The Business Standard বাংলা
তুলা আমদানি ১৫ শতাংশ কমাতে পারে গার্মেন্টস বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার

তুলা আমদানি ১৫ শতাংশ কমাতে পারে গার্মেন্টস বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার

গার্মেন্টস বর্জ্যের দক্ষ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তুলা আমদানি প্রায় ১৫ শতাংশ কমাতে পারবে। তৈরি পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করার সম্ভাবনা রয়েছে। রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার করার সুবিধা কেবল খরচ সাশ্রয়েই সীমাবদ্ধ নয়। টেক্সটাইল খাতের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান করা গেলে টেক্সটাইল বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার বার্ষিক চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন রাজস্ব এনে দিতে পারবে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, দেশে উৎপাদনের পূর্ব ও পরবর্তী ধাপে বিপুল পরিমাণ পোশাকবর্জ্য উৎপন্ন হয়। 'যদি আমরা এ বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণে রূপান্তর করতে পারি, তাহলে এটি তুলা আমদানি ১৫ শতাংশ কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে,' দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কে বলেন তিনি। বিটিএমএ'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে ৪৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ১৮ লাখ টন তুলা আমদানি করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানির পরিমাণ ১২.২৭ লাখ টন, আর্থিক মূল্যে ৩২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। যদি তুলা আমদানি কমিয়ে পোশাকের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা হতো, তাহলে বাংলাদেশ কেবল ২০২২ সালেই সাত হাজার ১৮০ কোটি টাকা (প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার) এবং এ বছরের প্রথম ১১ মাসে চার হাজার ৮৬১ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারত। পোশাক-রপ্তানিকারক কারখানাগুলোয় চার থেকে পাঁচ লাখ টনের বিশাল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এগুলো সাধারণত 'ঝুট' নামে পরিচিত। এ বর্জ্য মূলত কাপড়ের কাটা অবশিষ্টাংশ, স্ক্র্যাপ, এবং পেঁজার মিশ্রণ। রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য বর্তমানে এ বর্জ্যের মাত্র ৫ শতাংশ রিসাইকেল করা হচ্ছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য পোশাক তৈরিতে এগুলোর ৩০–৩৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। আর বাকি অংশ রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, 'প্রায় চার লাখ টন পোশাকবর্জ্য স্থানীয়ভাবে রিসাইকেল করে এ শিল্পে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।' তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকবর্জ্যের একটি অংশ রপ্তানি করে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ মাটি ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলে পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। তিনি আরও জানান, রিসাইকেল করা সুতা তৈরিতে পানি বা রাসায়নিকের প্রয়োজন হয় না। তাই এটি অন্যান্য সুতার তুলনায় পরিবেশবান্ধব। রপ্তানিকারকেরা যে নীতি সহায়তা চান রপ্তানিকারকেরা উল্লেখ করেছেন, পোশাক খাতের পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের ক্ষেত্রে অর্থায়ন এবং কর বিষয়ক কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ২২ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা। 'গার্মেন্টস বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এছাড়া পুনর্ব্যবহৃত সুতা বিক্রির সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়,' তিনি বলেন। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, রিসাইক্লিংকে উৎসাহিত করতে সরকারের উচিত নীতি ও কর সহায়তা দেওয়া। 'এ বর্জ্যগুলো যখন মাটি ভরাটের কাজে যায় বা ড্রেনে ফেলা হয়, তখন সরকার কিছুই পায় না। কিন্তু যখন আমরা মূল্য সংযোজন করি এবং ১০ টাকার বর্জ্যকে ৫০০ টাকার পণ্যে রূপান্তর করি, তখন সেখানে ভ্যাট থাকে। আমরা একাধিকবার এনবিআরকে বিষয়টি জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি,' বলেন তিনি। ফারুক হাসান বলেন, বিজিএমইএ এবং এর সদস্য কারখানাগুলো বর্তমান চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত ৯৮ শতাংশ তুলার ওপর নির্ভরতা কমাতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গার্মেন্টস বর্জ্য সংগ্রহের সমস্যা সমাধানে বিজিএমইএ বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবছে বলেও জানান তিনি। বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, বেশিরভাগ গার্মেন্টস বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রযুক্তি কোম্পানি ইউরোপীয় হওয়ায় এ খাতে উচ্চ বিনিয়োগ প্রয়োজন যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি একটি সার্কুলার ফাইন্যান্সিং স্কিমের মাধ্যমে গার্মেন্টস রিসাইক্লিং শিল্পকে কম খরচে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, যদি ক্রেতা বা দাতা সংস্থাগুলো আর্থিক সহায়তা দেয়, তাহলে পোশাক শিল্প এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও ভালো অবস্থানে থাকবে। স্কয়ার টেক্সটাইল-এর পরিচালক (অপারেশন) তাসলিমুল হক বলেন, 'যদি সরকার উদ্যোক্তাদেরকে ভোক্তা-পরবর্তী পোশাকবর্জ্য আমদানি করার অনুমতি দেয়, তাহলে তারা এ খাতে আরও বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবেন।' গার্মেন্টস বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের বাজারে শীর্ষ যারা বিটিএমএ'র মতে, বাংলাদেশে সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড, স্কয়ার টেক্সটাইল পিএলসি, বেক্সিমকো গ্রুপ (স্প্যানিশ কোম্পানি রিকভার-এর সঙ্গে যৌথভাবে), আকিজ গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, মোশারফ গ্রুপ, আমান টেক্সটাইল, হা-মীম গ্রুপ গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, ও মাদার টেক্সটাইল মিলসসহ ৪০টি ছোট-বড় কারখানা রিসাইকেল করা সুতা তৈরিতে পোশাকবর্জ্য ব্যবহার করে। প্যাসিফিক জিন্স, ডিবিএল গ্রুপ এবং বিটপী গ্রুপ শীঘ্রই গার্মেন্টস বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের কাজ শুরু করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সিমকো স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইল-এর মহাব্যবস্থাপক উমর খান টিবিএস কে বলেন, 'সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বর্তমানে ৯৫ শতাংশ গার্মেন্টস বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির আরও উন্নতি হলে শতভাগ রিসাইকেল করা সক্ষম হবে।' ২০০৯ সালে ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রতিষ্ঠিত সিমকো বর্তমানে বছরে প্রায় ছয় হাজার টন রিসাইকেল করা সুতা উৎপাদন করে। উমর খান উল্লেখ করেন, সাইক্লো প্রক্রিয়ায় রিসাইকেল করা প্রতি কিলোগ্রাম সুতা ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত পানি, ২০০ গ্রাম কীটনাশক ও সার, ২.৭ কেজি রঞ্জক ও রাসায়নিক, ৩.২ ইউনিট বিদ্যুৎ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের ১১ কেজির সমপরিমাণ সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারে। বিশিষ্ট পোশাক রপ্তানিকারক হা-মীম গ্রুপ এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের মাওনায় হা-মীম স্পিনিং মিল-এ একটি রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট উদ্বোধন করেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্ল্যান্টটি প্রতিদিন রিসাইকেল করা ১৬ টন তুলা উৎপাদন করতে পারবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য অতিরিক্ত ১৬ টন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। আর তৃতীয় পর্যায়ে রিসাইকেল করা তুলা থেকে ৪৫ টন ফ্যাব্রিক উৎপাদনের লক্ষ্য এটির। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ টিবিএস কে জানান, গ্রুপটি ২০২৪ সালের মধ্যে রিসাইকেল করা সুতা থেকে বস্ত্র উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা করছে। প্যাসিফিক জিনস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর জানান, তারা রিসাইকেল করা পোশাকের একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করছেন। এ প্রকল্পের আওতায় আগামী ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্যাসিফিক রিসাইকেল ফাইবার লিমিটেড বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন সুতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। স্কয়ার টেক্সটাইল রিসাইক্লিং প্ল্যান্টের অপারেশন ডিরেক্টর তাসলিমুল হক বলেন, তাদের ফ্যাসিলিটি বর্তমানে বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ১২ টন সুতা তৈরি করছে। তিনি জানান, এ কারখানায় প্রাক-ভোক্তা পর্যায়ের পোশাকের বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরবরাহ তাদের দৈনন্দিন উৎপাদন চাহিদা মেটাতে অপর্যাপ্ত। তিনি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে তাদের কাঁচামাল নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। রিসাইকেল করা বা টেকসই উপকরণে নজর যেসব ব্র্যান্ডের ২০১৩ সাল থেকে ডাচ ব্র্যান্ড জি-স্টার ভোক্তা-পরবর্তী ডেনিম বর্জ্য ব্যবহার করে নতুন ডেনিম পণ্য তৈরির মাধ্যমে টেকসই ফ্যাশনেে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এইচঅ্যান্ডএম-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের শতভাগ উপকরণ রিসাইকেল করা বা আরও টেকসই পদ্ধতিতে সংগ্রহ করার লক্ষ্য ব্র্যান্ডটির। আর ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ রিসাইকেল করা উপকরণ ব্যবহার করতে চায় এটি। স্প্যানিশ ব্র্যান্ড ইনডিটেক্স ২০৩০ সাল নাগাদ কম পরিবেশগত ফুটপ্রিন্টসম্পন্ন উপকরণ থেকে তাদের শতভাগ টেক্সটাইল পণ্য তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। ইনডিটেক্স-এর ওয়েবসাইট বলা হয়েছে, 'আমাদের ব্যবহৃত টেক্সটাইল ফাইবারগুলোর ৪০ শতাংশ প্রচলিত রিসাইকেল প্রক্রিয়া থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে আমাদের।'
Published on: 2023-12-30 04:18:24.505737 +0100 CET