The Business Standard বাংলা
নববর্ষ উদযাপন অঙ্গীকারের একাল-সেকাল

নববর্ষ উদযাপন অঙ্গীকারের একাল-সেকাল

দোরগোড়ায় নতুন বছর। উৎসবমুখর পরিবেশ চারদিকে, কোথাও কোনো আয়োজনের কমতি নেই। শীতের সকালে নববর্ষকে আগমন জানাতে গিয়ে আমরা নিজেরাও নিজেদের সাথে কত রকম প্রতিজ্ঞা-পণ করি– নতুন বছরে আরও স্বাস্থ্য সচেতন হব, নিয়মিত শারীরিক কসরত করব, বেশি বই পড়ব বা নতুন জরুরি কোনো সফট স্কিল শিখে নেব। কিন্তু, জানুয়ারির প্রথম দিনকে ঘিরে এত উন্মাদনা-আগ্রহ-উত্তেজনা কেন? বছরের বাকি দিনগুলোর সাথে এর তফাতটাই বা কোথায়? মানবসভ্যতার ইতিহাসে নববর্ষের উদযাপন দীর্ঘদিন ধরে। প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে। তবে সেই সময়ের প্রতিজ্ঞাগুলো আজকালকার নিউ ইয়ার রেজল্যুশনের মতো ছিল না। প্রায় প্রতিটি প্রাচীন সংস্কৃতিতেই নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্য-আচার খুঁজে পাওয়া যায়। সেগুলো এখনকার রেজল্যুশনের মতো নতুন বই পড়া বা স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার পণ না। বরং প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ দেবতাদের সান্নিধ্য ও কৃপা পাওয়ার আশায়, চাষবাসে সমৃদ্ধির আশায় পণ করতেন; কখনো কখনো বলিদান বা বিসর্জন দিতেন। সে সময়ের উদযাপনের ভঙ্গির সাথে এখনকার নববর্ষের রেজল্যুশনের তুলনা করলে মনে হতে পারে দিন যেমন পাল্টেছে, মানুষও তেমন ভোল পাল্টেছে। তবে অনাগত দিনগুলোতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা বদলায়নি। *প্রাচীন মিসরীয়দের ওয়েপেট রেনপেট* ব্রোঞ্জ যুগের প্রারম্ভে, খ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় তিন হাজার বছর আগে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেও নববর্ষের উদযাপনের নমুনা পাওয়া যায়। প্রাচীন মিসরে মানুষ ওয়েপেট রেনপেট (বছরের শুরু) নামের একটি উদযাপনে অংশগ্রহণ করত। যদিও এখানে কোনো পণ-প্রতিজ্ঞা নেওয়ার ইতিহাস পাওয়া যায় না, তবে ইতিহাসবিদদের মতে, মিসরের মানুষ প্রচুর পরিমাণে খাবার, মদ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে এর আয়োজন করত। নীল নদে প্রতিবছর প্রায় কাছাকাছি সময়ে বন্যা হতো। ওয়েপেট রেনপেটের আয়োজনও মোটামুটি সেই সময়েই। ধারণা করা হয়, মিসরীয়রা এ সময়ই নববর্ষের উদযাপন করত। জুলাই মাসের দিকে তারকা সিরিয়াস এর আগমনীর ঘটনাটিও তখন ঘটত। নীল নদে বন্যা হওয়ার কারণে আবাদি জমি আগামী বছরও উর্বর থাকবে, তাতে পলি আসবে। জীবন যখন কৃষির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, তখন উদযাপন তো হবেই। *ব্যাবিলনীয়দের নববর্ষের শপথ* অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, আমরা এখন যেমন বছরের শুরুতে রেজল্যুশন করি, সেই ধারণাটি বোধ হয় ব্যাবিলনীয়দের কাছ থেকে এসেছে। অবশ্য এই প্রাচীন জনপ্রিয় শহরের বাসিন্দারা কৃষির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নববর্ষ পালন করতেন মার্চে (তাদের বর্ষপুঞ্জি অনুযায়ী ওই মাসে), জানুয়ারিতে না। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে নতুন চারা রোপণ করে তারা ১১ দিনব্যাপী 'আকিতু' নামের প্রকাণ্ড ধর্মীয় উৎসবে মেতে উঠতেন। দিন ও রাত-আলো-আঁধারের পরিমাণ এ সময় সমান হতো। আর এটিকেই নববর্ষের সূচনা বলে মেনে নিতেন তারা। 'আকিতু' শব্দটি সুমেরীয়, এর অর্থ যব বা বার্লি। বসন্তকালে সে সময় যব কাটা হতো বলে এরকম নামকরণ। উৎসবের একাদশ তিথির প্রতিটিতেই ভিন্ন কিছুর আয়োজন থাকত। নববর্ষের পাশাপাশি আকিতু উৎসবে ব্যাবিলনীয়রা তাদের আকাশ দেবতা মারডুকের উপাসনা করতেন। সাগরের দানবী তিয়ামাতের বিপক্ষে মারডুকের পৌরাণিক জয়লাভের উদযাপন হতো সেখানে। এর পেছনে রাজনৈতিক কারণটিও স্পষ্ট। এই ধর্মীয় উৎসবে ব্যাবিলনীয়রা নতুন রাজার অভিষেক করতেন, কিংবা বিদ্যমান রাজার প্রতি নিজেদের আনুগত্যের জানান দিতেন। দেবতাদের কাছে নতুন বছরে সকল ধারকর্জ পরিশোধ করার প্রতিজ্ঞা করতেন। এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রতিজ্ঞাকে হাল আমলের নিউ ইয়ার্স রেজল্যুশনের সাথে তুলনা করা যায়। *চৈনিক নববর্ষের আড়ম্বর* আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে চীনে শ্যাং বংশের রাজত্বের সময় নববর্ষের উদযাপন শুরু হয়। ইতিহাসবিদদের ধারণানুযায়ী, সেটিই এখনো পরম্পরা ধরে রেখেছে। রং-বেরঙের বাহারি ফানুস, জাঁকজমক পোশাক ও জমকালো আয়োজনে চীনারা নতুন বছরকে বরণ করে নিত। আবার আতশবাজির ব্যবহারও তারাই প্রথমে করেছিল। বসন্তের রোপণকালকে মাথায় রেখেই এর আগমন ঘটেছিল, তবে এখন এই ঐতিহ্য লোককথাতেই অনেকটা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। *নতুন বছর একসময় শুরু হতো মার্চে* শীতের অন্ধকার রাত পেরিয়েই নববর্ষের শুরু। তবে তা সবসময় জানুয়ারি দিয়ে শুরু হতো না। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে জানুয়ারির অস্তিত্বই ছিল না। বর্ষপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারের ঊষালগ্নে শীতকালীন মাসগুলোর কোনো নাম ছিল না। সময় ও পরিবর্তনের দেবতা জানুসের নামানুসারে জানুয়ারির উদ্ভাবন মূলত রোমানদের হাত ধরেই। *প্রথম রোমান ক্যালেন্ডার* অন্তত ১০ হাজার বছর ধরে মানুষ ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে দিনক্ষণের হিসেব রাখছে। তবে তার তরিকা পাল্টেছে। ব্রিটেনের মেসোলিথিক যুগের মানুষ চাঁদের বিভিন্ন দশার দ্বারস্থ হতো। আবার প্রাচীন মিসরের মানুষ সূর্যের অনুসারী হতো। অন্যদিকে চৈনিকেরা দুটো পদ্ধতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে– লুনিসোলার ক্যালেন্ডারের উদ্ভাবন করেছে, যেটি তারা এখন পর্যন্ত ব্যবহার করে। তবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে আধুনিক ক্যালেন্ডারটি ব্যবহৃত হয়, সেটি রোমান প্রজাতন্ত্রের হাত ধরেই বিবর্তিত হয়েছে। আবিষ্কারটির পেছনে এই রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সম্রাট রমুলাসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; তবে ক্যালেন্ডারটির ধারণা সম্ভবত ব্যাবিলন, এট্রুস্কান এবং প্রাচীন গ্রিকদের দিনক্ষণ পরিমাপের পদ্ধতি থেকেই এসেছিল। রোমানদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি ক্যালেন্ডারেও বিবিধ পরিবর্তন এসেছে। রোমান রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিলুপ্তির মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এতে নানা পরিবর্তন আনা হয়। প্রথমদিকে ক্যালেন্ডারটি মাত্র ১০ মাস দীর্ঘ ছিল, প্রাচীন রোমান সমাজকে মাথায় রেখেই সেটি সাজানো, কৃষি ও ধর্মীয় আচারকে মাথায় রেখে গড়া। ৩০৪ দিনসম্বলিত সেই ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হতো মার্চ মাসে। রোমান দেবতা মার্সের (মঙ্গল– রণদেবতা) নামে এর নামকরণ। ডিসেম্বরের চাষাবাদের সময় পর্যন্ত এটি স্থায়ী হতো। শুরুর সেই ক্যালেন্ডারে ছয়টি মাস ৩০ দিন স্থায়ী এবং বাকি চারটি মাসে ছিল ৩১ দিন করে। প্রথম চারটি মাস জুনোর মতো দেবতার নামানুসারে হয়েছিল। আর পরবর্তী ছয়টি মাসকে ল্যাটিন ভাষায় ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে, যেমন সেপ্টেম্বর এসেছে ল্যাটিন সেপ্টাম থেকে, যার অর্থ সাত। চাষাবাদ যখন শেষ হতো, তখন ক্যালেন্ডারও শেষ হতো। তাই শীতের মাসগুলো তখনো কোনো নাম পায়নি। *রোমের চন্দ্রপঞ্জিকা* ১০ মাস দীর্ঘ ক্যালেন্ডারও বেশিদিন টিকতে পারেনি। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে রোমের দ্বিতীয় সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াসের সময় এতে আবার চান্দ্রমাসের গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ, রোমের প্রতিষ্ঠাতা রমুলাসের রোমান বর্ষপঞ্জি ৩০৪ দিনবিশিষ্ট ছিল। তবে সেখানে জানুয়ারিয়াস ও ফেব্রুয়ারিয়াস যোগ করার কৃতিত্ব– দ্বিতীয় রোমান সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াসের। পম্পিলিয়াসের সময় এতে ৫০ দিন নতুন সংযোজন করার পাশাপাশি দুটি নতুন ২৮ দিনব্যাপী মাস আনা হয়। তবে এই হিসাবও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কারণ, রোমানরা বিজোড় সংখ্যাকে শুভ ভাবত। তাই বছরে বিজোড়সংখ্যক মাস রাখার চেষ্টাও ছিল। পাশাপাশি চাঁদের ওপর নতুন এই বর্ষপঞ্জিকা নির্ভরশীল হওয়ায় প্রায়ই ঋতুর সাথে জট পাকিয়ে ফেলত। *জুলিয়ান পঞ্জিকার জন্ম* শেষমেশ খ্রিষ্টের জন্মের ৪৫ বছর আগে জুলিয়াস সিজার একটি সংশোধিত রূপ চাইলেন। বর্তমানে এটিই জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। এটি সাজিয়েছিলেন আলেকজেন্দ্রিয়ার সোসিজেন্স। গ্রিক এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ ৩৬৫ দিনসংবলিত একটি ক্যালেন্ডার প্রস্তাব করলেন, যেখানে প্রতি চার বছর অন্তর একটি অধিবর্ষ থাকবে। বছরের হিসেবে তিনি ১১ মিনিট বাড়িয়ে ফেললেও নতুন এই ক্যালেন্ডারটি সূর্যের সাথে মোটামুটিভাবে সাযুজ্যপূর্ণই ছিল। *ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বছর* খ্রিষ্টের জন্মের ৪৬ বছর আগের কথা। সেটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বছর। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার আক্ষরিকভাবেই রোমান বর্ষপঞ্জিকে পাল্টে দিয়েছিলেন। এর আগপর্যন্ত রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণ ও মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য তাদের বর্ষপঞ্জিটি খুবই বিভ্রান্তিকর ছিল। সিজার এসে তা পরিবর্তন করলেন। সিজার বছরটিকে দীর্ঘায়িত করে ৪৫৫ দিনে নিয়ে গেলেন। আর জানুয়ারির ১ তারিখকে নতুন বছরের প্রথম দিন বলে ঘোষণা করলেন। একই সাথে প্রতি চার বছর অন্তর একটি দিন সংযোজন করলেন। বর্তমানে এটিকে আমরা লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষ বলে জানি। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর পরিভ্রমণকে মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া রোমানরা নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার জন্য দেবতা জানুসের উপাসনা করতেন। জানুসের দুটো মুখ ছিল বলে জানা যায়, এর একটি নববর্ষের দিকে তাক করা, অন্যটি পুরোনো ফেলে আসা বছরের দিকে তাকিয়ে আছে। অর্থাৎ, একই সাথে অতীতের দিকে ফিরে তাকানো এবং অনাগত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ানোর রূপক। রোমান সম্রাটদের একটু-আধটু পরিবর্তন ছাড়া জুলিয়ান ক্যালেন্ডার দীর্ঘসময় ধরে অপরিবর্তিত ছিল। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি অবশ্য ১৫৭০-এর দশকে ক্যালেন্ডার সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৫৮২ সালের দিকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারটি কার্যকর করা হয়েছিল, নতুন বছর পয়লা জানুয়ারিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য যে পরিমাণ সময় প্রয়োজন, তার সাথে মিল রেখে এটি করা হয়েছিল। তবে সবাই এই নতুন গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার অনুসরণ করেনি, তাই এখন অনেক ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চেই বড়দিনের ছুটি জানুয়ারিতে গিয়ে গড়ায়। কিন্তু, অধিকাংশ মানুষ আজও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। কারণ, সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে মিলে যাওয়ায়– এটি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নির্ভুল হিসাব দিতে পারে; আর তাই বেশিরভাগ সমাজ এখনো ১ জানুয়ারিতে নববর্ষ উদযাপন করে। উল্লেখ্য, মেরিয়াম ওয়েবস্টারের মতে, ১৮১৩ সালে বোস্টনের একটি সংবাদপত্রে 'নিউ ইয়ার রেজল্যুশন' বাক্যাংশটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। আধুনিক সভ্যতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার অনুসরণ করা হলেও– অন্যান্য দিনপঞ্জিকাগুলো হারিয়ে যায়নি। সেসব নববর্ষ শুরু হয় অন্যদিন দিয়ে; সেসবের জন্য ভিন্ন উৎসব, আচার ও ছুটির ব্যবস্থাও বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দেখা যায়। যেমন পারস্যে নওরোজ, ইহুদিদের রোশ হাশানাহ, চীনা নববর্ষ ইত্যাদি। *মধ্যযুগে নববর্ষের উদযাপন* ৫০০-১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটিগুলো সবার সামনে আসতে থাকে। যেমন এতে ১১ মিনিটের ত্রুটির কারণে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে সাতটি দিন বেড়ে গিয়েছিল। ক্যালেন্ডার নিয়ে মানুষের বিভ্রান্তি বাড়তে থাকায় বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নববর্ষ পালন করতেন। মধ্যযুগীয় যোদ্ধারা প্রতিবছর শেষে বীরত্বের শপথ নতুনভাবে নিতেন। এক্ষেত্রে একটি ময়ূরের ওপর (বা ময়ূর না পাওয়া গেলে তিতির পাখি) হাত রেখে তারা অঙ্গীকার করতেন। নববর্ষের এই পরম্পরায় সত্যতা কতটুকু, তা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল। *হাল আমলে বিশ্বজুড়ে নববর্ষ উদযাপনের ভঙ্গি* বিশ্বব্যাপী অন্তত চার সহস্রাব্দ ধরে নববর্ষের উদযাপন চলছে। এখন বেশির ভাগ নববর্ষের উৎসব গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হাত ধরে ৩১ ডিসেম্বরে শুরু হয়, আর ১ জানুয়ারির প্রথম প্রহর পর্যন্ত চলতে থাকে। নববর্ষকে ঘিরে প্রচলিত ঐতিহ্যের মধ্যে উৎসব করা, বিশেষ ভোজনের ব্যবস্থা, আতশবাজি, নতুন বছরের জন্য নতুন অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার রীতি প্রায় সব সংস্কৃতিতেই লক্ষণীয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষ খাবার ও জলখাবার উপভোগ করে আর আগামী বছরের জন্য সৌভাগ্য কামনা করে। স্পেন এবং অন্যান্য স্প্যানিশ ভাষাভাষী দেশে মানুষ মধ্যরাতের আগে আগামী দিনগুলোর জন্য আশার প্রতীক হিসেবে ডজনখানেক আঙুর খেয়ে নেয়। আবার সুইডেন ও নরওয়েতে নববর্ষে রাইস পুডিং পরিবেশন করা হয়; এর ভেতরে একটি বাদাম লুকিয়ে রাখা হয়। কথিত আছে, যে ব্যক্তি বাদামটি খুঁজে পাবে, সে আগামী ১২ মাসের জন্য সৌভাগ্যের আশা করতে পারে। অন্যান্য রীতিনীতি যা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত, তার মধ্যে রয়েছে আতশবাজি দেখা এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে গান গাওয়া। অনেক ইংরেজিভাষী দেশে জনপ্রিয়  "Auld Lang Syne" (পুরানো সেই দিনের কথা) মতো গান গেয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নববর্ষের সবচেয়ে জমকালো ঐতিহ্য হলো মধ্যরাতে ঘড়িতে ১২টা বাজার সাথে সাথে নিউ ইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারে একটি বিশাল বল ফেলা। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই আয়োজনটি দেখেছেন, ১৯০৭ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এটি করা হয়েছে। মানবসভ্যতা প্রথম নববর্ষ উদ্যাপনের পর পাঁচ হাজার বছরের বেশি সময় অতিক্রম করেছে। কিন্তু, মানুষ এখনো নতুন বছরে প্রবেশ করার সময় সদাচরণ, আরও স্বাস্থ্যকরভাবে খাওয়ার, আরও ব্যায়াম করার, সময়মতো ঋণ পরিশোধ করার, আরও প্রার্থনা করার, ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার, কঠোর পরিশ্রম করার প্রতিশ্রুতি দেয়। নববর্ষের অঙ্গীকার বা শপথ সব সময়ই নিজেকে আগামীর জন্য ভালোভাবে তৈরি করার বিষয়েই ছিল। তবে ঠিক কখন তা ধর্মীয় থেকে জীবন-সংক্রান্ত পণে রূপ নিয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ নেই। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ সম্মত হন, যে এই রূপান্তরটি সম্ভবত ১৮ শতকের শেষদিকে ইউরোপে এনলাইটেনমেন্টের পরবর্তী যুগে ঘটেছিল। মানুষ যখন আরও কঠোর পরিশ্রম করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েছে, সে সময়ই হয়তো এই পরিবর্তন দেখা গেছে। সমাজের চাহিদার পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের নববর্ষের নতুন প্রতিজ্ঞার ধরনও পাল্টেছে। বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় ফসল কাটা বা পাপমুক্ত জীবনের জন্য মানুষ প্রার্থনা করত। কিন্তু, আধুনিক সমাজের প্রতিফলন হিসেবেই আমাদের নববর্ষের অঙ্গীকারে সে রকম চাহিদা আর নেই। আমরা এখন যেমন পুঁজিবাদী উদ্বৃত্ত সময়ে বাস করছি, তাই আমাদের প্রতিজ্ঞাগুলোও সহজ আর ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ছাপও তাতে একদম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
Published on: 2023-12-31 18:37:50.288413 +0100 CET