্ত। এছাড়া এ প্রকল্পের কাছেই মনোমুগ্ধকর সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও শাহপরীর দ্বীপ। *খুলনার হোটেল* সাবরাং পার্ক হোটেলের আগে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন শামছুর রহমান সড়কে একটি বিলাসবহুল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিএএসএ। যেটা মূলত অত্যাধুনিক পাঁচ তারকা মানের হোটেল। ১২ তলা বাণিজ্যিক ভবনে থাকবে ৬৬টি বেডরুম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারে কার্যালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আগামী বছর এর নির্মাণকাজ শেষ হলে বিএএসএর কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ প্রকল্পের নির্মাণকাজে ব্যয় হচ্ছে ১৫৯ কোটি টাকা। সরকারি তহবিল থেকে শুধু নির্মাণ খরচই দেওয়া হচ্ছে না, ভবনটি নির্মাণের জন্য ০.৬০৯৬ একর জমিও নামমাত্র মূল্যে দেওয়া হয়েছে বিএএসএকে। সরকারি টাকায় নির্মাণ হলেও এ প্রকল্পের মুনাফা সরকারের কোষাগারে যাবে না বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয় সূত্রে। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাদ উদ্দিন চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, হোটেলের সব আয় বিএএসএ নেবে না, কিছু অংশ সরকারও পাবে। *স্বার্থের সংঘাত আছে কি?* সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ মোতাবেক একজন সরকারি কর্মচারী তার চাকুরির পাশাপাশি সাইড বিজনেস করতে চাইলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় তা আচরণ বিধিমালা লঙ্গন হবে। যেসব ক্ষেত্রে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে, সেগুলো হচ্ছে, ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসা, সুদে কোথাও থেকে ধার বা ঋণ নেওয়া, খণ্ডকালীন চাকরি করা এবং অন্যের কাছে সরকারি কাগজপত্র হস্তান্তর বা তথ্য সরবরাহ করা। যদিও সমিতির মাধ্যমে ব্যবসা করার বিষয়ে এই বিধিমালায় কিছু বলা হয়নি। সরকারি কর্মচারীদের কয়েকটি সংগঠনের মালিকানায় পাঁচ তারকা হোটেল, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, ব্যাংক, ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ আগে থেকেই আছে। করোনা মহামারির সময়ে অনেক সরকারি কর্মচারীর ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি সামনে আসে। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ব্যবসায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি পাঠায়। এ বিষয়ে একজন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, সরকারি কর্মচারীরা ব্যবসায় সম্পৃক্ত হলে স্বার্থের সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলেই সার্ভিস রুলে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা আছে। তবে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের ব্যবসায় মন্দ কিছু দেখছেন না। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু প্রতিরক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো অন্যান্য সেবাগুলোতে তাদের সহকর্মীদের লাভজনক উদ্যোগকে যেখানে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে বিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন যে এ পথে হাঁটবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। 'জনগণের প্রত্যাশা থাকবে, তারা [বিএএসএ] সম্পূর্ণ আইনি কর্তৃত্বের ভিত্তিতে তা করবে এবং কর্পোরেট স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করবে।' *কবে কেন বিএএসএর প্রতিষ্ঠা?* ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএএসএর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এ সংগঠনের কার্যবিধিতে যেসব উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমমর্মিতা ও একাত্মবোধ জাগ্রতকরণ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা, নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধকরণ। যে কোন সদস্য বা সকল সদস্যের আইন অনুযায়ী ও ন্যায়সংগত অধিকার যথা: চাকুরীর কাঠামো, বেতন, পদমর্যাদা, আপেক্ষিক জ্যেষ্ঠতা ইত্যাদি সকল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দাবিসমূহ ন্যায়নীতি, ন্যায্য অধিকার ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণও তাদের উদ্দেশ্য। এছাড়া সামাজিক কুশল সম্পর্কে এবং সংগঠনের সব সদস্যের জন্য কল্যাণমূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণও এর উদ্দেশ্য। আগে থেকেই সংগঠনটি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অভ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম) ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় অর্ধশত স্কুল পরিচালনা করে আসছে।
Published on: 2023-12-01 18:59:45.430984 +0100 CET